শহরে অবৈধ অটোরিকশা নিচ্ছে একের পর এক প্রাণ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩১ পিএম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার

শহরে অবৈধ অটোরিকশা নিচ্ছে একের পর এক প্রাণ

নারায়ণগঞ্জ পুলিশ প্রশাসনের কঠোরতায় বদলে গেছে নগরীর প্রধান ও ব্যস্ততম বঙ্গবন্ধু সড়কের চিত্র। আতঙ্কে রয়েছে মাদক ব্যবসায়ী সহ সন্ত্রাসীরা। শহর জুড়ে যখন পরিবতর্নের হাওয়ায় বইতে শুরু করছে তখনও নৈরাজ্য ও বেপরোয়া ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা চালকেরা। অবৈধ স্ট্যান্ড, ছাড়পত্র কিংবা কোন কাগজপত্র ছাড়াই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নগরের আশেপাশের পাড়া মহল্লা ও আলিগলিতে। ফলে একের পর এক যেমন দুর্ঘটনা ঘটছে তেমনি ওইসব গলিতে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে যানজট ও জনগনের ভোগান্তি।

৫ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার দুপুরে গলাচিপা কলেজ রোডে বেপরোয়া ব্যাটারী চালিত অটোরিকশার ধাক্কায় নুসরাত আক্তার নামে সাত বছরের এক শিশু নিহত হয়।

এর আগে ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই বিকেলে শহরের খানপুর মহসিন ক্লাবের সামনে অটোরিকশার চাপায় সামিয়া আক্তার (৪) নামে এক শিশু নিহত হয়।

একই বছরের ৩ মার্চ দুপুরে শহরের নন্দীপাড়া মান্নান মিয়ার বাড়ির সামনে অটোরিকশার চাপায় বিপদ নন্দী (৭) নামে শিশু নিহত হয়। এছাড়াও ৩০ মার্চ বন্দরের নূরবাগ এলাকায় অটোরিকশার চাপায় আরাফাত (৪) নামের শিশু নিহত হয়।

৭ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি টিসি রোডের ইউরো টাওয়ার এলাকায় অটোরিকশার চাপায় জান্নাতুল ফেরদৌস রাত্রি (৯) নামে এক শিশু নিহত হয়। কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে আসলেও আরো অনেক নিহত কিংবা আহতের ঘটনা আড়াল হয়ে যায়। এলাকার প্রভাবশালী মহল ভয়ভিত্তি দেখিয়ে কিংবা টাকা দিয়ে মিমাংসা করে ফেলেন। যার কারণে এ অটোরিকশার এ দৌরাত্ম্য ও নৈরাজ্য খুব বেশি মানুষের সামনে প্রকাশ পায় না। 

জানা গেছে, শুধু মাত্র নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের উভয় পাশে মহল্লার প্রবেশ রাস্তায় অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড রয়েছে ৮ থেকে ১০টির বেশি। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের পাশে, নূর মসজিদের পাশে (হার্ট সেন্টার গলি), গলাচিপা মোড়, উকিলপাড়া মোড়, ২নং রেল গেটের পশ্চিম পাশে, মর্গ্যান স্কুলের সামনে, মন্ডলপাড়া ব্রীজ সংলগ্ন পাইকপাড়া রাস্তায়, কিন্ডয়ার কেয়ার স্কুলের গেটের সামনে, নিতাইগঞ্জ আলাউদ্দিন খান স্টেডিয়ামের পাশে, নিতাইগঞ্জ মোড়, কালীরবাজার, আমলাপাড়া, খানপুর, ডনচেম্বার ইত্যাদি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব মোড় বা গলিগুলোতে অবৈধভাবে স্ট্যান্ড করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। সেটা সর্বনি¤œ ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত। তাছাড়া নতুন গাড়ি হলে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আর প্রতিটি গলির টাকা তুলেন সে এলাকার প্রভাবশালীরা। তবে ওই টাকার একটি অংশ পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সদস্যদেরকেও দেয়া হয়। ফলে পুলিশ প্রশাসন বেলা ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রধান বঙ্গবন্ধু সড়কের চলাচল করতে না দিলেও তারা ঠিকই রাতের বেলায় চলাচল করে। এছাড়া দাপিয়ে বেড়ায় মহল্লার রাস্তাগুলো থেকে। এ জন্য তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয় না।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বেশ কয়েকটি সভায় এ অবৈধ অটোরিকশা বন্ধে ২৭টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সহযোগিতা কামনা করলেও তেমন কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি কাউন্সিলরদের মধ্য থেকেও। এ উদ্যোগ না নেওয়ার পিছনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাব থাকায় সম্ভব হয় না বলেও দাবি করেন কয়েকজন কাউন্সিলর। এছাড়াও কিছু কাউন্সিলর পিছন থেকে এ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে তারা নিজেরাও চান না এ অটোরিকশা বন্ধ হোক। 

খানপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, এ অটোরিকশাগুলো যে শুধু দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে তা নয়। এরা ব্যাটারীগুলো চার্জ দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ চুরি করছে। কিন্তু এগুলোর বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেই জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের। অবিলম্বে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা রবিন আহমেদ বলেন, সরকার এগুলো চূড়ান্তভাবে বন্ধের ঘোষণা দিলে এগুলো কেউ চালাতে পারবে না। প্রধান সড়কগুলোতে চলতে না দিলেও তারা ঠিকই অলিগলিতে চলে। একটি অটোরিকশায় চালক সহ ৬ থেকে ৭জন থাকে। কিন্তু এর জন্য নূন্যতম চালকের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয় না। ছোট কোন দুর্ঘটনা ঘটলে এ ৬ থেকে ৭জনের মৃত্যু হয়। মূলত পুলিশ প্রশাসন, বিআরটিসি, স্থানীয় প্রভাবশালী সবাই এ সব অবৈধ যানবাহন থেকে টাকা পায়। ফলে কেউ বাধা দিতে আসে না।

তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি জেলা পুলিশ প্রশাসন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে নগরীর চিত্র বদলে দিয়েছেন। তাই তিনি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে হয়তো পরিবর্তন আসতে পারে।

গলাচিপা এলাকার অটোরিকশা চালক বলেন, সারা দেশে সকল যানবাহনের চলাচলের জন্য অনুমতি আছে। তবে কেনে অটোরিকশাকে দেওয়া হয় না। প্রয়োজনে রিকশা বন্ধ করে অটোরিকশা দেওয়া হোক তাহলে শহরে যানজট সৃষ্টি হবে না। এক সঙ্গে একাধিক মানুষ চলাচল করতে হবে। জনগনের ভাড়াও বাঁচবে।

তিনি আরো বলেন, লাইসেন্স কিংবা নাম্বার প্লেট দেওয়া হলে বছরে আমরা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সরকারকে দিবো। কিন্তু এখন প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বের হলেই পুলিশ, নেতা, লাইনম্যান সহ বিভিন্ন জনকে গড়ে ২০০ টাকা দিতে হয়। এভাবে মাসে হিসেব করলে ৬ হাজার টাকা। কিন্তু সরকারকে মাসে ৬ হাজার টাকা দিতে হবে না। দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে গাড়ির জন্য বৈদ্যুতিক মিটার দেয়া হোক কেউ চুরি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে না।

চাষাঢ়ায় যানজট নিরসনে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, নগরীতে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কোন ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা কিংবা রিকশা প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। ফলে নগরীতে যানজট কম থাকে। তবে মাঝে মাঝে রোগীবাহী অটোরিকশা বা রিকশা প্রবেশ করে তখন ছাড় দেয়া হয়। এছাড়া নগরীতে কোন অটোরিকশা নেই। তবে যেসব অলিগলিতে অটোরিকশা থাকে সেগুলো সেখানকার স্থানীয় জনগন কিংবা কাউন্সিলররা ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কিংবা উর্ধ্বতনদের জানাবেন তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সকলে এক হয়ে কাজ করলে সবই সম্ভব।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও