দুইজনকে ৭ টুকরো : সিনেমার কাহিনী ভাবছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ৮:২৬ অপরাহ্ণ

দুইজনকে ৭ টুকরো : সিনেমার কাহিনী ভাবছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৫৮ পিএম, ২১ জুলাই ২০১৮ শনিবার | আপডেট: ০২:৫৮ পিএম, ২১ জুলাই ২০১৮ শনিবার


দুইজনকে ৭ টুকরো : সিনেমার কাহিনী ভাবছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

শহরের কালীরবাজার এলাকাতে স্বর্ণের ব্যবসা করতো পিন্টু দেবনাথ। করতো এক সময়ে পলিশের কাজ। পরে তিনি দেন দোকান। এরই মধ্যে আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে হত্যার পর কালীরবাজার ও আমলপাড়া এলাকার ব্যবসায়ীরা আতকে উঠেছিল। তখনো অনেকে বিশ্বাস করতে পারেনি পিন্টু একজন প্রিয় বন্ধুকে হত্যার পর এভাবে ৭ টুকরো করবে।

তবে প্রায় দেগ বছর আগে আরেক বন্ধু স্বপন কুমার সাহাকেও একই কায়দায় ৭ টুকরো করা হয়েছে সেটা কেউ কল্পনা করতে পারছে না। যতই বের হচ্ছে একের পর এক কাহিনী ততই অবাক হয়ে উঠছেন সকলে। কালীরবাজারের অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীও বলছেন তারা এখনো ঠিকমত বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাদের কাছে এটা সিনেমার একটি কাহিনী মনে হচ্ছে।

শনিবার ২১ জুলাই কালীরবাজার এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান তাদের কাছে পুরো বিষয়টি একটি সিনেরমার কাহিনী মনে হচ্ছে। কারণ এভাবে একজন লোক দুইজন প্রিয় বন্ধুকে ডেকে নিয়ে ৭ টুকরো করে হত্যা করবে সেটা কোনভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না। তারা সকলে একত্রে চলাফেরা করতো। কিভাবে একজন আরেকজনকে হত্যা করলো সেটাই এখন সবার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ ও স্বপন কুমার সাহা ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুইজনই মারাত্মক আসক্ত ছিল নারী ও মদের প্রতি। সে কারণে প্রায়শই শহরের আমলাপাড়া এলাকাতে পিন্টুর ফ্লাটে চলতো মদ, বিয়ারের আসর। আর নারী ভোগের আসর বসতো মাসদাইরে রতœা রানী চক্রবর্তীর ফ্লাটে। এ দুটি ফ্লাটেই নিয়মিত যাতায়াত ছিল পিন্টু, স্বপন ও প্রবীরের। আর এসব কারণেই দুইজনকে হারাতে হয়েছে প্রাণ। প্রবীরকে বিয়ারের প্রলোভনে ডেকে নেয় পিন্টু। আর স্বপনকে যৌন লালসার প্রলোভনে ডেকে নেয় রতœা। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে থেকেই এ দুইজন এসবের প্রতি আসক্ত ছিল বলেই ডাকামাত্র চলে গেছে।

দুইজনকেই আবার হত্যা করা হয়েছে ৭ টুকরো করে। দুইজনের লাশই বাজারের ব্যাগে করে ফেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রবীরের লাশ একাই ৭ টুকরো করেন পিন্টু। আর স্বপনের লাশ ৭ টুকরো করে পিন্টু ও রতœা মিলে। প্রবীরকে ৭ টুকরো করতে ব্যবহার করা হয় চাপাতি। আর স্বপনকে ৭ টুকরো করতে ব্যবহার করা হয় ধারালো বটি।

রত্মা আদালতকে জানান, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলায় হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্মা রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় রতœার ওই ফ্ল্যাটে। এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্মা রানী। এতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন। এরপর শীল পাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করে পিন্টু। পরে বাথরুমে নিয়ে স্বপনের লাশ করা হয় ৭ টুকরো। রাতে ৫টি বাজারের ব্যাগে করে ওই লাশ তিন দফায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নিয়ে ফেলে দেয় পিন্টু। সহায়তা করে রতœা। সে ও পিন্টু মিলেই বাড়ির নিচে ব্যাগগুলো নামায়। মাসদাইর থেকে তিন দফায় ঘাটে ব্যাগগুলো আনা হয়। প্রথম দফায় একটি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুটি করে ব্যাগ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের পাশে সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে আনে। প্রত্যেকবার সে বৈঠা চালানো নৌকা রিজার্ভ করে বন্দর ঘাটে যাওয়ার জন্য। পরে মাঝির অগোচরে ব্যাগগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। আর মাসদাইর থেকে রিকশায় করে লাশবোঝাই ব্যাগগুলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য উপরে দেওয়া হয় সবজি।

১৮ জুলাই রাতে শহরের মাসদাইর এলাকাতে রতœা যে ফ্লাটে বসবাস করেন ওই ফ্লাটে অভিযান চালিয়ে স্বপন হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো বটি, শিলপুতা, রক্তমাখা চাদর, তোষক উদ্ধার করা হয়।

এর আগে জবানবন্দীতে পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলায় ৯ জুলাই গ্রেফতার হন পিন্টু দেবনাথ। সেদিন তার দেখানো মতে শহরের আমলাপাড়া এলাকার ফ্লাট বাসার সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৮ জুন রাতেই প্রবীরকে হত্যা করেছিল প্রবীর।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ