চাষাঢ়া সমবায় মার্কেটের সামনে অবৈধ স্ট্যান্ড

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৭ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার

চাষাঢ়া সমবায় মার্কেটের সামনে অবৈধ স্ট্যান্ড

বেশ ঘটা করেই জানুয়ারী মাসে নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদ। তবে তার অঙ্গীকারের ২৪ ঘন্টার বেশী সময় পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি দখলমুক্ত হয়নি ফুটপাত ও সড়ক। বিশেষ করে শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়া এলাকায় অবস্থিত ৮টি অবৈধ স্ট্যান্ড এবং ফুটপাত ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আশেপাশের এলাকা আগের মতোই হকার ও অবৈধ স্ট্যান্ড দখলদারদের দখলে রয়েছে। শুক্রবার বিকেলে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হকার্স নেতা রহিম মুন্সীকে সঙ্গে নিয়ে চাষাঢ়ায় সোনালী ব্যাংকের সামনের সড়ক থেকে কিছু সিএনজি ও হকারকে সরাতে দেখা গেলেও তারা চলে যাওয়ার পরে আবারো পূর্বের অবস্থায় উপনীতি হয়।

জানা গেছে,  জানুয়ারি মাসেই শহরের যানজট, অবৈধ স্ট্যান্ড, হকার, মাদক ও ভূমিদস্যূ মুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গিকার করেছেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদ। এসময় তিনি নগরবাসী, সাংবাদিক সহ জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা কামনা করেন। যেকোন অপরাধের তথ্য দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থ গ্রহণ করবেন বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

১০ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার দুপুরে শহরের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় শহীদ বেদীতে অবস্থান নেয়া স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন। এছাড়াও শহীদ মিনারের চারদিকে অবৈধভাবে থাকা হকার, সিএনজি স্ট্যান্ড ও গাড়ি পার্কিংয়ের উচ্ছেদ ও জরিমানার নির্দেশ দেন। এসপি হারুন অর রশিদ বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আমরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছি। তবে ওই সময় নাগরিক অনেক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়নি। সেজন্য আমরা এ মুহূর্তে চাষাঢ়া ও মহিলা কলেজের আশেপাশের যানজট নিরসনে কাজ শুরু করেছি। পরবর্তীতে ধারাবাহিক ভাবে বঙ্গবন্ধু সড়কে করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ভূমিদস্যূ, মাদক ও যানজট নিরসনে কাজ করবো। ডিসেম্বর ছিল নির্বাচনের। জানুয়ারি মাস থাকবে যানজট মুক্ত, হকার মুক্ত এবং মাদক মুক্ত নারায়ণগঞ্জ হিসেবে। মাদক, ভূমিদস্যূদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী দিয়ে এসপি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকবে। মাদকের কোন ছাড় নাই। মাদকের সঙ্গে যদি কোন পুলিশ সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ থেকে তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নারায়ণগঞ্জে আমাদের কাছে অনেক ভূমিদস্যূর নাম এসেছে। যেখানে কয়েকজন কাউন্সিলরের নামও আছে। ভূমিদস্যূর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদি আপনাদের কাছে এ ধরনের কোন অভিযোগ থেকে থাকে, কিংবা মাদক বিক্রি করে থাকে বা পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে থাকে তাহলে জানাবেন আমরা ব্যবস্থা নিবো। আমরা আপনাদের পাশে আছি, আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন। যেখানে মাদক, ভূমিদস্যূ সেখানে অভিযান চলবে। বাসযোগ্য করার জন্য যা যা করার প্রয়োজন তাই করবো।

শহরের যানজট ও হকার মুক্ত করার অভিযানের বিষয়ে এসপি বলেন, জেলা প্রশাসন সহ জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়েছে আমরা দ্রুত এ বিষয়ে কাজ করবো।  পুলিশ সদস্যদের হুশিয়ারী দিয়ে এসপি বলেন, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ কোন কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশের ছত্রছায়ায় মাদক, ভূমিদস্যূ, বালুসন্ত্রাস হবে সেটা চলবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে এসপি হারুনের এহেন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই হকার ও অবৈধ স্ট্যান্ড ইস্যুতে নাগরিক দুর্ভোগে ভুগতে থাকা নগরবাসী। বিশেষ করে ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর বড় দিনের উৎসবের সময় তৎকালীন পুলিশ সুপার মঈনুল হক বড়দিনের উৎসবে যোগ দিতে আসলে তৎকালীন সদর মডেল থানার ওসি শাহীন শাহ পারভেজ একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে হকার ইস্যুতে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। ওই ঘটনার জের ধরে ওসিকে ক্লোজড করার পাশাপাশি গোটা নগরীতেই হকার ইস্যুতে কঠোর হন তৎকালীন পুলিশ সুপারসহ প্রশাসন। এরপর হকাররা আন্দোলনে নামলে সহোদর এমপি সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান হকারদের পক্ষ নেন। অপরদিকে হকার বিরোধী কঠোর অবস্থানেই ছিলেন নাসিকের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারী মেয়র আইভী সিটি করপোরেশনের জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অনুগামী নেতাকর্মীসহ চাষাঢ়ায় সায়াম প্লাজার সামনে আসলে শামীম ওসমান সমর্থক ও হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঘটনার শুরুর দিকে যুবলীগের সক্রিয় নেতা ও এমপি শামীম ওসমান সমর্থক নিয়াজুল ইসলামের প্রকাশ্য অস্ত্র হাতে আইভীকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। ওইসময় আইভীর সঙ্গে থাকা লোকজন তাকে মানবঢাল তৈরীর মাধ্যমে রক্ষা করেন। এছাড়া তৎকালে এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্টজন মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর কমিউনিটি পুলিশিং এর সেক্রেটারী শাহ নিজামের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা গুলি করার অভিযোগ উঠে। পরে মেয়র আইভী দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

এদিকে ওই ঘটনার পরে দীর্ঘদিন শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলেও পুলিশ সুপার মঈনুল হকের বদলীর পরে আবারো দখল হয়ে যায় ফুটপাত। আবারো বহাল হয়ে যায় শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় ৮টি অবৈধ স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন মোড়ের অবৈধ স্ট্যান্ড। কিছু কিছু স্থানে ফুটপাত এমনভাবে দখল হয়েছে সেখানে সাধারণ মানুষের ফুটপাত দিয়ে চলার উপায় নেই। যেমন চাষাঢ়ায় সোনালী ব্যাংকের সামনে ফুটপাত যেমন দখল হয়েছে ঠিক তার সামনের সড়কেও রয়েছে অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ‘দৈনিক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সড়কে সবচেয়ে বেশি হকার বসে। আর এই সড়কে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। যেকারণে এই ফুটপাতের চাঁদবাজির পরিমাণও বেশি। তার উপরে পুলিশি ও রাজনৈতিক বাধা পেরুতে গিয়ে সেই চাঁদার পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এতে করে হকার নেতারা উপর মহলকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে ফের হকার বসাচ্ছেন। তবে এই মোটা অংকের টাকার যোগান দিতে হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদাবাজি করে থাকে বিভিন্ন হকার নেতারা। এরপরই রয়েছে সিরাদ্দৌলা সড়ক ও নবাব সলিমুল্লাহ সড়ক। এই তিনটি সড়কে চাঁদাবাজির পরিমাণ একের হকারদের কাছে একের রকম। ফুটপাতে দোকানের পজিশন অনুযায়ী হকারদের চাঁদার পরিমাণ কম বেশি হয়ে থাকে। তবে পুলিশি ও রাজনৈতিক যত বাধা বিপত্তি আসে হকাদের কাঁধে এই চাঁদার পরিমাণ তত বাড়ে। তাই এ চাঁদার পরিমাণ গত কয়েক মাসে দুই থেক তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে এই চাঁদা শুধুমাত্র হকারদের দিয়েই খান্ত করা যায়না তার সাথে নতুন করে আবার পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ফের ভাগ বসায়।

হকার সূত্র বলছে, ‘প্রতিদিন বিভিন্ন দোকানের পজিশন অনুযায়ী ১শ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। যদিও বিগত দিনে সর্বোচ্চ ৫শ টাকা চাঁদা আদায়ের বিষয়টি জানা গেলেও সেই চাঁদার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা হয়েছে। যদিও হকার নেতারা পুলিশ প্রশাসন সহ রাজনৈতিক বিভিন্ন আমলাদের কথা বলে হকার নেতারা এই টাকা হকারদের কাছ থেকে আদায় করলেও পরবর্তীতে আবারো পুলিশ প্রশাসনের কিছু আসাধু কর্মকর্তারা হকারদের কাছে ফের টাকা দাবি করে। আর হকাররা অনেকটা বাধ্য হয়ে সেই দাবিকৃত টাকা দেয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে প্রতিদিন প্রায় লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদয় হচ্ছে ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে। তবে এতে করে হকার নেতা ও এক ধরণের অসাধু পুলিশ প্রশাসন এর সাথে জড়িত রয়েছে যারা এই টাকার ভাগ পেয়ে লাভবান হচ্ছেন। তবে হকার ইস্যুতে হার্ডলাইনে থাকা পুলিশ প্রশাসন সম্প্রতি নিরব ভূমিকা পালন করলে চাঁদাবাজির সাথে পুলিশ প্রশাসনের সম্পৃক্ততার অভিযোগটি আরো দৃঢ় হতে থাকে। আর তাতে করে হকারদের ফুটপাত দখলদারিত্বের বিষয়টি স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। তবে পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদের অঙ্গীকারের পরে আবারো স্বস্তিতে ফুটপাতে হাটতে পারবেন এমন আশার আলো দেখছেন নগরবাসী। কিন্তু পুলিশ সুপারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে নিতে হবে কঠোর থেকে কঠোরতর পদক্ষেপ।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও