২৮ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮ , ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

UMo

ঠাণ্ডা মাথার খুনীর বেড়ে উঠা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৩:২৪ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৮ বুধবার


ঠাণ্ডা মাথার খুনীর বেড়ে উঠা

নারায়ণগঞ্জ শহরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টিতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে টুকরো টুকরো হত্যার ঘটনার পর থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে। আর এ ঘটনায় জড়িত রয়েছে প্রবীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিন্টু দেবনাথ। যিনি ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে ও তার দেখানো মতে তার বাড়ির নিচ তলার সেপটিক ট্যাংক থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে লাশের খন্ডিত অংশগুলো। সোমবার ৯ জুলাই রাতে ৩টি ব্যাগ থেকে ৫ টুকরো অংশ উদ্ধারের পর মঙ্গলবার উদ্ধার করা হয় বাকি অংশ।

কে এই পিন্টু দেবনাথ, তার সাথে নিহত প্রবীর ঘোষের কেমন সম্পর্ক ছিল তা নিয়ে চলছে এখন নানা আলোচনা। মঙ্গলবার ১০ জুলাই শহরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি যেখানে ছিল প্রবীর আর পিন্টুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেখানে আশেপাশের দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বারংবার প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল পিন্টু দেবনাথ কেন প্রবীর ঘোষকে এমন নিমর্মভাবে হত্যা করবে? হত্যা করে কিভাবে লাশের উপর দুই তলায় নিশ্চিন্তে ঘুমালেন, কিভাবে তিনি আবার লাশে পাশে দালানে নিজের ক্রয়কৃত দোকান বসে ব্যবসা পরিচালনা করলেন।

কে এই পিন্টু দেবনাথ
কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পিন্টু দেবনাথ প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর যাবৎ এই স্বর্ণ পট্টিতে রয়েছে। তার বাড়ী কুমিল্লা চন্দ্রনপুর। নারায়ণগঞ্জে তিনি একা আসেন এবং সুচতুর বুদ্ধিতে আজ দুই দোকানের মালিক এবং কোটিপতিও বটে। স্বর্ণপট্টি’র স্বর্ণের নকশা মাস্টার খ্যাত প্রয়াত অপু’র সহকারী ছিলেন পিন্টু দেবনাথ। দেখতে সুদর্শন পিন্টু দ্রুত নকশা কাজ বুঝে যাওয়ায় অপু তাকে দিয়ে অনেক স্বর্ণ তৈরি কাজ করাতেন। স্বল্পভাষী ছিলেন পিন্টু। কিন্তু তার কথায়ও অনেক সময়ে টনক নড়ে যেত সহকর্মীদের।

একজন স্বর্ণ শিল্পী জানান, পিন্টু দেবনাথের সঙ্গে তার একজন প্রশিক্ষকের স্ত্রী সাথে ছিল পরকীয়া। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নানা আলোচনা ছিল। পিন্টু দেবনাথ ছিলেন নারী লোভী, তার সুন্দর চেহারা ও বুদ্ধি মত্তা অনেক নারী সাথে তিনি সর্ম্পক রেখে ছিলেন।

পিন্টু আমলাপাড়া এলাকাতে রাশেদুর ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার যে ফ্লাটে থাকেন এক সময়ে ওই ফ্লাটেই থাকতেন অপু। প্রায় পনের বছর পূর্বে অপু রায় পরলোক গমন করলেও সে বাড়িতেই অপু রায়ের স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে থেকে যায় পিন্টু। পরে অপু রায়ের পরিবার তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। তখন থেকে একাই থাকা শুরু করে পিন্টু।

নকশা কর্মচারী থেকে কোটিপতি পিন্টু
আমলাপাড়া মরণ চন্দ্র কর্মকারের দোকানে প্রায় ৯বছর যাবৎ পিন্টু স্বর্ণের গহনার নকশা কাজে নিয়োজিত ছিল। একটি চক্রের পাইকারী স্বর্ণ বিক্রি সাথে পিন্টু জড়িয়ে যান। এতে টাকা সন্ধানে তার গ্রামের বাড়ী ভাইদের জায়গা বিক্রি করে টাকা স্বর্ণপট্টিতে পাইকারী স্বর্ণ ক্রয় বিক্রয়তে লাগান। তার বিক্রি টাকা তার জীবনের চাকা ঘুরে যান। ভাইদের জন্য তিনি গ্রামের বাড়ীতে জায়গা ক্রয় ও বাড়ী করে দেন। জমানো টাকা দিয়ে তিনি আমলাপাড়া ৮নং কে সি নাগ রোডের একটি ভবনে দোকান কিনে ‘পিন্টু স্বর্ণ শিল্পালয় স্বর্ণ দোকান’ গড়ে তুলেন। তিনি এই দোকান মালিক হিসেবে বসতে শুরু করে। স্বর্ণ ক্রয় ও বন্ধক করতে তিনি ছিলেন পারদর্শী। ক্রেতা বা বন্ধক ছুটাতে ব্যর্থ হলে সামনেই বলতেন, “স্বর্ণগুলো টুকরো টুকরো করে গলাইয়া দে”। এমনতা প্রায় সময় পিন্টু মুখে শুনে অনেক অবাক হতেন। এই সুন্দর মানুষ ও ঠান্ডা মানুষ কেমন কথা বলেন? পিন্টু আরেক দোকান ক্রয় করে স্বর্ণপট্টিতেই। তখন তার নিয়ে অনেক কানাঘুষা চলতো স্বর্ণপট্টিতে।

প্রবীরের সাথে পিন্টু সম্পর্ক
নিহত প্রবীর ঘোষ ছিলেন তারা বাবা ভোলানাথ ঘোষের দোকানের পলিশ শ্রমিক। তাদের নিজস্ব দোকান হলেও কষ্টে জীবন করতো প্রবীর ঘোষের পরিবার। ব্যবসার একটি অংশের টাকা থেকে বাবা ভোলানাথ ঘোষ ও প্রবীর ঘোষ মিলে তার ছোট ভাই সৌমিক চন্দ্র ঘোষকে ইটালিতে পাঠান। এরপর থেকে কিছু পরিবর্তন হয় প্রবীর পরিবারের। স্বর্ণ পলিশ ও নকশা কাজে গভীর সম্পর্ক হয় প্রবীর ও পিন্টু সাথে। প্রবীর ও পিন্টু সকল বন্ধুরা একত্রে ঠান্ডু মিয়ার বাড়ী আশেপাশে গলিতে আড্ডা জমতো। তাদের দুইজনের সাথে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক ছিল কম। ভোলানাথ ঘোষ অসুস্থ হওয়া পর থেকে বাবা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন প্রবীর ঘোষ। তখন দোকান ও পরিবার দিক দেখাশোনা করতো তাদের ছোট ছেলে বিপ্লব চন্দ্র ঘোষ। এ সময় বাড়ীতে আসা যাওয়া ছিল পিন্টু দেবনাথের। পিন্টু দেবনাথ প্রায় সময় বাড়ীতে আসতেন এবং অনেক সময় কাটাতেন বলে জানা গেছে। তার সাথে সত্যতা পাওয়া গেছে প্রবীরের ছোট ভাই বিপ্লব চন্দ্র ঘোষের কাছে। তিনি বলেন, প্রবীর দা সাথে প্রায় সময় পিন্টু বাসা আসতেন। তিনিই যে আমার দাদা থেকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করবে ভাবতে পারছি না।

একটি সূত্রে জানা গেছে, ক্রেতাদের স্বর্ণ বিক্রি ও বন্ধক নিয়ে প্রবীর ও পিন্টুর সম্পর্ক ছিল অনেক মজবুত। তাদের মধ্যে কমিশনও ভাগবাটোয়ারা হত। কিন্ত সে টা কেউ জানতো না। আমলাপাড়া ঠান্ডু বাড়ীতে পিন্টু ঘরেই রাত ও গভীর রাতও বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা জমতো। প্রতিবেশীরা তারা স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ভাড়া থাকতেন বলেন কেউ তাদের প্রতিবাদ বা জিজ্ঞাসা করতেন না।

প্রবীরকে কেন হত্যা করলেন পিন্টু?
স্বর্ণ শিল্প শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুকুল মুজুমদার বলেন, এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে এভাবে নিমর্ম হত্যাকান্ড করতে পারে, বিশ্বাস করতে পারছি না। তাদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। ৭ থেকে ৮বছর আগে বুকের ব্যাথা নিয়ে প্রবীর দীর্ঘ সময় পিন্টু দেন। পিন্টুকে ভারতে ওপেন হার্ট সার্জারী করে আনেন প্রবীর ঘোষ। অনেক সময় শুনেছি, ও টাকা প্রবীর দিয়ে আবার শুনে পিন্টু টাকা দিয়ে করেছে। তাদের বন্ধুদের মধ্যে বিষয় তাই কেউ ইচ্ছা করে জানতে চায়নি। ব্যবসা নিয়ে প্রবীরকে পিন্টু হত্যা করতে পারে না, এখানে অন্য কোন বিষয় রয়েছে। আমাদের দাবি, পিন্টু দেবনাথকে ডিবি পুলিশ কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদে কেন খুন করলে স্বর্ণ ব্যবসায় একটি কালো অধ্যায় রচনা করলেন।

মুকুল মজুমদার আরো জানান, প্রবীর পিন্টু ও তাদের বন্ধুদের সম্পর্ক ভালো ছিল। কখনো কোন সময় কোন কথা শুনি নাই। এমনকি প্রবীর পরিবারও কোন দিন কোন কথা বলেনি।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ