৩০ টাকার চকলেটের প্রলোভনে প্রাণ নিল আলিফের

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:৩৪ এএম, ১৮ আগস্ট ২০১৮ শনিবার

৩০ টাকার চকলেটের প্রলোভনে প্রাণ নিল আলিফের

নারায়ণগঞ্জ শহরের জল্লারপাড় এলাকাতে ৫ বছরের শিশু শিহাবউদ্দিন আলিফ হত্যায় বাড়ির পাশের প্রতিবেশীরাই জড়িত ধারণা করছে পুলিশ। মামলাতেও যে দুইজনকে আসামী করা হয়েছে তারাও প্রতিবেশী। তাদের মধ্যেই একজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। আলিফের সঙ্গে সে সময় খেলাধুলা করতে  থাকা আরেক শিশুই জানিয়েছে দুই দফায় ৩০ টাকা চকলেটের প্রলোভন দেখিয়েই মূলত আলিফকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়।

শিহাবউদ্দিন আলিফ (৫) হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। নিহতের বাবা আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে শুক্রবার দুপুরে সদর মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এতে প্রতিবেশী অহিদ ও রিপন ওরফে সমরাটকে আসামী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রিপন বৃহস্পতিবার রাতেই আটক হন।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে জল্লারপাড় আমহাট্টা এলাকার নান্নু মিয়ার একটি ঘর থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। ওই ঘরেই ভাড়া থাকতো অহিদ ও রিপন। তারা মূলত রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করতো। নিহত আলিফ ওই এলাকার আলমগীর হোসেনের ছেলে। আলমগীর সৌদি প্রবাসী। বুধবার রাতে সে দেশে ফিরেন। চার ভাই বোনের মধ্যে আলিফ ছিল সবার ছোট ও খুব আদরের।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অজয় কুমার পাল জানান, নিহতের বাবা বাদী হয়ে অপহরণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেছে। এতে আটক রিপন ওরফে সমরাটকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকজন অজ্ঞাতজনকে আসামী করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানান, একজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। হত্যার রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা চলছে।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে আলিফ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয় জড়িত থাকতে পারে। ইতোমধ্যে পুলিশ কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকাতে রেখেছে।

জানা গেছে, শিহাবউদ্দিন আলিফ এলাকার প্রতিবেশীদের কাছেও ছিল আদরের পাত্র। বাড়ির বাইরে বা প্রতিবেশী নান্নু মিয়ার ছেলে ফাহাদের সাথে খেলাধুলাতেই কাটতো তার দিনের বেশীরভাগ সময়। আলিফদের কয়েক বাড়ি পরেই নান্নু মিয়ার বাড়ি। নান্নু মিয়া সম্পর্কে আলিফের ফুফাতো ভাই।

বৃহস্পতিবার ১৭ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টা। ফাহাদের সাথেই নান্নুদের ঘরে খেলা করছিলো আলিফ। ফাহাদের বড় বোন তখন স্কুলে। নান্নু মিয়া রাজমিস্ত্রীর ঠিকাদার, তাই তিনিও ছিলেন কাজে। ফাহাদের মা পিংকি বিদ্যুৎ বিল দেয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হবার পূর্বে ফাহাদ ও আলিফকে বলে গেলেন তারা যেন বাড়ি থেকে বাইরে না যায়। এরপর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে তিনি যান আলিফের মা সালমা বেগমের সাথে দেখা করতে। সেখান থেকে ফিরেছেন দুপুর আনুমানিক দেড়টায়। তিনি বাসায় ফিরতেই দেখেন আলিফ নেই। ফাহাদের কাছে জানতে চাইলে ফাহাদ জানায় পাশের বাড়ির অহিদ ভাইয়া ওকে চকলেট দেবার কথা বলে ডেকে নিয়ে গেছে এবং তাকেও দুটো চকলেট দিয়ে গেছে। এরপর ফাহাদ মায়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে যায় অহিদ ও রিপনের ভাড়া বাসায়। সেখানে গিয়ে ঘর তালাবদ্ধ দেখেন পিংকি। পাশের ঘরের ভাড়াটিয়া বিথীর কাছে জানতে চান অহিদ কোথায় কিংবা আলিফকে তিনি দেখেছেন কীনা? বিথী জানায় সে সেলাই মেশিনে নিজের কাজ করছিলো। তাই পাশের ঘরে অহিদ বা রিপন কেউ এসেছিলো কীনা তা তিনি টের পাননি। এদিকে আলিফকেও দেখেননি বলে জানান তিনি। এ সময় পিংকি ওহিদের বাড়িওয়ালা খোকনের স্ত্রীকে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, এই ঘরে কী একটা বাচ্চাকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব? তার কথায় আশ্বাস্ত হয়ে সেখান থেকে চলে আসেন পিংকী।

শুরু হয় আত্মীয় স্বজন ও প্রতীবেশীদের সার্চ মিশন। এ বাড়ি ও বাড়ি আলিফকে খোঁজ করেন তারা। মসজিদের মাইক দিয়ে এনাউন্সমেন্ট বা পাশ্ববর্তী গরুর হাটে খোঁজাও বাদ পরেনি। ৭ বছরের আরেক শিশু ফাহাদের কথা আমলেই নেননি কেউ। এদিকে খোঁজ করার এক পর্যায়ে ওহিদের সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে আলিফের মা ওহিদের উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেন, তুই আমার ছেলেকে চকলেট কিনে দিয়েছিস কেন? জবাবে অহিদ বলে, কেন কী হয়েছে খালা! ওরা তো দোকানের সামনে ঘুরছিলো, ছোট মানুষ তাই মন চাইলে চকলেট কিনে দেই। এটা আর এমন কী! তখন আলিফের মা জানায় আলিফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর প্রায় আধাঘণ্টা আনুমানিক ৩টা পর্র্যন্ত প্রতিবেশী ও স্বজনদের সাথে আলিফকে খুঁজে বেরিয়েছে ওহিদ। এরপর হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায় সে।

এরপর অহিদ উধাও হবার পরপরই পিংকী, প্রতিবেশী মেঘলা ও বিলকিসসহ অন্যান্য আরও অনেকে ছুটে যান ওহিদের রুমমেট রিপন ওরফে সম্রাটের কাছে।  সম্রাটকে বলেন, তোদের রুমের চাবি দে এবং এক্ষুণি অহিদকে কল কর।  সম্রাট জানায় তার মোবাইল ফোনটি অহিদ নিয়ে গেছে। এরপর অন্য আরেকজনের ফোন থেকে অহিদকে কল করা হলে সে ফোনটি রিসিভ করে জানায় সে নিতাইগঞ্জে একটি কাজে ব্যাস্ত আসতে দেরি হবে। এরপর তারা দ্রুত এসে অহিদের রুমের তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে। ঘরে আর তেমন কিছু না থাকায় ভিতরে প্রবেশ করতেই তাদের চোখে পড়ে একটি সিমেন্টের বস্তার দিকে। বস্তা খুললে দেখতে পান সেখানে অনেকগুলো কংক্রিটের ভাঙা টুকরো রয়েছে। এসময় প্রতিবেশী মেঘলা নীচের দিকে চাপ দিয়ে বুঝতে পারেন নিচে কংক্রিট নয়, অপেক্ষাকৃত নরম কিছু রয়েছে। এক পর্যায়ে পিংকি পুরো বস্তা ধরে উপুড় করে ফেললে পলিথিন ব্যাগে মোড়ানো শিশু আলিফের লাশ বেরিয়ে আসে। লাশ উদ্ধারের সাথে সাথে ওহিদের রুমমেট রিপনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এলাকাবাসী। এরপর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশকে ঘটনাটি জানানো হলে পুলিশ এসে রিপনকে আটক করে।

এদিকে আলিফের খেলার সাথী ফাহাদ জানায়, আলিফ কিংবা ফাহাদ কেউই বাড়ির বাইরে যায়নি। তারা যখন খেলছিলো তখন অহিদ এসেই ডেকে নিয়ে যায় আলিফকে। এ সময় ফাহাদ আলিফের সাথে সাথে অহিদের ঘর পর্যন্ত গেলে অহিদ প্রথমে ২০ টাকা দিয়ে ফাহিদকে দোকানে পাঠায় চকলেট আনতে। ফাহাদ প্রথমবার চকলেট এনে দেখে অহিদ দরজা লাগিয়ে ঘরের ভিতরে রয়েছে। এসময় জানালা দিয়ে চকলেটগুলো নিয়ে অহিদ ফাহাদকে আরও ১০ টাকা দিয়ে চকলেট আনতে বলে। দ্বিতীয়বার ফাহাদ চকলেট নিয়ে এলে অহিদ তার হাতে দুটো চকলেট দিয়ে জানায় আলিফ বাসায় চলে গেছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, অহিদের বাড়ি নোয়াখালী বলে সে এলাকাবাসীর কাছে পরিচয় দিতো। অহিদ বা রিপনের কাউকেই এর আগে এই এলাকায় দেখেননি তারা। গত দেড় মাস আগে অহিদ প্রথমে এসে খোকনের ভাড়া বাসার একটি রুমে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিন পর রিপনকেও নিয়ে আসেন। তাদের বাড়িওয়ালা খোকনের সুপারিশে ঠিকাদার নান্নুর কাছে রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজও শুরু করে। কিন্তু সে কাজে খুব বেশী উদাসীন হওয়ায় নান্নু তাকে বেশীদিন কাজে রাখেনি। এরপর থেকে সে কী করতো তা এলাকাবাসীর কারও কাছে সঠিক তথ্য নেই।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও