সাংবাদিক ডাকতো ‘আপা’ তাঁকে বলতো ‘তুমি’

১ ভাদ্র ১৪২৫, শুক্রবার ১৭ আগস্ট ২০১৮ , ৩:৪৬ পূর্বাহ্ণ

ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল

সাংবাদিক ডাকতো ‘আপা’ তাঁকে বলতো ‘তুমি’


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:০৮ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৩:০৮ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার


সাংবাদিক ডাকতো ‘আপা’ তাঁকে বলতো ‘তুমি’

‘‘আমি তখন ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্র। এলাকার একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিচয় হয় নিলুফা ইয়াসমিনের সাথে। সে ভালো গান করে। হায় হ্যালো হতো তার সাথে। ১৬ ডিসেম্বর ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার আমন্ত্রন পায় আমাদের সংগঠন। রিহার্সেলের সময় নিলুফা আর আমার মাঝে দূরত্বটা একটু কমে আসে। তাকে আপা বলে সম্মোধন করলেও সে আমাকে তুমি বলে ডাকতো। কিন্তু সে কিসে পড়ে তা জিজ্ঞেস করার সাহস করিনি। কারণ সংগঠনে আমি মাত্র নতুন। গায়ে পড়ে কথা বললে বিষয়টা হয়তো ভালো দেখাবে না, তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের বাইরে কথা বলতাম না। যাক সে কথা। নির্ধারিত দিনে আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে গেলাম। অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত প্রায় এগারোটা বেজে যায়। এতো রাতে যানবাহন সংকট থাকায় আমরা পায়ে হেঁটেই যাত্রা শুরু করলাম। নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে এক সময় আমি আর নিলুফা অন্যদের থেকে কয়েক গজ সামনে চলে এসেছি। এ কথা সে কথা, কথা যেন আর শেষ হয় না। আর মনে মনে বলছিলাম যাতে কোন রিকশা বা গাড়ি পাওয়া না যায়। তাহলে অনেকদুর এক সাথে যাওয়া যাবে। কথা বলার এক ফাঁকে হঠাৎ নিলুফা আমাকে প্রশ্ন করে তুমি কিসে পড়? আমি কোন ভনিতা না করে বললাম ইন্টার প্রথম বর্ষে। অনেকটা অপরাধবোধ নিয়ে বিনয়ের সহিত নিলুফা বলে সরি... সরি... আমার ভুল হয়ে গেছে। বললাম কী ভুল হয়ে গেছে? আপনি কলেজে পড়েন! বুঝতে পারিনি। আপনাকে তুমি করে বলছি। এটা ঠিক হয়নি। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমি বললাম, তাতে কী? ইটস ওকে। তবে আমি আগেই জানতাম সে ঢাকার একটি কলেজে পড়ে। তাছাড়া আমার শারীরিক গড়নই বলে দিচ্ছিল আমি হয়তো স্কুলের গন্ডি পার হইনি। তাই নিলুফা আমাকে প্রথমেই তুমি বলে সম্মোধন করেছে। পরে নিলুফা অফার করলো, চল আজ থেকে আমরা বন্ধু। আমিও ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ি। আমি মুহূর্তেই রাজি হয়ে গেলাম। দু’জন হ্যান্ডসেক করে একে অপরের বন্ধু হলাম। কিছুদুর আসার পর আমরা গাড়ি পেয়ে গেলাম। যে যার মত বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।’’

ভালবাসা দিবস উপলক্ষ্যে কথাগুলো বলছিলেন দৈনিক মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার নারায়ণগঞ্জ এর দায়িত্বে থাকা বিল্লাল হোসেন রবিন।

রবিন বলেন, আমি সংগঠনে গেলেই এটা সেটা নিয়ে নিলুফার সাথে কথা হত। ধীরে ধীরে আমরা একে অপরের বেস্ট ফেন্ড হয়ে উঠলাম। তবে তার সঙ্গীত চর্চা ভালোমত হলেও আমার হয়ে উঠেনি। আমি গতি পরিবর্তন করে গিটার শেখার দিকে মন দিলাম।

দীর্ঘ সাত বছরের বন্ধুত্বের সম্পর্কে মাঝে মধ্যে মান অভিমান হয়েছে। দু’চারদিন কথা বলা বন্ধ ছিল। কিন্তু ঝগড়া হয়নি। অসুস্থ হলে নিলুফা যেমন ছুটে আসতো আমাদের বাসায়, ঠিক তেমনি নিলুফার অসুস্থতার খবর পেলে আমি ছুটে যেতাম ওদের বাসায়। নিলুফার পরিবারের সবাই আমাকে অনেক আদর করতো। আমার পরিবারের সদস্যরাও নিলুফাকে তাই করতো। একুশের প্রভাত ফেরিতে আমরা এক সাথে শহীদ বেদীতে ফুল দিতে যেতাম। সংগঠনের সবাই থাকলেও আমি আর নিলুফা পাশপাশিই বেশি থাকতাম। নিলুফাদের বাসায় একবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে সারারাত আমি আর নিলুফা দেয়াল পত্রিকার কাজ করেছি। আমি লিখতাম। আর নিলুফা নানা রঙের সাইন পেন দিয়ে লেখাগুলোকে সাজিয়ে তুলতো। ভোর হয়ে গেছে দেয়াল পত্রিকার কাজ সম্পন্ন করতে।

আবার ঈদের দিন প্রথম আমি নিলুফাদের বাসায় যেতাম, নিলুফাও প্রথম আমাদের বাসায় আসতো। আমদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে দুই পরিবারই পজেটিভ ভাবে নিয়েছে। কিন্তু এই পজেটিভ নেয়াটা যে এত অর্থপূর্ন ছিল তা বুঝতে পারিনি আমরা দু’জনেই।

একদিন সকাল বেলা আমি প্রথম জানতে পারি। আর নিলুফা জানতে পারে কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পর। সেটা হল আমাদের দুই পরিবার আমার আর নিলুফার বিয়ের কথা পাকাপোক্ত করে ফেলেছে। নিলুফা তো মহা খুশি। তার আনন্দ জানিয়ে দেয় সে আমাকে কতটা পছন্দ করতো। মনে হচ্ছিলো সে আমাকে না পেলে তার জীবনটাই বৃথা যাবে। অথচ দুই পরিবারের এই আলোচনার আটচল্লিশ ঘন্টা আগেও আমরা বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রেখেছিলাম। আমাদের দু’জনের মাঝে নিলুফার এক বান্ধবী ইনিয়ে বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেছে রবিন ভাই, আপনাদের সম্পর্কটা বিয়েতে রূপ দেয়া যায় না? নিলুফা তো আপনাকে যথেষ্ট পছন্দ করে। আপনিও তো করেন। আমি বললাম হ্যাঁ করি। সেটা বন্ধু হিসেবে। আর এখন যদি আমরা বিয়ে করি তাহলে লোকে কী বলবে? সবাই জানে আমরা ভালো বন্ধু। বিয়ে করা ঠিক হবে না। নিলুফা চুপ। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। আমার খারাপ লাগে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। কারণ বন্ধুরা নানা সময়ে না কথা বলতো আমাদের সম্পর্ক নিয়ে। জোর দিয়ে বলেছি, আমরা বন্ধু, সারাজীবন বন্ধুই থাকবো। এখন বিয়ে করলে তারা কী বলবে? আরো অনেক কথা শেষ করে বিদায় নিলাম। বিদায় বেলা নিলুফা বললো বিয়ে না হোক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক তো নষ্ট করবা না? আমি বললাম অবশ্যই না। কস্টের এই বিদায় অর্ধশত ঘন্টা পর সুখকর হয়ে উঠবে কল্পনাও করিনি। চিরবন্ধনে আবদ্ধ হলাম আমরা। বিয়ের পর আমাদের স্মৃতির ভান্ডার বড় হতে থাকে। এক সাথে পহেলা বৈশাখ। পহেলা ফাল্গুন, বিশ^ ভালোবাসা দিবস। কোনটাই বাদ দিতাম না। মুভি দেখা, বই মেলা, বাণিজ্য মেলা কোথায় যাই না। বিশেষ মুহুর্তে বিকেলে শীতলক্ষ্যায় নৌকা আর গভীর রাত পর্যন্ত রিকসায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ বলে শেষ করা যাবে না। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী সবাইকে নিয়ে হৈ হুল্লোর করে পালন করেছি। ভালোবাসা দিবসে ওকে নিজের পছন্দের গিফট দিতাম। অনেকগুলো লাল গোলাপ দিয়ে ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে নেই।  প্রথম বাবুটা জন্ম নেয়ার পৌনে দুই বছরের মাথায় দ্বিতীয় বেবীটা আসে। এরপর আমাদের দু’জনের আনন্দ ভাগ হয়ে যায়। শুরু হয় চারজনের পথচলা। আমাদের বিশেষ দিনের সঙ্গী এখন আমাদের দুই সন্তান। তবে মাঝে মধ্যে ওদের ফাঁকি দিয়ে দু’জনে বেরিয়ে পড়ি। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ আমাদের সংসার। ভালোবাসার মধ্যেই বেঁচে আছি। বাকী দিনগুলোও যেন এভাবেই কাটাতে পারি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ