রেফারিকে মারধর করা এসপি হারুনের সেই ভিডিও প্রকাশ (ভিডিও)


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৫৫ পিএম, ১১ নভেম্বর ২০১৯, সোমবার
রেফারিকে মারধর করা এসপি হারুনের সেই ভিডিও প্রকাশ (ভিডিও)

সদ্য বিদায়ী নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদের কর্মকান্ড নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জুড়ে পক্ষে বিপক্ষে চলছে আলোচনা সমালোচনা। আর এ মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল হয়ে উঠেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে ‘মাঠ ভরা দর্শকের উপস্থিতিতে এসপি হারুন সহ পুলিশের সদস্যরা জার্সি পড়ে একজন ফুটবল কোচকে মারধর করছেন। আর ওই কোচ মারধর থেকে বাঁচতে দৌড়ে মাঠ ছেড়ে যাচ্ছেন। তবে সে সময় পুলিশের পোশাকে থাকা সদস্যরা এসপি হারুনকে ঘিরে সেখান থেকে নিয়ে আসছেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে উঠেছে সেটি ছিল গত ২৯ জুন সোনারগাঁয়ের একটি মাঠে ফুটবল খেলার সময় রেফারিকে মারধরের দৃশ্য। যেখানে এসপি হারুনের ফুটবল টিমের জার্সি ছিল লাল আর প্রতিপক্ষের জার্সি ছিল আকাশী। আর রেফারির জার্সি ছিল হলুদ।

 

জানা গেছে, ২৯ জুন মাদক ও জঙ্গি বিরোধী ওই প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। যেখানে এসপি হারুনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের দল ছিল লাল জার্সিতে। আর নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার নেতৃত্বে আকাশী জার্সিতে সোনারগাঁও ফুটবল দল। সোনারগাঁ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার তত্ত্বাবধানে বিকেল সাড়ে ৪টায় এ প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় সোনারগাঁও যাদুঘরের পাশে শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে। এ খেলায় এসপি একাদশের ২-০ গোলে পরাজিত হয় এমপি একাদশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সে খেলায় অংশগ্রহণকারী এক খেলোয়াড় নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘রেফারিকে মারধর করে মাঠ থেকে তাঁড়িয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতায় সেদিন খেলা জিতে নেয় এসপি একাদশ।’

তিনি জানান, এসপির সঙ্গে ফুটবল খেলা উপলক্ষে জেলা জুড়েই ছিল উত্তেজনা। সেজন্য উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা আন্তর্জাতিক সকল নিয়ম কানুন অনুসরণ করে খেলার আয়োজন করে। উপজেলা জুড়ে দর্শকদের উপস্থিত হওয়ার জন্য আহবান জানিয়ে মাইকিংও করা হয়।

যথারীতি ২৯জুন বিকেলে খেলোয়াড়দের উপস্থিতি হওয়ার আগেই দর্শক কানায় কানায় মাঠ ভরে উঠে। চারদিক থেকে দর্শকের ভীড়। মাঠও সাজানো হয় রঙ বেরঙের পতাকা দিয়ে। মাঠের এক পাশে করা হয় উপস্থাপনার মঞ্চ। ছিল ট্রফি, মেডেল, ক্রেস্ট ও শুভেচ্ছার ফুল।

কিন্তু খেলা শুরু আগেই এসপি হারুন উদ্বোধনী বক্তব্যে ঘোষণা দেন, ‘এটা প্রীতি ম্যাচ এখানে গোল দিবে গোল রক্ষক বল ধরতে পারবে না।’ এ বক্তব্যই ছিল ফুটবল খেলার নিয়ম পরিপন্থী।

তিনি বলেন, ‘১৫ মিনিট বিরতি শেষে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে খেলা চলার এক পর্যায়ে এসপি হারুন অর রশীদ অফসাইড থেকে গোল দেন। আর সেটা রেফারির চোখে পড়লে তিনি অফসাইডের পতাকা ও বাঁশি বাজান। একই সঙ্গে গোল বাতিল ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে রেগে যান এসপি হারুন। গোল বাতিল করার ক্ষোভে দৌড়ে এসে রেফারিকে লাথি মারেন এসপি হারুন। আর সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে এসপি একাদশের অন্য খেলোয়াররা চারদিক থেকে রেফারীকে ঘিরে ফেলে মারধর শুরু করে। কিন্তু নিরাপত্তায় থাকা অন্য পোশাক পড়া পুলিশ সদস্যরা রেফারিকে না রক্ষা করে উল্টো এসপি হারুনকে রক্ষা করে মাঠ থেকে নিয়ে যান। আর অন্য দিকে মারধর থেকে বাঁচতে রেফারী দৌড়ে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উপস্থিত দর্শকেরা মাঠে নেমে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে দর্শকদেরও বাকবিতন্ডা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘খেলার এখানেই শেষ নয়। এসব পরিস্থিতির সময় মাঠেই উপস্থিত ছিলেন এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার সরকার, সোনারগাঁও থানার ওসি মনিরুজ্জামান সহ উর্ধ্বতন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে তাদের সকালের সহযোগিতায় পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আবারও খেলা শুরু হয়। ওই ঘটনার পর খেলা চলাকালীন সময়ে এমপি একাদশের এক খেলোয়ার খুব ভালোভাবে খেলছিলেন। একের পর এক এসপি একাদশের গোল পোস্টকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করে যাচ্ছিলেন। যখন উভয় পক্ষই ছিল গোল শূন্য। তখন এসপি একাদশের এক সদস্য পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখায় যাতে সে ভালো না খেলে। অন্যথায় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেয়। এতে ভয় পেয়ে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যায় ওই খেলোয়ার। পরে দশজনের দলের সঙ্গে এসপি একাদশের খেলোয়ার দুই গোল দেন। তবে ততক্ষণে দর্শকেরাও মাঠের খেলা ছেড়ে চলে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে রেফারিকে মারধর করে এসপি একদশের সদস্যরা সে রেফারি হলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের নিয়োগভুক্ত রেফারি। ফলে বিষয়টি চাপা দিতে তোড়জোড় শুরু করেছিলেন স্থানীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা।

সে সময় উপস্থিত দর্শকদের হুমকি দেওয়া হয় এসব ঘটনা প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গণমাধ্যমের কর্মীদেরও ভিডিও দৃশ্য ধারণের মেমোরি কার্ড রেখে দেয়া হয়। যার ফলে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

গত ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদকে পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলি করা হয়। আর গত ৭ নভেম্বর জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিদায় জানানো হয়। এরপর থেকে থেকে এসপি হারুনের কর্মকান্ড নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১ নভেম্বর রাতে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেমের ছেলে শওকত আজিজ রাসেলর স্ত্রী ফারা রাসেল ও ছেলে আনাব আজিজকে বাসা থেকে তুলে আনার অভিযোগ ওঠে এসিপ হারুন ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিমের বিরুদ্ধে। আর অভিযোগ সহ একাধিক অভিযোগের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে এসপি হারুন বিদায়ী বক্তব্যে কান্না করে বলেছেন, ‘আমি কোন ভুল করি নাই। সব তদন্তে প্রমাণ হবে। আমি নারায়ণগঞ্জের কল্যাণে কাজ করে গিয়েছি।’

ঘটনার পরেই ইউএনও অঞ্জন কুমার সরকার জানান, বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে হয়েছি। সেসময় তাৎক্ষনিক সেটা সমাধান করে পুনরায় খেলা শুরু হয়।

তবে এ বিষয়ে লিয়াকত হোসেন খোকার সঙ্গে যোগাযোগে চেষ্টা করে তার ব্যবহারের মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। তবে পরবর্তীতে তার কোন বক্তব্য পাওয়া গেলে সেটা নিউজ নারায়ণগঞ্জ তুলে ধরবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর