৩ দফায় বাজারের ব্যাগে ৭ টুকরো লাশের উপরে রাখা হয় সবজি

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ৩:১৪ অপরাহ্ণ

৩ দফায় বাজারের ব্যাগে ৭ টুকরো লাশের উপরে রাখা হয় সবজি


স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:৫৬ পিএম, ২১ জুলাই ২০১৮ শনিবার | আপডেট: ০৮:৫৬ এএম, ২১ জুলাই ২০১৮ শনিবার


৩ দফায় বাজারের ব্যাগে ৭ টুকরো লাশের উপরে রাখা হয় সবজি

নারায়ণগঞ্জ শহরের আলোচিত কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহাকে বান্ধবী রত্মা রানী কর্মকার মাসদাইরের নিজ ফ্লাটে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। সেখানে স্বপনকে হত্যার পর লাশ ৭ টুকরো করে রত্মা ও পিন্টু দেবনাথ। অথচ এক সময়ে এ রত্মার সঙ্গেই পিন্টুকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন স্বপন। তবে পরে স্বপনের চেয়ে পিন্টুর সঙ্গেই বেশী ঘনিষ্ঠতা বেড়ে উঠে রত্মার। পরিকল্পনা করে স্বপনকে হত্যার পর রত্মার ফ্লাটেই লাশ ৭ টুকরো করা হয়। পরে রাতে ৫টি বাজারের ব্যাগে করে ওই লাশ তিন দফায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নিয়ে ফেলে দেয় পিন্টু। মাসদাইর থেকে তিন দফায় ব্যাগগুলো আনা হয়। প্রথম দফায় একটি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুটি করে ব্যাগ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের পাশে সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে আনে। প্রত্যেকবার সে বৈঠা চালানো নৌকা রিজার্ভ করে বন্দর ঘাটে যাওয়ার জন্য। পরে মাঝির অগোচরে ব্যাগগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। আর মাসদাইর থেকে রিকশায় করে লাশবোঝাই ব্যাগগুলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য উপরে দেওয়া হয় সবজি।

এদিকে স্বপনের ৭ টুকরো লাশের সন্ধানে শীতলক্ষ্যা নদীতে তল্লাশী চালানো হয়েছে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় রিমান্ডে থাকা আসামী পিন্টু দেনবাথের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার ২০ জুলাই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেন্ট্রাল খেয়াঘাট এলাকাতে ওই অভিযান চালানো হয়। তবে তল্লাশীতে লাশের কোন আলামত পাওয়া যায়নি।

এর আগে ১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী রত্মা রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। এর আগের দিন রাতে শহরের মাসদাইর এলাকাতে রত্মা যে ফ্লাটে বসবাস করেন ওই ফ্লাটে অভিযান চালিয়ে স্বপন হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো বটি, শিলপুতা, রক্তমাখা চাদর, তোষক উদ্ধার করা হয়।রত্মা পুলিশকে জানিয়েছে তার ফ্লাটেই ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে স্বপনকে হত্যা করা হয়। ওই কিলিং মিশনে ছিল রত্মা ও পিন্টু দেবনাথ। ফ্লাটে অভিযানের সময়ে রত্মা ও পিন্টু দুইজনই উপস্থিত ছিলেন। তারাই মূলত ডিবিকে কিভাবে স্বপনকে হত্যা করেছে তার সবকিছু তুলে ধরেন এবং পুরো ঘটনা জানান। সেদিন দুপুরে পিন্টু দেবনাথকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

স্বপন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এস আই মফিজুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে রিমান্ডে পিন্টু কিছু তথ্য প্রদান করেছে। সে স্বীকার করেছে স্বপনকে হত্যার বিষয়টি। হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়েছে। তার দেওয়া তথ্য মতেই শুক্রবার নদীতে তল্লাশী চালানো হয়। তবে এদিন লাশের কোন অংশ বা আলামত পাওয়া যায়নি।

এর আগে প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলায় ৯ জুলাই গ্রেফতার হন পিন্টু দেবনাথ। সেদিন তার দেখানো মতে শহরের আমলাপাড়া এলাকার ফ্লাট বাসার সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৮ জুন রাতেই প্রবীরকে হত্যা করেছিল প্রবীর।

এদিকে আদালতে রত্মা জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলায় হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্মা রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় মাসদাইরের ওই ফ্ল্যাটে। এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্মা রানী। এতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন। এরপর শীল পাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করে পিন্টু। পরে বাথরুমে নিয়ে বটি দিয়ে লাশ গুমের জন্য সাত টুকরো করে বাজারের ব্যাগে ভরে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ফেলে দেয় পিন্টু দেবনাথ।

গ্রেফতারকৃত রত্মা আদালতকে জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের দালাল স্বপন কুমার সাহা, আমলাপাড়া এলাকার স্বর্ণব্যাবসী পিন্টু ও স্বর্ণব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর রত্মা রানী ছিলেন পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বান্ধুবী। বিয়ে আশ্বাস দিয়ে রত্মা রানীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ধার নেয় পিন্টু। এরপর থেকে রত্মা রানী প্রায় সময় পিন্টুর ফ্ল্যাটে যাতায়াত করত এবং তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন মেলা মেশা চলত। পিন্টুকে ভারতে বাড়ি কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখায় স্বপন। এরপর ভারতে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটও পিন্টুর টাকায় স্বপন তার ভাগ্নির নামে কিনে দেয়। তখন পিন্টুকে স্বপন বলে ছিল ভারতে নাগরিত্ব করিয়ে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু তা না করে পিন্টুকে ঘুরাতে থাকে স্বপন। একই সঙ্গে প্রবীর ঘোষের সাথে মিলে পিন্টুকে নানা ভাবে হয়রানী করতে পরামর্শ করে স্বপন।

এর আগে স্বপনের বড় ভাই অজিত কুমার সাহা জানান, স্বপন কুমার সাহা ছিলেন খুচরো কাপড় ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। গত ৯ জুলাই ঘাতক বন্ধু স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টুর ফ্ল্যাটের সেপটিক ট্যাংক স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের খন্ডিত লাশ উদ্ধারের পর পিন্টুর প্রতি আমাদের সন্দেহ বাড়ে। পরে ১৫ জুলাই বিষয়টি ডিবিকে জানালে রিমান্ডে থাকা পিন্টুর সহযোগি বাপান ভৌমিক বাবু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। সে তখন পিন্টু দেবনাথের এক বান্ধবী রত্মা রাণী চক্রবর্তীর সন্ধান দেন। তার মোবাইল নাম্বার পর্যালোচনা করে জানা গেছে স্বপনের মোবাইলটি রত্মা ব্যবহার করছে। ১৫ জুলাই রোববার রাতে তাকে আটকের পর তার কাছ থেকে স্বপনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল উদ্ধার করে। মূলত পিন্টুর টাকা নিয়ে স্বপন ভারতে একটি ফ্লাট বাসা ক্রয় করে। ওই ফ্লাট বাসা পিন্টুকে না দিয়ে বরং উল্টো হুমকি দিচ্ছিল স্বপন। এসব কারণেই ২০১৬ সালের মার্চে আমলাপাড়া এলাকার মোল্লা মামুন নিজেই পিন্টুকে হুমকি দিত। তখন থেকেই স্বপন সাহা ও প্রবীর ঘোষকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু। পরে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর স্বপনকে ডেকে নেয় পিন্টু। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ