৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৮:৩০ পূর্বাহ্ণ

UMo

ছোটদের গর্জনে পরাস্ত ক্ষমতাধর তাবড় তাবড়রা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:৩২ পিএম, ৪ আগস্ট ২০১৮ শনিবার


ছোটদের গর্জনে পরাস্ত ক্ষমতাধর তাবড় তাবড়রা

বিভিন্ন সময়ে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশকে দেখা গেছে বেশ কঠোর হতে। কখনো ছুড়েছে রাবার বুলেট আবার কখনো বন্দুকের গুলি। হাতে থাকা লাঠি দিয়েও বেধড়ক পেটানো হয়েছে। আবার কখনো দমাতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনও। তবে নারায়ণগঞ্জে টানা তিনদিন বেশ সহনশীল ছিল পুলিশ। কারণ তাদের সামনে আন্দোলন করেছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যাদের অনেকেই সবেমাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পদার্পন করেছে। কিন্তু তাদের মনে ছিল কঠিন স্পৃহা। লড়াই করার বাসনা ছিল বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। সে কারণেই রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত না খেয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করে বজ্র্য কণ্ঠে স্লোগান তুলেছিল নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য। শৃঙ্খলা ফেরানোর শক্ত কাজ করেছিল নরম হাতে। আর এ ছোটদের আন্দোলনে রীতিমত পরাস্ত হয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের তাবড় তাবড় নেতারা। দেখে শেখার চেষ্টাও করেছিল পুলিশ কর্মকর্তারা যারা আইনের উপর ভিত্তি করে কদাচিৎ শাসন করে জনগনকে।

শনিবার ৪ আগস্ট ও শুক্রবার ৩ আগস্ট আন্দোলনে ভীত হয়েই বন্ধ করে দেওয়া হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের সকল প্রকার বাস চলাচল। চাষাঢ়া হতে সাইনবোর্ড ও শিমরাইল পর্যন্ত গণপরিবহনও ছিল খুবই কম।

গত কয়েকদিনে সরেজমিনে দেখা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে শহরের চাষাঢ়ায় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে আন্দোলনকারীরা। পরে তারা ঘোষণা দেয় বুধবার সকাল থেকে সড়কে অবস্থান নিবে। সে অনুযায়ী বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুইদিন সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চাষাঢ়াতে অবস্থান করে শত শত শিক্ষার্থী। আর শুক্রবার ছিল বিকেল ৪টার পর।

তিন দিনের মধ্যে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ছিল সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এ দুইদিন শিক্ষার্থীরা খন্ডখন্ডভাবে সড়কে অবস্থান নেয়। বন্ধ করে দেয় সকল প্রকার যানবাহন। তল্লাশী করা হয় ড্রাইভিং লাইসেন্স। কেড়ে নেওয়া হয় লাইসেন্স ছাড়া গাড়ির চাবি। এতে বাড় পড়েনি পুলিশও। তাদেরও কয়েক দফায় এসব তল্লাশীকারকদের সামনে পড়ে রীতিমত ক্ষমা চাইতে হয় কড়জোরে। নেমে যেতে বাধ্য হয় গাড়ি থেকেও। তবুও তারা ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস। কারণ তাঁরা আইনের লোক। আইনের লোক হয়ে লাইসেন্স ছাড়া বেআইনীভাবে গাড়ি চালিয়েও অপরাধী তারা।

আটকা পড়েছিল নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের গাড়িও। এক পর্যায়ে তাকে নামতে হয়েছিল গাড়ি থেকে। লাইসেন্স দেখিয়ে কোনমতে পার হতে হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারী ও বরিশালের এমপি পংকজ দেবনাথকেও। তিনি বৃহস্পতিবার শহরে এসেছিলেন ব্যক্তিগত কাজে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট ছোট কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীরা মূলত রাস্তায় নেমেছিল অধিকার আদায়ের জন্য। কোন ধরনের সহিংশতা করেনি তারা। স্কুল ব্যাগে থাকা খাতার পাতায় লিখেছিল নিজের স্লোগান যা এসেছিল হৃদয়ের গহীন থেকে। ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল মনের আঁকুতি আর সড়ক দুর্ঘটনায় ২ শিক্ষার্থী মৃত্যুর বেদনার চিত্র।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ শহরে অবস্থানের কারণে যখন সকল রুটের যান চলাচল ছিল বন্ধ তখন বন্ধ করে রাখা হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করা ট্রেনের ইঞ্জিনও। সড়কে বের হওয়া লোকজনও অপলক দৃষ্টিতে দেখেছে শিক্ষার্থীদের হৃদয় ভাঙার কষ্টের বিপরীতের ইস্পাত কঠিন শক্ত অবস্থান। রোদের প্রখরতার বিপরীতে বৃষ্টিতেও রাস্তা ছাড়েনি কেউ। বরং এটাকে আরো উপভোগ করে স্লোগানও দিয়েছিল কেউ কেউ।

আন্দোলনের মধ্যে বুধবার শিমরাইলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর মারাত্মকভাবে চড়াও হয় পরিবহন সেক্টরের লোকজন। চারজন ছাত্রকে মারধর করে পুলিশের কাছে তুলে দিলেও তারা পরে ছাড়া পায়। ছাত্ররা যখন শান্ত তখন শুক্রবার বন্ধ করে দেওয়া হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের সকল প্রকার গণপরিবহন। বাস মালিকদের ধারণা ছিল এদিনও হয়তো কোন ধরনের ভাঙচুর হতে পারে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাস মালিক জানান, মূলত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই শুক্রবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় যাতে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা হয়।

জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকা-নারায়ণঞ্জ রুটে সকল প্রকার গণপরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও ছিল প্রচুর ভীড়।

নারায়ণগঞ্জ বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন বলেন, রাস্তায় কোনও কারণ ছাড়াই ছাত্ররা নির্বিচারে গাড়ি ভাঙচুর করছে। গত পাচঁ দিনে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটে শত শত গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে অনেক পরিবহন শ্রমিক আহত হয়েছে। শ্রমিকেরা নিজের জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে বাস চালাচ্ছে না। বাস ভাঙচুরের কারণে মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে শ্রমিকেরা গাড়ি চালাতে চাচ্ছে না।’

এদিকে শুক্রবার দুপুর ২টায় শামীম ওসমান চাষাঢ়া এলাকাতে আসেন। তখন আন্দোলন করা একটি অংশের শিক্ষার্থীরা শামীম ওসমানের কথায় আশ্বস্ত হয়ে কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু বিকেল ৪টার পরে আবারো আরেকটি অংশ আবার রাস্তায় নেমে যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করে।

দুইজন শিক্ষার্থী বাসের চাপায় নিহত হওয়ার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে দুইদিন যে ছাত্র আন্দোলন হয়েছে তাতে অভিভূত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান যিনি ছাত্র রাজনীতি করেই বেড়ে উঠেছেন।তিনি

তাদের মাঝে হাজির হয়ে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনকারীদের ‘স্যালুট’ দিয়ে বলেন আমি সত্যি অভিভূত। আমি মনে করেছিলাম দেশের ছাত্র রাজনীতি বোধহয় নির্জীব হয়ে গেছে। এ নারায়ণগঞ্জ অনেক আন্দোলনের সূতিকাঘার। সেই নারায়ণগঞ্জে যেভাবে ছাত্র ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে তাতে আমার মনটা ভরে গেছে।তিনি

বলেন, ‘আমি এজন্য তোমাদের অভিনন্দন জানাই যে তোমরা সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তায় নেমে গাড়ি চালকদের লাইসেন্স চেক করেছ। অথচ এটা করার দায়িত্ব ছিল পুলিশের। কিন্তু আমাদের প্রশাসন হয়তো ঠিকমত দায়িত্ব পালন করে না। কিন্তু ভবিষ্যতে করতে হবে। নতুবা এসব বাচ্চা বাচ্চা ছাত্র ছাত্রীরা যেভাবে আন্দোলন করেছে সেটাকে আমি মনে করি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।’

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর স্মরণকালের সর্ববৃহৎ আন্দোলন হলো নারায়ণগঞ্জে। গত ১ ও ২ আগস্ট বৃহস্পতিবার টানা দুইদিন নারায়ণগঞ্জ শহরকে কার্যত অচল করে রাখে শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দুইদিন ছিল রাজপথে। বৃষ্টি উপেক্ষা কারেই রাজপতে ছিল বজ্র্য আটুনির মত।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জকে বলা হয় আন্দোলনের সূতিকাগার। বিশেষ করে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সকল আন্দোলনেই নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের ছাত্ররা আন্দোলনে শামিল হতো। কারণ তৎকালে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে কোন দ্বিধাবিভক্তি ছিলনা। দলমত নির্বিশেষে ছাত্ররা ওইসকল আন্দোলন কর্মসূচীতে ঝাঁপিয়ে পড়তো। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হলেও সেই আন্দোলনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাকর্মীরাই শামিল হতো। সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনে খুব একটা দেখা যেতো না। পরবর্তী সময়েও সাধারণ ছাত্ররা রাজনৈতিক কর্মসূচীতে তেমন একটা সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি। সম্প্রকি কোটা বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ কিছু ছাত্রদের নামতে দেখা গেলেও ওই আন্দোলনের লাইমলাইটে ছিল বাম ঘরানার ছাত্রনেতারা। তবে কোটা বিরোধী আন্দোলন ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক। যে কারণে এই আন্দোলন ততটা বেগবান হয়নি। এর মধ্যে কোটা আন্দোলনকারী নেতারা গ্রেফতার এবং পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার পরে কোটা আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে।

এদিকে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আশির দশকে নারায়ণগঞ্জে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হলেও তাতে সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলক কম। নব্বইয়ে অসহযোগ আন্দোলনেও সাধারণ ছাত্রদের তেমন একটা অংশগ্রহণ ছিলনা। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে ৯ মার্চ আহূত হরতালে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণে সেটা ছিল নারায়ণগঞ্জে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় আন্দোলন। তবে সেই সর্ববৃহৎ আন্দোলনকে যেন ছাড়িয়ে গেছে বুধবারের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এমনটিই মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে যেসকল শিক্ষার্থীরা বুধবার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তারা এসেছিলেন মানবিক কারণে। নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতই ছিল তাদের প্রধান দাবি। এদিকে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে সর্ববৃহৎ আন্দোলন বলেই মানছেন অনেক বয়জ্যেষ্ঠরা। কারণ এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন হলেও এই আন্দোলনটি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের। যে কারণে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ৬ ঘন্টাব্যাপী অচল হয়ে পড়েছিল নারায়ণগঞ্জ।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ