নগরজুড়ে দখলদারদের মহোৎসব

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৮ পিএম, ৯ জানুয়ারি ২০১৯ বুধবার

নগরজুড়ে দখলদারদের মহোৎসব

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর ঘটনা হচ্ছে হকার উচ্ছেদ অভিযান। নানা তর্ক বিতর্ক হয়েছে এই অভিযানকে ঘিরে। হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে হামলা হয় সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর উপর। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসা নিষিদ্ধ হলেও এখন আবারো চলে গেছে আগের অবস্থায়।

শুধু বঙ্গবন্ধু সড়ক নয়। নগরীর প্রধান সড়কগুলো জুড়ে চলছে ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা। বঙ্গবন্ধু সড়ক, নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়ক, শায়েস্তা খান সড়ক, ২নং রেল গেট হতে লঞ্চ ঘাট পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী সড়কের অবস্থা এখন সব থেকে ভয়াবহ। বিকেল হলেই এসব সড়কে পসরা সাজিয়ে বসতে থাকে হকাররা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ পথচারীদের।

গত ডিসেম্বরে ২৫ তারিখে শুর হওয়া হকার উচ্ছেদ অভিযান দেশ জুড়ে আলোচনায় আসে ১৬ জানুয়ারি মেয়র আইভির উপর হামলার মধ্য দিয়ে। এর পর কয়েক মাস বঙ্গবন্ধু রোড হকার মুক্ত থাকলেও বর্তমান চিত্র আগের মতই। বঙ্গবন্ধু রোডের খাজা সুপার মার্কেটে পাশে, মুক্তি জেনারেল হাসপাতালের সমনে, সাধুপৌলের গীর্জার সামনে অবস্থা সব থেকে ভয়াবহ। বিকেল হলে সড়কের এই স্পটগুলো দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে যাওয়া অসম্ভব।

বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার মুক্ত রাখার চেষ্টা মাঝে মধ্যে করলেও মজার ব্যাপার হলো বঙ্গবন্ধু রোডের হকারদের নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন। নগরীর অন্যান্য সড়কের অবৈধ দখলদার এবং হকারদের নিয়ে ততটাই উদাসীন।

বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার উচ্ছেদের ঠিকানা হয় শায়েস্তা খান (এসকে) সড়ক। ছোট সড়কটির দুই পাশে হকার এবং অবৈধ রিকশা পার্কিংয়ের কারণে এখন যানজট লেগেই থাকে। এই সড়কে রিকশার আধিক্য এত বেশি যে এখানে সাধারণ পথচারীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

একই অবস্থা নগরীর অন্যতম প্রধান সড়ক নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কের। এই সড়কে কোনো ফুটপাত নেই। মূল সড়ক দখল করেই ব্যবসা নিয়ে বসে হকাররা। এছাড়া যত্রতত্র ওষুধ কোম্পানির গাড়ি, রিকশা ও ইজিবাইক পার্ক করে রাখায় রাস্তার অর্ধেকটা দখল হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু সড়কে বড় যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কে বড় যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। অবৈধ ভাবে সড়কের অর্ধেকটা দখল হওয়ায় এখন অধিকাংশ সময় এই সড়কে লেগে থাকে ভয়াবহ যানজট।

নগরীর আরেক সড়ক সোহরাওয়ার্দী সড়কের ফুটপাত দখল করে বেশ নিশ্চিন্তেই ব্যবসা করছেন হকাররা। ফুটপাতে ছোট চৌকি বসিয়ে এখানে হকারদের ব্যবসা চলে।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে সব থেকে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েয়ে ২নং রেল গেইট থেকে ২নং রেল গেইট পর্যন্ত রেল লাইনের দুই পাশের অবৈধ দখল। এই জায়গাটুকুত প্রতিনিয়ত মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে চলারল করতে হয় পথচারীদের। রেল লাইনের দুই পাশে অবৈধ দখলদারদের জন্য দেখা যায় না কখন ট্রেন আসে। ফলে আচমকা ট্রেন চলে আসলে কোথাও যাওয়ার থকে না। দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

মূলত নগরীর প্রধান সড়কগুলোর সবগুলোই অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। ফলে প্রতিনিয়তই নগরবাসীকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। মাঝেমাঝে বঙ্গবন্ধু রোডে উচ্ছেদ অভিযান ছাড়া তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না কর্তৃপক্ষের। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন নগরবাসী।

ভোগান্তি প্রসঙ্গে পথচারী আরিফা আক্তার নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, বিকাল হলেই রাস্তায় হাঁটা যায় না। পুরুষদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে হয়। অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। রাস্তায় এত মানুষ থাকে যে লজ্জায় কিছু বলতেও পারি না। সরকার নারীদের নিরাপত্তা নিয়া কতকিছুই তো করতাছে। কিন্তু এইসব জায়গায় যে নারীরা কতটা হয়রানি হয় তা দেখতে হবে। এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে হবে। তাছাড়া নারীরা নিরাপদের সড়কে চলাচল করতে পারবে না।

প্রসঙ্গত ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করা হয়। পরের দিন থেকে হকারদের আন্দোলন চলতে থাকে। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেখা হয়। চলে টানা বিক্ষোভ মিছিল। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি বিকেল সোয়া ৪টার দিকে নগর ভবনের সামনে থেকে বের হয় মেয়র আইভী। এদিকে শত শত হকার অবস্থান নেয় চাষাঢ়া শহীদ মিনারে। মেয়র আইভী পায়ে হেঁটে নগর থেকে চাষাঢ়ার দিকে আসতে থাকে। তবে ওইদিন সকালেই জানা গিয়েছিল মেয়র আইভী প্রেস ক্লাব পর্যন্ত আসবেন পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে চলে যাবেন। এবং হেঁটে হকার ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসবেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় হকার বসতে শুরু করে। এমন অবস্থায় চাষাঢ়া সায়াম প্লাজার সামনে চলে আসেন আইভী। ওই শহীদ মিনার হকাররাও সায়াম প্লাজার দিকে যাওয়া শুরু করে। এরি মধ্যে শুরু হয়ে যায় দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি ইটপাটকেল নিক্ষেপ।

গত ১৬ জানুয়ারির হামলার ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনেরও একটি কমিটি হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার তিন সদস্যের এই কমিটির প্রধান। অপর দুই সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান ও র‌্যাব-১১-এর সহকারী পরিচালক (এএসপি) বাবুল আখতার। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার কথা। কমিটি আবেদন করে দুই দফায় কার্যদিবস সময় বাড়িয়ে নিয়েছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও