যুগান্তকারী পরিবর্তনে ছাত্র আন্দোলন, নজর প্রয়োজন মাদক সন্ত্রাসে

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ৮:২৪ অপরাহ্ণ

যুগান্তকারী পরিবর্তনে ছাত্র আন্দোলন, নজর প্রয়োজন মাদক সন্ত্রাসে


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৩৬ পিএম, ৮ আগস্ট ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০৩:৩৬ পিএম, ৮ আগস্ট ২০১৮ বুধবার


ফাইল

ফাইল

এ যে বড় কোন ঝড়ের শেষে সুন্দর সকাল। যে নারায়ণগঞ্জ শহরের ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় বের হলেই পড়তে হতো যানজটে সেই চিত্রই বদলে গেছে। সারিবদ্ধভাবে রিকশা ও গাড়ি লেনে গাড়ি চলাচলের চিত্র দেখা যাচ্ছে নগরীতে। শুধু তাই নয় পুলিশের কড়া চেকপোস্ট থেকে বের হয়ে যেতে পারছে কোন লাইসেন্সবিহীন চালকও। এছাড়াও নেই কোন ফিটনেসবিহীন গাড়ির দাপট। এ যুগান্তকারী পরিবর্তন শুধু মাত্র বিগত কয়েকদিনের ছাত্র আন্দোলনের অবদান।

তবে নগরবাসীর দাবি, সড়কের পাশাপাশি আরো সমস্যা আছে। সেগুলোর মধ্যে মাদক ও সন্ত্রাস বেশি ভয়ানক। এ থেকে পরিত্রাণের জন্যও কি যুগান্তকারী আন্দোলন প্রয়োজন নাকি প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে সেটা দেখার বিষয়। আর এসব সমস্যা সমাধানে শামীম ওসমানের আহবানে কতটা সারা দিবে নগরবাসী।

৫ আগস্ট রোববার সকালে সরেজমিনে চাষাঢ়া গোল চত্ত্বর থেকে ২ নং রেল গেট, মন্ডলপাড়া হয়ে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে রিকশা চলাচল করে। এছাড়াও উভয় পাশের দুই লেনের মধ্যে গাড়ির লেনে গাড়ি ও রিকশার লেনে রিকশা চলাচল করতে দেখা যায়। ছিল না কোন যানবাহনের বিশৃঙ্খলাও। এদিকে সকাল থেকেই চাষাঢ়া গোল চত্ত্বর এলাকার সোনালী ব্যাংকের সামনে পুলিশকে চেকপোস্ট বসিয়ে চালকের গাড়ির কাগজ ও লাইসেন্স পরীক্ষা করতে দেখা যায়। এসময় বেশ কয়েকজনকে কাগজপত্র না থাকায় মামলা দেওয়া হয়।

জানা গেছে, গত বুধবার রাজধানীতে বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শহরের চাষাঢ়া গোল চত্ত্বরে অবস্থান নেয় বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সেদিন অবস্থান নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা গামী লিংক রোড, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক, নারায়ণগঞ্জ-আদমজী ও শিমরাইল সড়ক অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। একই ভাবে চলে বৃহস্পতিবার। তবে সপ্তাহের বন্ধের দিন শুক্রবার বিকেলে ও শনিবার সকাল থেকে যানবাহন অবরুদ্ধ না করে বরং সেগুলো শৃঙ্খলায় কাজ করে তারা। এতে শুরু হয় নগরীর এ বিশাল পরিবর্তন।

পথচারী ও পরিবহনের যাত্রীদের জানান, এটা বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর মধ্যে বাংলাদেশের মূল চিত্র ফুটে উঠেছে। এটা যেমন রাস্তার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে তা নয় এটা দেশের সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। নিরাপদ সড়ক সকলের দাবি। কিন্তু এ দাবি আদায়ের যে শিক্ষার্থী আন্দোলন করছে সেটা যুক্তিযুক্ত। তবে নগরীতে আরো সমস্যা আছে। মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও এ যুগান্তকারী পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। সেটাও কি শিক্ষার্থীদের নিতে হনে নাকি প্রশাসন নিবে সেটা এখন দেখার বাকি।’

এ বক্তব্যের পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীতে সমস্যার শেষ নেই। যানজট যেমন ছিল গলার কাঁটা তেমনি রয়েছে ময়লা আবর্জনা। রাজনৈতিক বিরোধ। চুরি, ছিনতাই এর পাশাপাশি জায়গা দখল তো আছেই। তবে এসবের চেয়ে নগরীর সব থেকে বড় সমস্যা হলো মাদক ও সন্ত্রাস। মাদক যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ভাবে হত্যা, চাঁদাবাজী সহ হামলা ও ক্ষতি সাধন করছে। এ মাদক নগরীর যত্রতত্র বিক্রি করা হচ্ছে। প্রশাসন ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মাদকের প্রভাব কমছে না।

এ বিষয়ে সমাধানের জন্যও তথ্য দিতে নিজের মোবাইল নাম্বার জানিয়ে সহযোগিতা চেয়েছেন আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। শুধু তাই নয় ছাত্র আন্দোলনের তৃতীয় দিনও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদক সব থেকে বড় সমস্যা। মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এমন আন্দোলন গড়ে তুলো। আমাকে সাহায্য করো।’

নাম প্রকাশের অনিচ্ছিুক নগরীর বাসিন্দা জানান, শহরের আমলাপাড়া, গলাচিপা, কলেজ রোড, কুড়িপাড়া, নিতাইগঞ্জ, টানবাজার কলোনী, চাষাঢ়া রেল লাইন, জামতলা সহ বিভিন্ন এলাকায় মাদকের ভয়াবহতা অনেক বেশি। এসব এলাকায় নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু পুলিশ সেখানে মাসেও একবার অভিযান দেখা যায় না। এ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম বলেন, মাদক, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।

শুক্রবার ৩ আগস্ট দুপুর থেকে আবারো চাষাঢ়াতে অবস্থান নেয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তারা আটক করে বেশ কয়েকটি গাড়ির চাবি যাদের লাইসেন্স ছিল না। তবে দুপুর ২টায় শামীম ওসমান আসেন চাষাঢ়াতে। সেখানে তখন চলছিল আন্দোলনকারী একটি গ্রুপের শিক্ষার্থীরা। শামীম ওসমানের বক্তব্যের পর অবস্থানকারীরা সরে যায় ও জব্দ করা চাবিগুলো পুলিশের কাছে তুলে দেয়।

তিনি তাদের মাঝে হাজির হয়ে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনকারীদের ‘স্যালুট’ দিয়ে বলেন আমি সত্যি অভিভূত। আমি মনে করেছিলাম দেশের ছাত্র রাজনীতি বোধহয় নির্জীব হয়ে গেছে। এ নারায়ণগঞ্জ অনেক আন্দোলনের সূতিকাগার। সেই নারায়ণগঞ্জে যেভাবে ছাত্র ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে তাতে আমার মনটা ভরে গেছে।’

শামীম ওসমান বলেন, আমি মনে করেছিলাম এ যুগের ছাত্ররা ফেইসবুক, ইউটিউব, হোয়াটস অ্যাপ আর প্রেম মোহাব্বত ছাড়া কিছুই বুঝে না। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে আমি ৪০ বছর আগের আমাকে দেখতে পাচ্ছি। আমি তোমাদের সমর্থন করি ও গর্ববোধ করি। যে তারা চায় আমাদের দেশটা ভালো হোক। কারণ এটা তোমাদের দায়িত্ব। আমি এ নিয়ে সত্যই অহংকার করি।

মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানিয়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘এ ছেলেরা দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করছে নিজের জন্য না। এ শক্তিটাকে পুঞ্জিভূত করে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। যার যার এলাকায় খবর দিয়ে সাহায্য করো। যে মাদক খাই তাকে ঘৃণা করি না। কিন্তু যে বিক্রি করে সে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বড় শয়তান। যেভাবে চাবি বন্দি করেছো সেই ভাবে মাদককে বন্দি করি।’

তিনি বলেন, ‘আমি এজন্য তোমাদের অভিনন্দন জানাই যে তোমরা সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তায় নেমে গাড়ি চালকদের লাইসেন্স চেক করেছ। অথচ এটা করার দায়িত্ব ছিল পুলিশের। তোমরা নারায়ণগঞ্জের ট্রাফিক সিস্টেমের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছো। আমি তোমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছি, যোক্তিক দাবি আদায়ে কখনো কাউকে ভয় পাবেনা। আজকে যারা ড্রাইভার শ্রমিক তারাও কিন্তু আমাদের ভাই, বাবা আমদেরই স্বজন। তারাও কিন্তু পেটের দায়ে রুজির জন্য কাজ করে। যে মেয়েটা মারা গেছে তার বাবাও কিন্তু একজন চালক ছিলেন কিন্তু মেয়ের মৃত্যুর পর সে আর গাড়ি চালাবেনা বলে ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের প্রশাসন হয়তো ঠিকমত দায়িত্ব পালন করে না। কিন্তু ভবিষ্যতে করতে হবে। নতুবা এসব বাচ্চা বাচ্চা ছাত্র ছাত্রীরা যেভাবে আন্দোলন করেছে সেটাকে আমি মনে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ