৭ আশ্বিন ১৪২৫, শনিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৪:০০ অপরাহ্ণ

চোখের জল চন্দন শীলের ‘মৃত্যুকে কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, ভয় পাই না’


স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৫:২৫ পিএম, ১৭ জুন ২০১৮ রবিবার


ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় দুই পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন চন্দন শীল। তবে এ ভুক্তভোগীর জীবন চলছে নানা কষ্টে। কৃত্রিম পা লাগিয়ে অনেক কষ্ট করে চলাফেরা করতে হচ্ছে তাকে। প্রতি বছর ১৬ জুন আর কেউ না থাকলেও তিনি সকাল বেলাতেই চলে আসেন চাষাঢ়ায় শহীদ মিনারে যেখানে রয়েছে নিহতদের স্মরণে স্তম্ভ। আর প্রতিবাদ তিনি এখানে এসে ফেলেন চোখের নোনা জল।

১৬ জুন শনিবার ঈদ উল ফিতরের দিন চাষাঢ়ায় নিহতদের স্মরণে স্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসে অনেকেই আক্ষেপ করেন। কারণ এদিন নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে ছিলেন না আওয়ামী লীগের কোন শীর্ষ নেতা। ছিল না কোন কর্মসূচীও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিহতের পরিবারের লোকজন জানান, যারা নিহত হয়েছে সবাই বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার ভক্ত ছিলেন। সে থেকেই আওয়ামী লীগ করা। কিন্তু সেই দলের লোকজন এখন তাদের স্বকীয়তা হারিয়েছে।

‘তরুণ বয়সে সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন চন্দন শীল। যার কারণে সব সময় সব কিছুতেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন তিনি। খেলাধুলা আর নাচ গানই ছিল সব থেকে প্রিয়। নিয়মিত খেলাধুলা আর ধর্মীয় উৎসব কিংবা কোন অনুষ্ঠানে নাচে গানে জমিয়ে রাখতেন তিনি। তেমনি রাজনীতিতেও ছিলেন খুব সক্রিয়। দলীয় কর্মসূচির সভা সমাবেশে অথবা মিছিলে হৃদমের সঙ্গে জোরালো স্লোগানে মুখোরিত করে রাখতেন রাজপথ। তবে একটা সন্ধ্যা জীবনের সব আশা আকাঙ্খা নিভিয়ে দিয়ে গেছে। নিহতদের তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও বেঁচে আছেন স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর হয়ে আর একজন অসহায় রাজনীতিবিদ হয়ে। তিনি বলেন ‘আমার সব থেকে বড় আত্মতৃপ্তি হচ্ছে আমি দলের একজন প্লেয়ার। স্কোয়াডে আছি। বাইরে থাকলে কি করার আছে? সাইড লাইনেই হোক বা স্ট্যান্ডিং লাইনেই হোক টিমে আছে। অধিনায়ক যখন মনে করে আমাকে খেলাতে পারে। আর প্রত্যাশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষন মুক্ত সমাজ ও সোনার বাংলা গড়ে তোলা। যেখানে অভাব অনটন থাকবে না, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ করবে।’

২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাড়া শহীদ মিনার ঘেষা আওয়ামী লীগ অফিসে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের গণসংযোগ কর্মসূচিতে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে জড়িত নেতৃবৃন্দরা জড়ো হতে থাকে। রাত ৭টার মধ্যে পুরো অফিস লোকে লোকারন্য হয়ে পড়ে। রাত পৌনে ৯টায় বিকট শব্দে বিষ্ফোরিত হয় বোমাটি। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়।  যেখানে দুই পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন চন্দন শীল।

চন্দন শীল নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সহ সভাপতির পদে রয়েছেন। এছাড়াও তিনি ঘাতক দালল নির্মূল কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি।

চন্দন শীল বলেন, ‘আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি খুব গান পাগল লোক। এখনও খুব ভালোবাসি। পূজা, ঈদ, নবর্ষব সহ সকল উৎসব গুলোতে বন্ধু বান্ধব নিয়ে খুব উপভোগ করতাম। নাচ গান করতাম। আমি নিজেও এগুলো করতাম। আর সব থেকে বেশি আমি খেলাধুলা করতাম। এখন এগুলো খুব মিস করি। স্লোগান দিতে খুব ভালো বাসতাম। এখনও স্লোগান দেই। কিন্তু এখন রিকশায় বসে বসে স্লোগান দেই। এগুলো খুব মিস করি। কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে তার আর কথাও বন্ধ হয়ে যায়।’

দু’ হাতে চোখের চল মুছতে গিয়ে চন্দন শীল বলেন ‘আমার একমাত্র ছেলে আরজিত শীল তখন ছোট, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ালেখা করতো। সেই সময় একটা ভালো খেলোয়ার ছিল। সেই সময় জাতীয় দলের অধিনে ক্রিকেটে অনুর্ধ্ব ১৩ এর একটি স্কোয়াড হয়েছিল, সেখানে তাকে ডাকা হয়েছিল। একটা সম্ভাবনা ছিল তার কিন্তু এ ঘটনায় তা আর হয়নি। সেই স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেছে। এ ক্ষতি কেউ পূরণ করতে পারবে না।’

সেইদিনের ঘটনা সম্পর্কে চন্দন শীল বলেন, প্রতি সপ্তাহের শনি ও সোমবার সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সেইদিন আমার আশার কথা ছিল না। আমি জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম বলে আসতে চাইনি। পরে নেতাকর্মীরা আমাকে ফোন দিয়ে বলে আসতেই হবে। তাই সন্ধ্যায় কার্যালয়ে এসে দেখি শামীম ওসমানের সঙ্গে একজন বৃদ্ধ লোক খুব জোড় গলায় কথা বলছেন। তাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য একটি দরখাস্তে স্বাক্ষর দিতে হবে শামীম ওসমানের। পরে সেখান থেকে শামীম ওসমানকে সরিয়ে দিতেই বৃদ্ধাও কোন কিছু না বলে চলে যায়। সেই মুহূর্তে পায়ের একটু সামনে প্রচন্ড বিস্ফোরণ। চোখের সামনে আগুনের গোলা। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। দুই পা বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল ক্লাবের সামনে। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। নিথর দেহের পাশে আহতদের গোঙানির শব্দ যেন মৃতপুরী। আরো কয়েকজন সহ আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর পরে আর কিছু বলতে পারি না। পরে আমাকে ও রতন দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শামীম ওসমান ও আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জার্মানিতে পাঠান। টাকার অভাবে জার্মানিতে পুরোপুরি চিকিৎসা করাতে পারিনি। যতটুকু হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের বদৌলতে। জার্মানি থেকে ফিরে ভারতে চিকিৎসারত অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়েছি। এমনও দিন গেছে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেয়েছি। বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা ছিল সেটাও বন্ধ করে দেয় তৎকালীন বিএনপি-জামায়ত জোট সরকার এছাড়াও বিভিন্নভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে।`

তিনি আরো বলেন, ‘এখন কৃত্রিম পা নিয়ে কিছুটা চলাফেরা করছি। একটা বীমা কোম্পানিতে চাকরি করি। আমার স্ত্রী সুতপা শীল রমা একটি বেসরকারি স্কুলের চাকরি করেন। ছেলে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে। এ নিয়েই সংসার চলছে।’

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, তাই একে আর ভয় পাই না। যারা চাষাঢ়াসহ সারা দেশে এ বর্বরোচিত বোমা হামলা চালিয়েছে, আমৃত্যু তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাব।`

তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে কখনো পদ চাই নাই। আমরা কাছে ভালো লাগে না চেয়ে নেওয়া বা হাত পাতা।  যোগ্যতা অনুযায়ী রাজনীতিতে আসা উচিত। সর্বনি¤œ এক মেধা থাকা উচিত। কারণ রাজনীতি একটা বিশাল ব্যাপার। রাজনীতিবৃদদের কাছে দেশ পরিচালনার দ্বায়িত পড়ে, মানুষের সেবার দ্বায়িত পড়ে। সেখানে যদি কোন কিছু জানা না থাকে, কোন মেধা না থাকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।’

চন্দন শীল বলেন, ‘আমি মনে করি এটি একটি দল। এ দলের ক্যাপ্টেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমার সব থেকে বড় আত্মতৃপ্তি হচ্ছে আমি দলের একজন প্লেয়ার। স্কোয়াডে আছি। বাইরে থাকলে কি করার আছে। সাইড লাইনেই হোক বা স্ট্যান্ডিং লাইনেই হোক টিমে আছে। অধিনায়ক যখন মনে করে আমাকে খেলাতে পারে।’

স্ত্রী সুতপা শীল রমা বলেন, `পা হারালেও ও তো (চন্দন) বেঁচে আছে। আমার সিঁথির সিঁদুর তো আর মুছে যায়নি। এতেই আমি সুখী।`

চন্দন শীল বলেন, তবুও প্রত্যাশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন শোষন মুক্ত সমাজ ও শোষন মুক্ত সোনার বাংলা। যেখানে অভাব অনটন থাকবে না। মানুষের যে মৌলিক অধিকার গুলো সেগুলো পূরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী অনেক উন্নয়ন করছেন। আশা করি সেটা পূরণ হবে।’

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে ২০০১ সালে ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় ২০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। ১৭ বছরেও বিচার হয়নি এসব বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের। এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি এসব পরিবারগুলো। নিহতদের পরিবারগুলো দাবি করছে নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ১৬ জুন বোমা হামলা দিবস হিসেবে অন্তত নারায়ণগঞ্জে সরকারীভাবে পালন ও নিহতদের স্মরণে স্মৃতি ফাউন্ডেশন করা।

সেদিন নিহত হয়েছিল শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারী তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক মহিলা। নিহত মহিলার পরিচয় পেতে তেমন কোন চেষ্টা করেনি প্রশাসন। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।
 

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সাক্ষাৎকার -এর সর্বশেষ