৯ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ২:০৭ পূর্বাহ্ণ

‘তোমারে যদি কেউ মাইরা ফালাইতো’


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১২:৩০ এএম, ১৮ আগস্ট ২০১৮ শনিবার


‘তোমারে যদি কেউ মাইরা ফালাইতো’

বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৯ টায় ঘুম ভাঙে আলমগীর হোসেনের ছেলে শিহাবউদ্দিন আলিফের। ঘরে কখনোই থাকতে চাইতো না সে। এলাকার প্রতিবেশীদের কাছেও ছিল আদরের পাত্র। বাড়ির বাইরে বা প্রতিবেশী নান্নু মিয়ার ছেলে ফাহাদের সাথে খেলাধুলাতেই কাটতো তার দিনের বেশীরভাগ সময়। আলিফদের কয়েক বাড়ি পরেই নান্নু মিয়ার বাড়ি। নান্নু মিয়া সম্পর্কে আলিফের ফুফাতো ভাই।

এদিকে ফাহাদের সঙ্গে খেলা করতে গেলে দিনের বেশীরভাগ সময়ই আলিফ নান্নুদের বাসায় কাটাতো। তাই আলমগীর হোসেন ও তার স্ত্রী সালমা বেগম প্রায় সময়ই ঠাট্টা করে বলতেন, ‘ছেলে তো আমার নয়, মনে হয় নান্নুর ছেলেকেই পালক নিয়েছি। সারাক্ষণ ওই বাসায় পরে থাকে। দুপুরে খাওয়া দাওয়াটাও করে নান্নুর সাথেই।’ তাই বাবা-মায়ের বাধা সত্ত্বেও সাড়ে ৯টায় যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আলিফ তখন কেউই ভাবতে পারেনি যে কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্মম এক হত্যাকান্ডের শিকার হতে যাচ্ছে আলিফ।

১৫ আগস্ট বুধবার রাতেই সৌদি আরব থেকে পরিবারের সাথে ঈদ কাটাতে দেশে ফিরেন আলমগীর হোসেন। ১৫ বছর ধরে সৌদিতে থাকলেও প্রতি বছর ঈদের সময়ে তিনি ফিরেন নারায়ণগঞ্জে। বুধবার রাত ১১টায় বাড়ি ফেরার পর খাওয়া দাওয়া সেরে যখন আলিফকে নিয়ে বিছানায় ঘুমাতে যাচ্ছিলেন তখন কৌতুহলী মনে প্রশ্ন করেছিলো আলিফ ‘আচ্ছা বাবা, তুমি যে এতো রাত কইরা আসলা; তোমারে যদি কেউ মাইরা ফালাইতো?’ ছেলের প্রশ্নের জবাবে আলমগীর হোসেন বলেছিলেন, ‘তোমার বাবাকে মারবো কে? তোমার বাবার তো কোনো শত্রু নাই।’ কিন্তু কে ভেবেছিল বাবার কোনো শত্রু না থাকলেও ৪ বছরের শিশু আলিফের শত্রু তৈরি হয়ে গেছে ঠিকই। নয়তো কেনোই বা তাকে এমন একটি নৃশংস হতাকান্ডের শিকার হতে হবে!

বুধবার দেশে আসলেও বৃহস্পতিবার আলমগীরকে শুনতে হয়েছিল তার ছোট ছেলের মৃত্যুর ঘটনা। পরে রাতে যখন আলিফকে পোস্টমর্টেম করতে নেওয়া হয় তখন বুকে সন্তানকে আগলে ধরে একটি হুইল চেয়ারের উপর নিশ্চুপ বসে ছিলেন আলমগীর হোসেন। চিৎকার করে বলছিলেন, ‘বাচ্চা একটা ছেলে, ওকে কাঁটা ছিড়া করে কিচ্ছু পাবেন না; আমি ওর পোস্টমর্টেম করতে দিবো না।’ পরে প্রায় এক ঘণ্টা পর নিজেই লাশ পোস্ট মর্টেমের জন্য দিয়ে আসে মর্গে।

লাশ উদ্ধারের পর পরই জ্ঞান হারায় নিহত আলিফের মা সালমা বেগম। তাকেও চিকিৎসা দেওয়া হয় হাসপাতালে। পরে রাতেই ফিরেন বাড়িতে।

এদিকে শুক্রবার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। আলমগীর কেঁদে উঠছেন। আর মা বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বিভিন্ন রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আলিফের বিভিন্ন খেলনা ও ব্যবহারের জিনিসপত্র। ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনরা এগুলো ধরে কাঁদছেন আর আহাজারি করছেন। চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে আদরের ছোট সন্তানকে হারিয়ে গত দু’দিন বাকহারা হয়ে প্রায় অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন আলিফের মা সালমা বেগম। মাঝে মাঝে চেতনা ফিরলেও চিৎকার করে ছেলেকে ফেরত চাইছেন আর কাঁদছেন।

নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি কামরুল ইসলাম ঘটনাটিকে মর্মান্তিক ও রহস্যজনক হিসেবে মন্তব্য করে বলেন, ‘সাধারণত পরিবারের সাথে বিরোধ থাকলে এ ধরনের শিশুদের খুন করার ঘটনা দেখা যায়। কিন্তু যাদের ঘর থেকে লাশটি উদ্ধার হয়েছে তারা মাত্র দু-মাস যাবৎ এ এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছে এবং এদের কারো সাথেই নিহত আলিফের পরিবারের কোনো বিরোধ নেই বলে জানা গেছে। তাই তদন্ত না করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ