স্প্রাইট আর বিস্কুট খাওয়ার সময়েই আঘাত করে হত্যা করা হয় প্রবীরকে

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

স্প্রাইট আর বিস্কুট খাওয়ার সময়েই আঘাত করে হত্যা করা হয় প্রবীরকে


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৩:০৩ পিএম, ১২ জুলাই ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৯:১৯ পিএম, ১২ জুলাই ২০১৮ বৃহস্পতিবার


স্প্রাইট আর বিস্কুট খাওয়ার সময়েই আঘাত করে হত্যা করা হয় প্রবীরকে

নারায়ণগঞ্জ শহরের কালীরবাজার এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে হত্যার বিষয়টি ধীরে ধীরে নিজেই স্বীকার করছেন গ্রেফতারকৃত বন্ধু পিন্টু দেবনাথ।

পিন্টু দেবনাথ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাতে মাদকের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৬ টুকরো করা হয়। বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। কিন্তু পা ব্যাগটি জায়গা হচ্ছিল না। পরে বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

১১ জুলাই বুধবার বিকেলের পর থেকে সে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করতে থাকে। ওপেন হার্ট ও বাইপাসের রোগী হওয়ায় ডিবির তদন্তকারী দল তাকে বেশ সতর্কভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এদিন সন্ধ্যায় সে জানিয়েছে মূলত ব্যবসায়িক বিরোধ আর আর্থিক লেনদেনের কারণেই ক্ষোভে প্রবীরকে হত্যা করেছে। একটি দোকানের পজিশন কেনা থেকে শুরু করে বন্ধকী স্বর্ণ ও টাকা নিয়ে প্রবীরের সঙ্গে বিরোধের জের ধরেই সে হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে। আর এ কিলিং মিশনে সে ব্যবহার করেছে চাপাতি। যে ফ্লাটে হত্যা করা হয়েছে প্রবীরকে পাশের ফ্লাটের লোকজন ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার নিরবতার সুযোগটিও সে কাজে লাগায়। রাতেই পিন্টুকে নিয়ে অভিযানে বের হয় ডিবির একটি টিম। পিন্টুর দেওয়া তথ্যমতে চাপাতি বিক্রির দোকান, চাপাতি যে দোকানে শান দেওয়া হয়েছে সে দোকান পরিদর্শন করে সত্যতাও পেয়েছে ডিবির তদন্ত দল। তবে তারা এতেও অবাক হয়েছে বাইপাসের রোগী কিভাবে একজন মানুষকে এভাবে হত্যার পর লাশ খন্ড খন্ড করলো।

ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, সোমবার আটকের পর থেকেই পিন্টু একেক সময়ে একেক ধরনের তথ্য দেয়। মূলত সে প্রচন্ড চতুর। কারণ ১৮ জুন প্রবীর নিখোঁজর পর থেকেই একের পর এক অভিনয় করতে থাকে পিন্টু। প্রবীর ইস্যুতে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভে নিজেই ছিলেন অগ্রভাগে। খোদ প্রবীরের পরিবারের লোকজনদেরও নিয়মিত সান্তনা দিতে ছুটে যেত। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলতো। থানায় তাকে একাধিকবার ডেকে নিলেও সেখানে ছিল তার অভিনয়  ও চাতুরতা। সোমবারও সে একেক সময়ে একেক ধরনের বক্তব্য দেয়। কথার এক পর্যায়ে সে স্বীকার করে লাশ তার বাড়ির নিচের সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিয়েছে। ওই সময়ে সে জানায় সে কাজটি করে নাই। কয়েকজন লোক এসে করেছে। কিন্তু মঙ্গলবার রিমান্ডে নেওয়ার পর আবারো নতুন তথ্য প্রদান করে পিন্টু। ওই সময়ে সে জানায় ভাড়াটে ৪ থেকে ৫ জন মিলে করেছে। তবে সে জানে কোথায় লাশের খন্ড আছে। পরে তার দেওয়া তথ্য মতে লাশের দুই পায়ের গোড়ালির নিচের অংশ উদ্ধার করে। আর এর আগে সোমবার উদ্ধার করা হয় তিনটি ব্যাগে ৫টি অংশ।

বুধবার জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু জানায়, শহরের কালীরবাজার এলাকাতে স্বর্ণ মার্কেটে ‘পিন্টু স্বর্ণালয়’ নামের একটি দোকান রয়েছে। কয়েক মাস আগে প্রবীরের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নিয়ে এ দোকানের পজিশন ক্রয় করে পিন্টু। কিন্তু দুই মাস ধরেই পিন্টুর কাছে টাকা চাচ্ছিল প্রবীর। এ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। চরম মনোমালিন্য দেখা দেয় পিন্টুর সঙ্গে প্রবীরের। এসব কারণেই এক পর্যায়ে প্রবীরকে হত্যার পরিকল্পনা করে পিন্টু। আর সে কারণে বেছে নেয় ঈদের ছুটির সময়টাতে। পিন্টু শহরের আমলাপাড়া এলাকাতে রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার দুই তলার একটি ফ্লাটে বসবাস করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিন্টুর দেওয়া তথ্য মতেই রাতেই শহরের কালীরবাজারের একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিদর্শন করা হয় যেখান থেকে সে চাপাতি কিনেছিল। ওই দোকান মালিক সত্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া শহরের চারারগোপ এলাকাতে চান্দু অ্যান্ড কোং দোকানের পাশে কামারের দোকানে গিয়ে ওই চাপাতি শান করা হয়। ওই দোকান মালিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মঙ্গলবার পিন্টু বলেছিল কিলিং মিশনে ভাড়াটে খুনী ছিল। কিন্তু বুধবার সে তথ্য থেকে সরে এসে নিজেই একা খুন করেছে জানিয়েছে। কিন্তু সবগুলো তথ্যই যাচাই বাছাই চলছে। কারণ শুরু থেকেই পিন্টু ছিল বেশ চতুর। ফলে তার একটি তথ্যে উপর ভিত্তি করা চলবে না।

ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পিন্টু দেবনাথ পুরো চতুর ও কৌশলী লোক। গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন পুরো ঘটনা নিজের উপর নিতে চাচ্ছে। একটি মানুষকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করে একজন পারে না। কারণ বিভিন্ন প্রশ্নে কৌশলীতে পিন্টু দেবনাথ উত্তর দিচ্ছে। যেগুলোতে ধরা খাচ্ছে, সে সময় তিনি অসুস্থ হয়ে লুটে পড়তে চায়। পিন্টু কখনো একা, প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে হত্যা করতে পারে না। এখানে তার সাথে আরো লোক জড়িত রয়েছে। কিন্তু তিনি কিলিং মিশনে থাকা জনকে নামের তালিকায় উল্টো পাল্ট নাম বলছে। ফলে আমাদের তদন্তে কৌশলে করতে হচ্ছে। পিন্টু স্বীকারোক্তিতে যে বর্ণণা দিয়েছে তার সাথে বাস্তবতা অনেক কম।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, কখনো কখনো জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছে। তার সেসব তথ্য মিলিয়ে পরে দেখা হচ্ছে। সে জানিয়েছে তার ফ্লাটে হত্যার সময়ে বালিশ চাপা দেওয়া হয়। ব্যবহার করা হয় ঘরে থাকা বিছানার চাদর। কিন্তু এগুলোতে লাল রক্ত থাকায় পিন্টু নিজেই সেগুলো চারারগোপ দেলোয়ার টাওয়ারের বিপরীতে শীতলক্ষী নদীতে ফেলে দেয়। মঙ্গলবার রাতে ডিবির একটি টিম পিন্টুকে নিয়ে ওই ফেলে দেওয়া স্থান তল্লাশী করে। সেখান থেকে ১০ থেকে ১২টি ব্যাগ উদ্ধার করলেও আলামত হিসেবে ওই চাদর ও বালিশ পাওয়া যায়নি।

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে তাদের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে প্রবীর ঘোষের এক ভাই সৌমিক ঘোষ ইতালী প্রবাসী। সেখান থেকে মোটা অংকের টাকা পাঠানো হয় প্রবীর ঘোষের কাছে। ধারণা করা হচ্ছে ওই টাকা দিয়েই হয়তো পিন্টু দোকানের পজিশন ক্রয় করেছিল। সম্প্রতি সৌমিক ঘোষ যখন দেশে আসে তখন থেকেই নিখোঁজ ছিল প্রবীর। সৌমিক দেশে আসার আগেই টাকার জন্য পিন্টুকে চাপ দিতে থাকে প্রবীর। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। পরে পরিকল্পনা করেই প্রবীরকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে পিন্টু ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক। প্রাথমিকভাবে এও ধারণা করা হচ্ছে পিন্টু যে বাসাতে থাকে সে বাসার ফ্লাটেই প্রবীরকে হত্যার পর ওই বাসার নিচে সেপটিক ট্যাংকে লাশ ব্যাগে করে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পালিয়ে বাপেন কুমিল্লা সীমান্তবর্তী এলাকাতে চলে যায়। সেখান থেকে প্রবীরের মোবাইলের সীম ব্যবহার করে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্নজনের কাছে ম্যাসেজ পাঠায় বিষয়টি ভিন্ন দিকে নেওয়ার জন্য। তখন প্রবীরের সেই মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ করে ফেলে বাপেন। পরবর্তীতে বাপেন শহরের কালীরবাজার চলে আসে। সেখানে এসে মোবাইল সীম পরবর্তনের পর ট্র্যাকিংয়ে বাপেন ধরা পড়ে। সোমবার সকালে বাপেন ও প্রবীরকে আটক করা হলে বেরিয়ে আসে মূল তথ্য। বাপেনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রবীরের মোবাইল ফোন।

নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার পিন্টু যে বাড়িতে ভাড়া থাকতো সেই ৪ তলা ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ