৩ আশ্বিন ১৪২৫, বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় বন্ধু যেভাবে ভয়ংকর ঘাতক, খুন হয় ফ্লাটেই


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:১০ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার


প্রিয় বন্ধু যেভাবে ভয়ংকর ঘাতক, খুন হয় ফ্লাটেই

বন্ধুই বন্ধুর ঘাতক। এমন বন্ধু যিনি বন্ধুর জন্য সকল কিছু উজাড় করতে পারেন। যেই বন্ধুর টাকায় যার জীবন রক্ষা হলো। ফিরে পেল সুখ। দীর্ঘ হলো আয়ূষ্কাল। ফিরে পেল প্রিয় পরিবারের ছোঁয়া। রঙিন দুনিয়া হলো আরো রঙিন। সেই বন্ধুকে কী ভাবে সম্ভব হলো হত্যা করার। এমন ঘটনাই শোনা যাচ্ছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের টুকরা লাশ নিয়ে।

প্রবীর ঘোষের মালিকানা ভোলানাথ জুয়েলার্সের পাশেই পিন্টু জুয়েলার্স। এই পিন্টু জুয়েলার্সের মালিক পিন্টু দেবনাথের সাথে প্রবীর ঘোষের বন্ধুত্ব অনেক পুরনো। যার সূত্র ধরেই পরের প্রজন্ম পিন্টু দেবনাথ এবং প্রবীরের মধ্যে বন্ধু সম্পর্ক গড়ে উঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় আরো গাড় হয়। গত কয়েক বছরে পিন্টু দেবনাথ আক্রান্ত হয় কঠিন রোগে। একবার হয় স্ট্রোক আবার হয় হার্ট অ্যাটাক। দুবারই পিন্টু দেবনাথের অবস্থা হয় সংকটাপন্ন। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন পিন্টু দেবনাথ। ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধু প্রবীর ঘোষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়েযান ভারতের মাদ্রাজে। ওপেন হার্ট সার্জারী করা হয় সেখানে। পরিচর্যার দায়িত্ব উঠিয়ে নেন নিজ কাঁধে। এর জন্য যত ব্যয় সকল কিছুই করেন বন্ধু প্রবীর ঘোষ। সংসার চালানোসহ যত খরচ সকল কিছু দেন প্রবীর ঘোষ। তার পরও বন্ধুকে খরচ এর অনূভব করতে দেননি। পিন্টু দেবনাথের শারীরিক ভাবে সুস্থ্য রাখার জন্যই তাকে অর্থনৈতিক ভাবে কোন কষ্টই বুঝতে দেননি।

সেই পিন্টু দেবনাথের বাড়ীর সেপটিক ট্যাংক থেকেই বন্ধু প্রবীর ঘোষের লাশ উদ্ধার। লাশ দেখে উপস্থিত সকলেই হতবাক। সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে একে একে প্রবীরের দেহের ছিন্ন ভিন্ন অংশ বের হতে থাকে। হাত, মাথা, পাসহ টুকরা বের হয়। ঘাতকরা যে নির্মম ভাবে হত্যা করে দেহ নিয়ে হলি খেলেছে তার স্বাক্ষর মিলেছে। এ অবস্থা দেখে উপস্থিত সকলেই বলে উঠেছে বন্ধু বন্ধুকে এভাবে হত্যা করতে পারে। এমন কথা এখন আমলপাড়া এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ সকলের মুখে মুখে।

নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে ওই লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। টুকরো টুকরো করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংকে। পঁচন ধরে যায় লাশের মধ্যে। প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে মাথা, পা, হাত ও শরীরকে বিচ্ছিন্ন করে। হত্যার পর অংশগুলো সিমেন্টের ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয়।

প্রবীর ঘোষ কালীরবাজার ভোলানাথ জুয়েলার্সের মালিক। গত ১৮ জুন থেকে সে নিখোঁজ ছিল। তাঁর সন্ধান দাবীতে ২১ দিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, নিহতের স্বজন, বিভিন্ন সংগঠন ও পরিবারের লোকজন মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আসছিল। এর মধ্যে নিহতের পরিবার প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করেছিল।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রবীর ঘোষের এক ভাই ইতালি প্রবাসী। তার পাঠানো টাকা দিয়ে পিন্টু ও প্রবীর সুদের ব্যবসা করতো। কিছু টাকা ছিল পিন্টুর কাছে। এসব নিয়ে পিন্টুর সঙ্গে প্রবীরের বিরোধ ছিল।

স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ মূলত আর্থিক লেনদনের বিরোধের কারণেই খুন হয়ে থাকতে পারেন প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। আর এ নৃশংস হত্যাকান্ডে জড়িত প্রবীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিন্টু দেবনাথ ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক বাবু। ১০ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মঈনুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলম ও  অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরফুদ্দিন প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রবীর ঘোষের এক ভাই সৌমিক ঘোষ ইতালী প্রবাসী। সেখান থেকে মোটা অংকের টাকা পাঠানো হয় প্রবীর ঘোষের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই টাকা লেনদেন হতো প্রবীর ও পিন্টুর মধ্যে। সম্প্রতি সৌমিক ঘোষ যখন দেশে আসে তখন থেকেই নিখোঁজ ছিল প্রবীর। সৌমিক দেশে আসার আগেই টাকার জন্য পিন্টুকে চাপ দিতে থাকে প্রবীর। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। পরে পরিকল্পনা করেই প্রবীরকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে পিন্টু ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক। প্রাথমিকভাবে এও ধারণা করা হচ্ছে পিন্টু যে বাসাতে থাকে সে বাসার ফ্লাটেই প্রবীরকে হত্যার পর ওই বাসার নিচে সেপটিক ট্যাংকে লাশ ব্যাগে করে ফেলে দেওয়া হয়।

এর আগে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলম জানান, গত ১৮ জুন প্রবীর চন্দ্র ঘোষ নিখোঁজ হলে পরিবারের জিডির ভিত্তিতে সদর থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করতে থাকে। কিন্তু পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি না হলে গত ৫ জুলাই বিষয়টি তদন্তের ভার দেয়া হয় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে। গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে সোমবার সকালে পিন্টু ও বাপেন ভৌমিককে বাবুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আটককৃতরা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে বলে স্বীকার করে। পরে তাদের সাথে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ পিন্টুর ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করে।

তিনি জানান, স্বীকারোক্তিতে আটককৃত দুইজন জানিয়েছে নিখোজ হওয়ার দিন পিন্টু ও বাবু প্রবীরকে পিন্টুর ফ্লাটে নিয়ে আসে। ওই ফ্লাটেই হত্যাকান্ডের পর প্রবীরের লাশ টুকরা করে বস্তায় ভরে সেফটি ট্যাংকে গুম করে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ