পিন্টুকে নারী কেলেংকারিতে ফাঁসিয়ে পুঁজি দখলের হুমকি

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

পিন্টুকে নারী কেলেংকারিতে ফাঁসিয়ে পুঁজি দখলের হুমকি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:৩৬ পিএম, ১৫ জুলাই ২০১৮ রবিবার | আপডেট: ০৮:৩৬ এএম, ১৫ জুলাই ২০১৮ রবিবার


পিন্টুকে নারী কেলেংকারিতে ফাঁসিয়ে পুঁজি দখলের হুমকি

নারায়ণগঞ্জ শহরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষ হত্যার পেছনে তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনা ছিল জানিয়েছেন পিন্টু দেবনাথ যিনি আদালতে জবানবন্দীতে দায় স্বীকার করেছেন। প্রবীর ঘোষের ঘনিষ্ঠ এ বন্ধুর বক্তব্য, তার কাছ থেকে প্রবীর প্রচুর টাকা ও স্বর্ণ পেত। এসব টাকা দিতে বিলম্ব হওয়ায় বিষয়টি প্রবীর আমলাপাড়া এলাকার একজন ব্যক্তিকে জানাতো। ওই ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে পিন্টুর সঙ্গে ওই ব্যক্তি কথা বলতো। এতে ওই ব্যক্তি কদাচিৎ পিন্টুকে অস্ত্র প্রদর্শণ করে হুমকি দিয়ে বলতো ‘তোর ব্যাপারে প্রবীর অনেক ক্ষিপ্ত তোকে যে কোন সময়ে মেরে ফেলতে পারে। নারী কেলেংকারী করে তোকে পুলিশী হয়রানি করে তোর সব পুঁজি কেড়ে নেওয়া হবে।’

ওই ব্যক্তির এমন বক্তব্যে বেশ হতবিহবল হয়ে পড়েন পিন্টু। অব্যাহত এ ধরনের হুমকির কারণেই এক পর্যায়ে প্রবীরকে হত্যার ছক কষে পিন্টু।

১৪ জুলাই শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালতে পিন্টুর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে উঠে আসে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।

দুপুর ২টা হতে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত কয়েক দফা বিশ্রামের পাশাপাশি চলে জবানবন্দী গ্রহণ। পিন্টুর বাইপাস সার্জারী থাকায় তার কথামতই পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রদান করেই এ জবানবন্দী রেকর্ড করা হয় বিচারকের খাসকামরায়।

জবানবন্দী গ্রহণ শেষে পিন্টুকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে গত ৯ জুলাই সকালে শহরের কালীরবাজার এলাকা থেকে পিন্টুকে গ্রেফতার করা হয়। সে রাতেই তার দেখানো মতে শহরের আমলপাড়া এলাকার রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির নিচ তলার সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার করা হয় প্রবীরের খন্ডিত লাশ। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্লাটে ভাড়া থাকেন পিন্টু।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান শেষে তার সামনেই গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এস আই মফিজুল ইসলাম। তাঁর দেওয়া লিখিত প্রেসনোটে কেন হত্যা করা হলো প্রবীরকে বিষয়ে লেখা হয় ‘প্রবীরের বন্ধকি স্বর্ণ আত্মসাৎ এবং প্রবীরের বিভিন্ন বিষয়ের রূঢ় আচরণ এবং পিন্টুকে নারী কেলেংকারীতে ফাঁসিয়ে দিয়ে প্রবীর কর্তৃক পিন্টুর ব্যবসার পুঁজি দখলের প্ররোচনা দাতার কু প্ররোচনায় শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে প্রবীরকে হত্যা করা হয়।’

 

এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিন্টু ও প্রবীরের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব থাকলেও কিছু বিষয় নিয়ে প্রবীর ও পিন্টুর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ইতালি প্রবাসী ভাইয়ের পাঠানো প্রায় অর্ধকোটি টাকা সুদের ব্যবসায় খাটা ছিল প্রবীরের। আর এ ব্যবসার অংশীদার ছিলেন পিন্টু। ব্যবসার হিসাবপত্রও ছিল পিন্টুর কাছে। এই টাকা ফেরত দেয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পিন্টুর কাছে প্রবীরের বন্ধকীর ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা ছিল। এছাড়া স্বর্ণ ভবনে পিন্টু স্বর্ণালয় নামের দোকানের পজিশন কেনা বাবদ আরো ১০ লাখ টাকা লোন নেয় প্রবীরের কাছ থেকে। মূলত এসব টাকা, স্বর্ণ ও দোকান আত্মসাৎ করতেই পিন্টু নানা ধরনের ফন্দি আটতে থাকে। বিপরীতে পিন্টু এসব টাকা ও দোকান নিয়ে গড়িমসি করায় বিষয়টি সে আমলাপাড়া এলাকার একজন ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করে। ওই ব্যক্তির সঙ্গে গত দুই মাস ধরেই বিষয়টি বেশ বলে আসছিল প্রবীর। পরে ওই ব্যক্তি আবার প্রবীরের কথাগুলো বিকৃত করে উল্টো পিন্টুকে হুমকি প্রদান করতে থাকে। পিন্টুকে ওই ব্যক্তি কয়েকবার শাসিয়েও দেয়। শেষে এও বলে, প্রবীরের ঝামেলা শেষ না করলে পিন্টুকে নারী দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে। তখন পিন্টু জেলখানায় গেলে সব কিছু হাতিয়ে নিবে প্রবীর। এছাড়া কয়েক বছর আগে ভারতে পিন্টুর হার্টের চিকিৎসা হয়। চিকিৎসার সময় ভারতে একটি রুম ভাড়া নিয়ে পিন্টুর সঙ্গে প্রবীরের ঝগড়া হয়। এ সময় স্বজনদের সামনে পিন্টুকে প্রবীর অপমান করলে তার মনে ক্ষোভের জন্ম নেয়। এ ক্ষোভ থেকে প্রবীরকে খুন করে পিন্টু।

এদিকে গত দুই মাস ধরে আমলাপাড়া এলাকার ওই ব্যক্তির অব্যাহত হুমকির কারণে পিন্টু শেষতক বাধ্য হয় প্রবীরকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে। কারণ ওই ব্যক্তি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ৪ দফায় পিন্টুর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় প্রায় ৩ লাখ টাকা। আবারো টাকা চাওয়ার কারণে পিন্টু শেষ সিদ্ধান্ত নেয়।

ডিবির একটি সূত্র জানান, ৯ জুলাই লাশ উদ্ধারের সময়ে ওই ব্যক্তি এগিয়ে এসেছিলেন ঘটনাস্থলে। ছিল তার মায়াকান্নাও। ওই ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে ডিবি তাদের নজরবন্দী করে রেখেছে। যে কোন সময়ে তাকেও আটক করা হবে।

জবানবন্দীতে পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিন্টুর দেওয়া তথ্য মতেই রাতেই শহরের কালীরবাজারের একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিদর্শন করা হয় যেখান থেকে সে চাপাতি কিনেছিল। ওই দোকান মালিক সত্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া শহরের চারারগোপ এলাকাতে চান্দু অ্যান্ড কোং দোকানের পাশে কামারের দোকানে গিয়ে ওই চাপাতি শান করা হয়। ওই দোকান মালিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ডিবি পুলিশের এক কর্মকতা জানান, পিন্টু দেবনাথে বসত ঘরে প্রবেশ করার পর হত্যার আলামত কিছু না পাওয়া গেলেও কিছু হয়েছে এই রুমে তা নিশ্চিত। পুরাতন আলমারী থেকে একটি বটি উদ্ধার করা হয়েছে। বটিটি হালকা সাদা সাদা মরিচা পড়ে ছিল। পিন্টু এ ব্যাপারে গোয়েন্দাদের জানিয়েছে পূজা জন্য বটিটি বাসায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু ঘরে কোন প্রতিমা দেখা যায়নি। পরে জানায় প্রতিমাটি তার পিন্টু শিল্পালয় দোকানে। আকিজ সিমেন্টের একটি ব্যাগে তার স্বর্ণের বাক্স রাখা পাওয়া গেছে। হত্যার আগে প্রবীরকে যে দুইটি বিস্কুট প্যাকেট একটি খাবারের প্লেটে অ্যাপায়ন করা হয়েছিল, সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু প্রবীরকে যে কোল্ড ডিংক খাওয়ানো হয়, সে বোতল সেই দিন ফেলে দিয়েছে বলে জানায় পিন্টু।

নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার পিন্টু যে বাড়িতে ভাড়া থাকতো সেই ৪ তলা ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ