শামীম ওসমানকে ধন্যবাদ দিলেন বিএনপি নেতা মাসুকুল রাজীব


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:০৩ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২০, মঙ্গলবার
শামীম ওসমানকে ধন্যবাদ দিলেন বিএনপি নেতা মাসুকুল রাজীব

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে তিনি এমপি শামীম ওসমানকে ইঙ্গিত করে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

এতে তিনি লিখেছেন, ‘গত কয়েকদিন ধরেই মাননীয় এক সংসদ সদস্যের অস্ত্র নিয়ে একটি বক্তব্য বেশ আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে। উনি বলেছিলেন উনার কাছে যতোগুলো অস্ত্র ছিল পুলিশের কাছেও ছিলনা। তারপর উনি সেগুলো ২০০১ সালে পরে সংশোধন করে বলেছেন ৯১ সালে। সে সময়ের পুলিশ সুপারের কাছে জমা দিয়েছেন। আজ এক সংবাদমাধ্যমে দেখলাম উনি অস্ত্র ভান্ডার বলতে বিশাল কর্মী বাহিনীকে বুঝিয়েছেন তাহলে ঐ সময়ে কি জমা দিয়েছিলেন অস্ত্র না কর্মীবাহিনী?’

‘‘আসলে সত্য অনেক সময় নিজের অজান্তেই বের হয়ে যায় কারণ সত্য যতই নির্মম হউক না কেন সেটা সবসময়ই সুন্দর। আমার মতে উনি ওই অনুষ্ঠানে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং ২০০১ সাল উল্লেখ করেছেন পুরোটাই সত্যি কারণ ২০০১ সালের পর অস্ত্রের রাজনীতি করার আর সুযোগ ছিলনা।’’

‘‘এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে একসময় নারায়ণগঞ্জ সহ সারাদেশেই অস্ত্রের রাজনীতির রেওয়াজ ছিল। আমি নিজে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম ১৯৯৯ সালে। তখন মিনিমাম ৩০/৪০ জন অস্ত্রধারী আমাকে ঘিরে গুলি করেছিল। ৯১ ও ৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আতংকের নগরী ছিল নারায়ণগঞ্জ। এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে দেশনেত্রীর ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর।’’

‘‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে দলমত নির্বিশেষে অস্ত্রের রাজনীতি বন্ধের জন্য উনি ছিলেন কঠোর এবং বদ্ধপরিকর। পরবর্তীতে র‌্যাব তৈরী করে পুরোপুরি নির্মূল করেছিলেন যার ধারাবাহিকতা আজো অনেকাংশে বিদ্যমান। মানুষ এবং তার মানুষিকতা পরিবর্তনশীল।’’

‘‘৯৬ থেকে ২০০১ এই সাংসদের শাসনামলের সাথে যদি ২০০৮ থেকে অদ্যাবধি শাসনামলের বা বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের প্রতি আচরণের তুলনা করা হয় (পুলিশ ব্যতিত)তাহলে আমার দৃষ্টিতে সেটা আকাশ পাতালের মত পার্থক্য মনে হবে।’’

‘২০০৮ এর পর আজ অবধি উনার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আচরণ ছিল সৌহার্দ্যপূর্ন হয়তো আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা বিশ্বাস বেড়ে যাওয়ার কারণে। তাই সত্য স্বীকার করা এবং বলার সাহস সব রাজনীতিবিদের মাঝে তৈরী হোক এটাই প্রত্যাশা। সবশেষে সত্য স্বীকার করা আর এখন আল্লাহর উপর অনেক আস্থা রাখেন এই কথা বলার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।’’

১ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর পুলিশ লাইনসে জেলা পুলিশের আয়োজনে ‘পুলিশ মেমোরিয়াল ডে-২০২০’ আলোচনা সভায় দীর্ঘ বক্তব্য দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি একটা কথা বলতে চাই ইদানিং ওয়াজে যাই অনেকে টিটকারী করে। ২ বেলা কোরআন শরীফ পড়ি। ২২ বছর ধরে তাহাজ্জুদ ছাড়ি নাই। ২০০১ এর আগের শামীম অন্যরকম ছিল। আপনার (পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ্য করে) টোটাল ফোর্সের কাছ যা অস্ত্র ছিল তার চেয়ে বেশী আমার কাছে অস্ত্র ছিল। কিন্তু আজকে আমার গাড়িতেও অস্ত্র ছিল কি না জানি না। ২০০১ সালের আগের আমার রাজনৈতিক দর্শন আগে ছিল একরকম। জিন্দাবাদ শুনতে ভালো লাগতো। তখন আমার কাছে যে অস্ত্র ছিল আপনার ফোর্সের কাছেও ২০০১ সালের পরে আমার এই চিন্তা পরিবর্তন হয়েছে।’

এ বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সোমবার নিউজ নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে আলাপকালে শামীম ওসমান ওই বক্তব্যের ব্যাখা প্রদান করেন।

এ ব্যাপারে শামীম ওসমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘১৯৭৫ এর পরে যখন আমরা রাজনীতি করতে এসেছিলাম। তখন দেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, স্বাধীনতা বিরোধীকারী চক্রের লোকজন ওপেন ছিল। নারায়ণগঞ্জে ইসমত হাশেম ও বজলুল হুদারা তখন ওপেন রাজনীতি করতো। সঙ্গে তাল মিলাতো বিএনপি ও স্বাধীনতা বিরোধীরা। তখন আমাদের হাতে কেউ মারা যায়নি। বরং আমরাই মারা গেছি তাদের হামলাতে। আমরা কাউকে আঘাত করি নাই। তাদের হামলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকতে বাঁচার জন্যই অস্ত্র রাখতে হয়েছিল। তবে এসব অস্ত্রের কোন অবৈধ ব্যবহার আমরা করি নাই।’

নির্যাতনের পরিসংখ্যান জানাতে গিয়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘১৯৭৯ হতে ২০০১ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত আমাদের ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে প্রতিপক্ষের হামলায় নির্যাতনে। একজনের লাশ দাফন করার জানাযাতে গিয়ে শুনি আরেকজনের নিহতের খবর। তাদের সকলকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।’

তিনবারের এমপি শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘রক্তের বদলে রক্ত, হত্যার বদলে হত্যার রাজনীতি আমরা করি নাই। আমাদের নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের এ শিক্ষা দেয়নি। বরং বিরোধীরা বার বার আমাদের উপর আক্রমন করেছে। আমাদের তাজা প্রাণগুলো কেড়ে নিয়েছে। আমাদের নেত্রী আমাদের বলেছেন হত্যার বদলে হত্যা না বরং আইনের মাধ্যমেই বিচার হবে। আমরা তখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি নাই। বরং এখন উপলব্দি করছি নেত্রী সঠিক ছিলেন।’

শামীম ওসমান নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘১৯৯১ সালে নারায়ণগঞ্জের এসপি ছিলেন মমিনউল্লাহ পাটোয়ারী সাহেব। এরশাদ সরকারের পতনের সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী অস্ত্র জমা পড়েছিল নারায়ণগঞ্জ জেলাতেই। তখন দেশে গণতন্ত্র ফেরত ও কায়েমের পরেই নির্দেশনা ছিল অস্ত্রগুলো জমা দেওয়ার। যেহেতু তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্স করতাম সেহেতু অস্ত্র ছিল নিজেদের রক্ষার জন্য স্বাধীনতা বিরোধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য। এগুলো আমরা কখনই অন্যায় অবৈধ কাজে ব্যবহার করি নাই। শুধুমাত্র নিজেদের হেফাজতের জন্য ছিল।’

‘১৯৯১ সালে আমাদের নেতাদের নির্দেশই অস্ত্রগুলো জমা দেওয়া হয়। তখন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মমিনউল্লাহ পাটোয়ারীর কাছেই আমরা সর্বোচ্চ অস্ত্রগুলো জমা দিয়েছিলাম। আনঅফিসিয়াল সবগুলো অস্ত্র আমরা জমা দেই’ বক্তব্যে যোগ করেন শামীম ওসমান।

২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা বিস্ফোরণে আহত হন শামীম ওসমান। তিনি সে রাতে নেতাকর্মী ও লোকজনদের সঙ্গে সাপ্তাহিক সাক্ষাতের সময়ে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে যেখানে শক্তিশালী আরডিক্স ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে ২০ জন নিহতের সঙ্গে অর্ধশত আহত হয়। স্লিন্টারে বিদ্ধ হন শামীম ওসমান। ওই সময়ে তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়েও বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচান।’ মূলত এর পরেই একুশে আগস্টেও শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টার হয়েছিল।

শামীম ওসমান নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘১৯৭৯ হতে আমাদের লোকজনদের একের পর এক হত্যা করা হলো। ১৯৯৬ হতে আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। তখন তো আমাদের অস্ত্রের প্রয়োজন হয়নি।’

শামীম ওসমান বলেন, ‘আমরা কখনোই প্রতিহিংসার রাজনীতি করি নাই। অনেকবার বলেছি বিগত বিএনপি সরকারের আমলে আমার বড় ভাই সেলিম ওসমানের কারখানাতে বিএনপির লোকজন ঢুকে গুলি করতে করতে রাজহাসের গলা কেটে, গরুর বান কেটে দিয়েছিল। আরো অনেক অত্যাচার হয়েছিল। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় এসে কাউকে ফুলের টোকা পর্যন্ত দেই নাই। কারণ আমাদের নেত্রীর কাছ থেকে এসব শিক্ষা পাইনি না। নেত্রী আমাদের ধৈর্য সহনশীল রাজনীতির শিক্ষা দীক্ষা দিয়েছেন।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর