৭ শ্রাবণ ১৪২৫, সোমবার ২৩ জুলাই ২০১৮ , ৬:২০ পূর্বাহ্ণ

প্রাণের প্রতিদানে খুন


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪২ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০২:৪২ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৮ বুধবার


প্রাণের প্রতিদানে খুন

সম্প্রতি সময়ে নারায়ণগঞ্জের সকল হত্যাকান্ডকে ছাড়িয়ে গেছে শহরের কালীরবাজার এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে হত্যার পর ৬ টুকরো করে লাশ সেপটিক ট্যাংকে ফেলা দেওয়া। জীবন বাঁচানো বন্ধুর প্রাণ নিয়ে প্রতিদান দিয়েছে ঘাতক বন্ধু। প্রাণ নিয়ে খ্যান্ত হয়নি। বরং বন্ধুর বাঁচানো প্রাণের দোহায় দিয়েও খুনের ঘটনা আড়াল করতেও ছিল দোর্দান্ত সব কৌশল। তবে সবই কিছুরই প্রমাণ মিলে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের দাগ থেকে যায়, মুছে যায় না’।

৯ জুলাই সোমবার রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানের শহরের আমলাপাড়া এলাকার রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার ৪ তলা ভবনের নিচতলার সিড়ির নিচে ওয়াসার পানির ট্যাংকের (বর্তমানে সেপটিক ট্যাংক হিসেবে পরিচিত) ভিতর থেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের খন্ড খন্ড মরদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়। ৫ খন্ড সেখান থেকে উদ্ধার করা হলেও এক অংশ উদ্ধার করা হয় সেই বাড়ির পাশে ময়লার ড্রেন থেকে। তবে এসব কিছুই ছিল সুক্ষ্ম পরিকল্পনা।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মে শহরের কালীবাজার এলাকা থেকেই নিখোঁজ হন প্রবীর ঘোষ। ফোনের লোকেশন ও সিসি টিভি ফুটেজও একই তথ্য পায় পুলিশ। সে সময়ই মোবাইল ফোনের কল লিস্টের শেষ নাম্বার ছিল প্রিয় বন্ধু পিন্টু দেবনাথের। তাছাড়া একটি সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায় প্রবীর পিন্টুর পিছনেই গিয়েছিলেন। তার পর থেকে প্রবীরের মোবাইল বন্ধ ও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া সহ সকল আন্দোলনে অগ্রভাগে জায়গা নিয়েছিল পিন্টু। স্লোগন, হুশিয়ারী, হুমকি সবই প্রশাসনকে দিয়ে গেছেন যাতে প্রিয় বন্ধু প্রবীরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ফোন লিস্টের তালিকা ও সিসি টিভি ফুটেজের জন্য একাধিক বার পুলিশ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় ডেকে নিয়ে যায় পিন্টুকে। সেখানে জিজ্ঞাস করা হয় কি কথা হয়েছিল শেষ মুহূর্তে। বার বারই ভুল তথ্য দিয়েছে। শাটের বুতাম খুলে দেখিয়েছে ওপেন হার্ট সার্জারী করা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ার অভিনয়ও করে হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হয়। সেজন্য পুলিশ স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সামনে, বন্ধুদের সামনে, পরিবারের স্বজনদের সামনে একাধিক পিন্টুর সুবিধা মতো স্থানে প্রবীরের সন্ধানে খোঁজ করেন। কিন্তু প্রতিবারই অসুস্থ্য হওয়ার অভিনয় ছিল তার। তবে পুলিশের গ্রেফতারের পর এসব অভিনয়ের বিষয় ফ্লাশ হয়ে যায়। পিন্টুর হৃদয় যে বন্ধুর জন্য বার বার কম্পন হয় সেই বন্ধু প্রবীরের হৃদয়ের কম্পন তার নির্দেশে বন্ধ করে দেয় ভাড়াটে খুনিরা।

নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক অঞ্চল) মো. শরফুদ্দিন বলেন, প্রথম থেকেই সন্দেহের তালিকায় ছিল পিন্টু। কিন্তু তার ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে। বুকের দিকে তাকলে মায়া হতো। তাছাড়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা যায় পিন্টু ও প্রবীর কালীরবাজারের সেরা জুটি। তাদের বন্ধুত্বের উদাহরণ দেওয়া হতো সবখানে। যার প্রমাণ হলে পিন্টু যতবার হার্টের সমস্যা হয়েছে প্রতিবারই বন্ধু প্রবীর পাশে দাঁড়িয়েছে। কখনো টাকা দিয়ে আবার কখনো সেবাযত্ম করে। বন্ধু পিন্টুর বিপদে সব সময় পাশে ছিল প্রবীর। এসব তথ্যের কারণে যতবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে ততবারই যতটা নরম ও স্বাভাবিকভাবে বলা যায় সেভাবেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ প্রাণের বন্ধুই খুন করলো বন্ধুকে। এজন্যই মা বাবা ছাড়া কেউকে বিশ্বাস করতে নেই।

তিনি আরো বলেন, যে বন্ধু বিপদে পাশে ছিল সেই বন্ধুকে হত্যা করে পিন্টু সুন্দর একটা নাটক করে বাঁচতে চেয়েছে। একাধিকবার অসুস্থ্য হওয়া, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ফোন আসা, বাড়ির নিচে লাশ রেখে নিশ্চিত ঘুমানো সব কিছুই ছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিনয়।

পুলিশ বলছে, প্রবীর ঘোষকে হত্যা করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। আর এতে ভাড়া করা হয় একদল ভাড়াটে খুনী। এর সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচজনের। প্রবীর ঘোষকে বাড়ি থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে তারই বন্ধু পিন্টু দেবনাথ তার ফ্লাটের বাসায় নিয়ে হত্যা করে। ভাড়াটে খুনীরা ছিল খুবই পেশাদার। খুবই সুক্ষ্মভাবে প্রবীরকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ওই ভাড়াটে খুনীরা একে একে বিচ্ছিন্ন করে প্রবীরে অঙ্গ প্রতঙ্গগুলো। আর সেগুলো পরে বাজারের ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয় নিচে থাকা সেপটিক ট্যাংকে। আর আলামাত নষ্ট করতে কাপড় ও বালিশগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। তবে ৬ টুকরো লাশের ৫ টুকরো তিনটি ব্যাগে ভরে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হলেও পায়ের গোড়ালির অংশ ফেলা হয় পাশের একটি ড্রেনের পাশের ময়লার স্তূপে। সোমবার রাতে সেপটিক ট্যাংক হতে তিন ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ও মঙ্গলবার জুলাই বাকি টুকরো উদ্ধার করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পিন্টু দেবনাথের ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে। সে কারণেই সে নিজে ঝুঁকি নিতে চায়নি। এ কারণেই সে একদল পেশাদার কিলার গ্রুপকে কন্ট্রাক করে। তাছাড়া বাড়িতে পিন্টু থাকতো ৪ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্লাটে। প্রায়শই সেখানে প্রবীর যাতায়াতের কারণে আশেপাশের লোকজন বিষয়টি নিয়েও খুব একটা নজর দেয়নি। সেখানে মাঝেমধ্যেই প্রবীর গিয়ে আড্ডা দিত। আর বাড়ির নিচে যেটা সেপটিক ট্যাংক যেখানে লাশ ফেলা হয় সেটা এক সময়ে ওয়াসার পরিত্যক্ত পানির ট্যাংক। এখন সেটা সেপটিক ট্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লোকজন যাতে কিছু আঁচ করতে না পারে সেজন্য ওই ট্যাংকের ঢাকনার উপরে দেওয়া হয় বালু।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবীর ঘোষের মালিকানা ভোলানাথ জুয়েলার্সের পাশেই পিন্টুর একটি স্বর্ণের দোকান রয়েছে। তাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘ বছরের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় আরো গাড় হয়। গত কয়েক বছরে পিন্টু দেবনাথ আক্রান্ত হয় কঠিন রোগে। একবার হয় স্ট্রোক আবার হয় হার্ট অ্যাটাক। দুবারই পিন্টু দেবনাথের অবস্থা হয় সংকটাপন্ন। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন পিন্টু দেবনাথ। ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধু প্রবীর ঘোষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান ভারতের মাদ্রাজে। ওপেন হার্ট সার্জারী করা হয় সেখানে। সেই পিন্টু দেবনাথের বাড়ীর সেপটিক ট্যাংক থেকেই বন্ধু প্রবীর ঘোষের লাশ উদ্ধার।

কালীরবাজার স্বর্ণ শিল্প শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুকুল মুজুমদার বলেন, এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে এভাবে নিমর্ম হত্যাকান্ড করতে পারে, বিশ^াস করতে পারছি না। তাদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। ৭ থেকে ৮বছর আগে বুকের ব্যাথা নিয়ে প্রবীর দীর্ঘ সময় পিন্টু দেন। পিন্টুকে ভারতে ওপেন হার্ট সার্জারী করে আনেন প্রবীর ঘোষ। অনেক সময় শুনেছি, ও টাকা প্রবীর দিয়ে আবার শুনে পিন্টু টাকা দিয়ে করেছে। তাদের বন্ধুদের মধ্যে বিষয় তাই কেউ ইচ্ছা করে জানতে চায়নি। ব্যবসা নিয়ে প্রবীরকে পিন্টু হত্যা করতে পারে না, এখানে অন্য কোন বিষয় রয়েছে। আমাদের দাবি, পিন্টু দেবনাথকে ডিবি পুলিশ কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদে কেন খুন করলে স্বর্ণ ব্যবসায় একটি কালো অধ্যায় রচনা করলেন।

মুকুল মজুমদার আরো জানান, প্রবীর পিন্টু ও তাদের বন্ধুদের সম্পর্ক ভালো ছিল। কখনো কোন সময় কোন কথা শুনি নাই। সব জায়গায় তাদের বন্ধুত্বের উদাহরণ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেটা খারাপ উদাহরণের দৃষ্টান্ত হবে।

নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার পিন্টু যে বাড়িতে ভাড়া থাকতো সেই ৪ তলা ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ