৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ

UMo

রত্নার ফ্লাটে যাতায়াত ছিল পিন্টুর


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:২৩ পিএম, ২২ জুলাই ২০১৮ রবিবার


রত্নার ফ্লাটে যাতায়াত ছিল পিন্টুর

কাপড় ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের ব্রোকার হিসেবে কাজ করা স্বপন কুমার সাহার সঙ্গে ছিল রত্না রানী চক্রবর্তীর গভীর সখ্যতা। মূলত টাকার বিনিময়ে রত্নার সঙ্গে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতো স্বপন। এক সময়ে স্বপন নিজেই পিন্টুকে নিয়ে যান রত্নার মাসদাইরের ফ্লাটে। এক পর্যায়ে পিন্টুর সঙ্গে রত্নার সম্পর্ক গভীর হয়। বাড়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক। শেষে পরিস্থিতি এতটাই গভীরে ছিল যে সপ্তাহে অন্তত ৩ থেকে ৪বার রত্নার ফ্লাটে যেত পিন্টু। থাকতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো রাত সেখানেই পার করতো। আর যেদিন যেতে পারতো না সেদিন দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার রত্নার সঙ্গে পিন্টুর কথা হতো মোবাইলে। পিন্টুকে মূলত ‘বড় দাদা’ হিসেবেই আশেপাশের মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিত রত্না। যখনই রত্নার ফ্লাটে যেত পিন্টু তখন রত্নার ছেলে কিংবা আশেপাশের লোকজনকে বলা হতো পিন্টু হলো তার বড় দাদা। সে কারণে কেউ কোন সন্দেহ করতো না।

প্রবীরকে গত ১৮ জুন রাতে হত্যা করে পিন্টু। সেটা ঘটে শহরের আমলাপাড়া এলাকায় পিন্টুর ফ্লাটে। প্রবীরকে হত্যার পরে রাতে কয়েক ঘণ্টা রত্নার সঙ্গে কথা বলেন পিন্টু। এছাড়া এর পরেও প্রচুর কথা হতো তাদের মোবাইলে। এর মধ্যে একদিন রত্নার বাসায়ও যান পিন্টু। তখন সব খুলে বলে আসে। ওই সময়েই রত্না পিন্টুকে এ ব্যাপারে কারো সঙ্গে কিছু না বলতে পরামর্শ দেন। কিন্তু পিন্টু ক্রমশ বিচলিত হয়ে উঠলে তার সঙ্গে রত্না কথা বলা কমিয়ে দেন।

জানা গেছে, মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলা স্বামীয় ও এক মাত্র ছেলেকে নিয়ে থাকতেন রত্মা রাণী কর্মকার। চার ভাইয়ের নামে ৪টি ভবন নিয়ে কাজী বাড়ি অবস্থিত এলাকায়। মাঝে মধ্যে রত্মাকে বাজার সদাই করতে দেখতেন বাজার ও বাড়ী লোকজন। ঠান্ডা প্রকারে মানুষ হিসেবে রত্মাকে সবাই চিনতো। কখনো বাহিরে মানুষের কোন কথা বা দীর্ঘ সময় আলোচনা করতেন না। তিনিই যে দেহ ব্যবসা করতে তা এলাকা বা বাড়ির ভাড়াটিয়াও লোকজন টের পেত না।

কাজী বাড়ীর একাধিক ভাড়াটিয়া জানায়, রত্মা রাণীই একমাত্র হিন্দু ধর্মের পরিবার এই বাড়ীতে থাকেন। কেউ আর কোন হিন্দু পরিবার থাকে না। তার স্বামী ও ছেলে অনেক ভদ্র ও ভালো লোক। প্রায় সময় রত্মা বাসাতেই অবস্থান নিতেন। কিন্তু তার বাড়ী অনেক পুরুষ লোক আনাগোনা ছিল। পুরুষ লোকগুলো বয়স ৩০-৫৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে পিন্টু ও স্বপন কুমার সাহাকে দেখতাম। সাথে একটি পাকনা বুড়ো লোককে দেখা যেত।

তারা আরো জানায়, প্রায় সময় সন্ধ্যা রাতে ছেলেকে ভবনের নিচে খালি জায়গা ঘুরপাক খেত। ছেলেটি কলেজের একাদশ ক্লাসে পড়ে বলে জানা যায়। প্রায় সময় অনেকে ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করতাম, তুমি লেখাপড়া রেখে বাহিরে কেন ঘুরছ। ও প্রতিউত্তরে বলতো, বাড়ি মামা, চাচা, বড় দা বাসায় আসছেন।

রত্মা স্বামী ব্যাপারে ভাড়াটিয়ারা জানায়, রত্মার স্বামী রঞ্জন চক্রবর্তী অনেক ভদ্র লোক। রত্মা তাকে অনেক নির্যাতন করতো। কারণে রত্মা টাকায় তাদের পরিবার চলতো। গত ৭ থেকে ৮ মাস আগে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে রত্মা। ছেলেকে নিয়ে রত্মা একাই বাসায় থাকতেন, ও কারো সাথে সম্পর্ক রাখতেন না।

নিহত স্বপন ও ঘাতক পিন্টু নিয়ে ভাড়াটিয়ারা জানান, পিন্টুকে গত দেড় মাস যাবৎ বেশি আনাগোনা ছিল। স্বপন কুমার সাহা অনেক বছর যাবৎ এখানে আসে না। পত্রিকা তার ছবিটি দেখলাম তিনি মারা গেছে।

ডিবি একটি সূত্রে জানা গেছে, পিন্টু সকল অপকর্ম বিষয়ে রত্মা প্রকাশ্যে ও পরোক্ষভাবে জানেন। প্রবীর হত্যার পর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত কয়েক দফায় দীর্ঘ সময় রত্মা সাথে কথা বলেছেন পিন্টু।

১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী রত্না রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন।

আদালতে রত্না জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের দালাল স্বপন কুমার সাহা, আমলাপাড়া এলাকার স্বর্ণব্যাবসী পিন্টু ও স্বর্ণব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর রত্মা রানী ছিলেন পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বান্ধুবী। বিয়ে আশ্বাস দিয়ে রত্মা রানীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ধার নেয় পিন্টু। এরপর থেকে রত্মা রানী প্রায় সময় পিন্টুর ফ্ল্যাটে যাতায়াত করত এবং তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন মেলা মেশা চলত। পিন্টুকে ভারতে বাড়ি কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখায় স্বপন। এরপর ভারতে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটও পিন্টুর টাকায় স্বপন তার ভাগ্নির নামে কিনে দেয়। তখন পিন্টুকে স্বপন বলে ছিল ভারতে নাগরিত্ব করিয়ে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু তা না করে পিন্টুকে ঘুরাতে থাকে স্বপন। একই সঙ্গে প্রবীর ঘোষের সাথে মিলে পিন্টুকে নানা ভাবে হয়রানী করতে পরামর্শ করে স্বপন। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলায় হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্মা রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় মাসদাইরের ওই ফ্ল্যাটে। এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্মা রানী। এতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন। এরপর শীল পাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করে পিন্টু। পরে বাথরুমে নিয়ে বটি দিয়ে লাশ গুমের জন্য সাত টুকরো করে বাজারের ব্যাগে ভরে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ফেলে দেয় পিন্টু দেবনাথ।

১৮ জুলাই সন্ধ্যায় রত্মা ও পিন্টুকে নিয়ে মাসদাইরে রত্মা যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়িতে যায় পুলিশের একটি টিম। তারা জানান, পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি রত্মা ও পিন্টুকে নিয়ে ফ্লাটে অভিযান চালায়। ওই সময়ে ভাড়াটিয়াদের সামনেই পুলিশকে পিন্টু ও রত্মার দেখানো মতে ২য় তলার প্রথম ফ্ল্যাট থেকে স্বপন কুমার সাহাকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত শিল পুতা, বটি, রক্তমাখা বিছানা চাদর ও তোষক উদ্ধার করা হয়।

ওই সময়ে ভাড়াটিয়াদের সামনেই এ সময় রত্মা ও পিন্টু জানায়, এই রুমেই স্বপনকে দুইজনের মিলে পিছন থেকে শিল পুতা দিয়ে আঘাত করি। পরে অচেতন অবস্থায় টয়লেটে নিয়ে তাকে ৭ টুকরো করি। ব্যাগে ভরে স্বপনের দেহ অংশগুলো পিন্টু ঠান্ডা মাথায় ভবনের পাশে খালি স্থানে রাখে। পরে সুযোগ বুঝে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় পিন্টু।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ