পিন্টু ও রত্মা মিলে স্বপনের লাশ করে ৭ টুকরো

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০১:৩৬ পিএম, ১৯ জুলাই ২০১৮ বৃহস্পতিবার



পিন্টু ও রত্মা মিলে স্বপনের লাশ করে ৭ টুকরো

নারায়ণগঞ্জ শহরের আলোচিত ব্যবসায়ী প্রবীর কুমার ঘোষ ও স্বপন কুমার সাহা হত্যাকান্ডের ঘটনায় বেশ আলোচিত পিন্টু দেবনাথ। তিনজনই ছিলেন বন্ধু। এর মধ্যে ২১ দিন নিখোঁজ থাকার পর ৯ জুলাই উদ্ধার করা হয় প্রবীর ঘোষের লাশ। আর ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ রয়েছে স্বপন কুমার সাহা। সে রাতেই তাকে পিন্টুর একই ফ্লাটে হত্যা করা হয়েছে। আর প্রবীরকেও হত্যা করা হয়েছে পিন্টুর ফ্লাটে। তাকে করা হয় ৭ টুকরো।

স্বপন হত্যায় গত ১৫ জুলাই রাতে মাসদাইর এলাকা থেকে গ্রেফতার হন স্বপন ও পিন্টুর বান্ধবী হিসেবে পরিচিত রত্মা রাণী চক্রবর্তী।

১৮ জুলাই সন্ধ্যায় রত্মা ও পিন্টুকে নিয়ে মাসদাইরে রত্মা যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়িতে যায় পুলিশের একটি টিম- জানিয়েছেন প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ারা। তারা জানান, পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি রত্মা ও পিন্টুকে নিয়ে ফ্লাটে অভিযান চালায়। ওই সময়ে ভাড়াটিয়াদের সামনেই পুলিশকে পিন্টু ও রত্মার দেখানো মতে ২য় তলার প্রথম ফ্ল্যাট থেকে স্বপন কুমার সাহাকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত শিল পুতা, বটি, রক্তমাখা বিছানা চাদর ও তোষক উদ্ধার করা হয়।

ওই সময়ে ভাড়াটিয়াদের সামনেই এ সময় রত্মা ও পিন্টু জানায়, এই রুমেই স্বপনকে দুইজনের মিলে পিছন থেকে শিল পুতা দিয়ে আঘাত করি। পরে অচেতন অবস্থায় টয়লেটে নিয়ে তাকে ৭ টুকরো করি। ব্যাগে ভরে স্বপনের দেহ অংশগুলো পিন্টু ঠান্ডা মাথায় ভবনের পাশে খালি স্থানে রাখে। পরে সুযোগ বুঝে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় পিন্টু।

স্বপন কুমার সাহা নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে। স্বপনের বড় ভাই অজিত কুমার সাহা জানান, স্বপন কুমার সাহা ছিলেন খুচরো কাপড় ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। গত ৯ জুলাই প্রবীর ঘোষের লাশ উদ্ধারের পর পিন্টুর প্রতি আমাদের সন্দেহ বাড়ে। পরে ১৫ জুলাই বিষয়টি ডিবিকে জানালে রিমান্ডে থাকা পিন্টুর সহযোগি বাপন ভৌমিক বাবু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। সে তখন পিন্টু দেবনাথের এক বান্ধবী রত্মা রাণী চক্রবর্তীর সন্ধান দেন। তার মোবাইল নাম্বার পর্যালোচনা করে জানা গেছে স্বপনের মোবাইলটি রত্মা ব্যবহার করছে। ১৫ জুলাই রোববার রাতে তাকে আটকের পর তার কাছ থেকে স্বপনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল উদ্ধার করে। মূলত পিন্টুর টাকা নিয়ে স্বপন ভারতে একটি ফ্লাট বাসা ক্রয় করে। ওই ফ্লাট বাসা পিন্টুকে না দিয়ে বরং উল্টো হুমকি দিচ্ছিল স্বপন। এসব কারণেই ২০১৬ সালের মার্চে আমলাপাড়া এলাকার মোল্লা মামুন নিজেই পিন্টুকে হুমকি দিত। তখন থেকেই স্বপন সাহা ও প্রবীর ঘোষকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু। পরে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর স্বপনকে বাসায় ডেকে নেয় পিন্টু। পরে তার ফ্লাটে সে রাতে চাপাতি দিয়ে আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে মৃতদেহ খন্ড খন্ড করে ব্যাগে ভরে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়।

এদিকে স্বপন কুমার সাহা হত্যা মামলায় দুই আসামীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা ডিবি। ওই দুই আসামী হলেন পিন্টু দেবনাথ ও বাপান ভৌমিক বাবু। দুইজনই আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলার আসামী।

এর আগে গত ৯ জুলাই সকালে শহরের কালীরবাজার এলাকা থেকে দুইজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্য মতে রাতেই শহরের আমলপাড়া এলাকার রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীর ঘোষের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ১০ জুলাই দুইজনকেই ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

এর মধ্যে ১৪ জুলাই পিন্টু দেবনাথ আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে প্রবীর ঘোষ হত্যার দায় স্বীকার করে। পরে বাবুকে আরো ২দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এরই মধ্যে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নিখোঁজের পর পিন্টুর ফ্লাটেই খুন হন ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় স্বপন হত্যা নিয়েও তথ্য দেন বাবু। পরে ১৭ জুলাই বাপান ভৌমিক বাবু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছে।

এরই মধ্যে স্বপনের বড় বাই অজিত কুমার সাহা গত ১৬ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি হত্যা ও গুমের মামলা করে। সেখানে পিন্টু দেবনাথ, বাপান, গ্রেফতারকৃত আবদুল্লাহ আল মামুন ও রত্মা চক্রবর্তীকে আসামী করে মামলা করে।

এর আগে ঘাতক পিন্টু আদালতকে জানিয়েছে, অর্থ, বন্ধকী স্বর্ণালংকার ও দোকান আত্মসাতের পরিকল্পনায় এবং ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সে নিজ বন্ধু প্রবীরকে হত্যা করেছে। ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও