নকশাকার হতে দুর্ধর্ষ খুনী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:১৫ পিএম, ৮ জুন ২০১৯ শনিবার

নকশাকার হতে দুর্ধর্ষ খুনী

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী চাঞ্চল্যকর প্রবীর কুমার ঘোষ হত্যা মামলায় তারই ব্যবসায়ীক পার্টনার পিন্টু দেবনাথকে (৪২) মৃত্যুদণ্ড, কর্মচারী বাপেন ভৌমিককে (২৮) সাত বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে আদালত। এর মধ্যে বাপেনকে সশ্রম কারাদ-ের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করে সেটা আদায় করে নিহতের পরিবারকে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয় রায়ে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলায় চার্জশীটভুক্ত আবদুল্লাহ আল মামুনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়।

হত্যাকাণ্ডের ১০ মাস পর ২৯ মে দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আনিসুর রহমান আসামীদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে পিন্টু দেবনাথ কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার চন্দনপুর গ্রামের মৃত সতীশ দেবনাথের ছেলে। বাপেন ভৌমিক কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার ঠেটালিয়া গ্রামের কুমদ ভৌমিকের ছেলে।

কে এই পিন্টু দেবনাথ

কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পিন্টু দেবনাথ প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর যাবৎ এই স্বর্ণ পট্টিতে রয়েছে। তার বাড়ী কুমিল্লা চন্দ্রনপুর। নারায়ণগঞ্জে তিনি একা আসেন এবং সুচতুর বুদ্ধিতে আজ দুই দোকানের মালিক এবং কোটিপতিও বটে। স্বর্ণপট্টি’র স্বর্ণের নকশা মাস্টার খ্যাত প্রয়াত অপু’র সহকারী ছিলেন পিন্টু দেবনাথ। দেখতে সুদর্শন পিন্টু দ্রুত নকশা কাজ বুঝে যাওয়ায় অপু তাকে দিয়ে অনেক স্বর্ণ তৈরি কাজ করাতেন। স্বল্পভাষী ছিলেন পিন্টু। কিন্তু তার কথায়ও অনেক সময়ে টনক নড়ে যেত সহকর্মীদের।

একজন স্বর্ণ শিল্পী জানান, পিন্টু দেবনাথের সঙ্গে তার একজন প্রশিক্ষকের স্ত্রী সাথে ছিল পরকীয়া। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নানা আলোচনা ছিল। পিন্টু দেবনাথ ছিলেন নারী লোভী, তার সুন্দর চেহারা ও বুদ্ধি মত্তা অনেক নারী সাথে তিনি সর্ম্পক রেখে ছিলেন।

পিন্টু আমলাপাড়া এলাকাতে রাশেদুর ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার যে ফ্লাটে থাকেন এক সময়ে ওই ফ্লাটেই থাকতেন অপু। প্রায় পনের বছর পূর্বে অপু রায় পরলোক গমন করলেও সে বাড়িতেই অপু রায়ের স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে থেকে যায় পিন্টু। পরে অপু রায়ের পরিবার তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। তখন থেকে একাই থাকা শুরু করে পিন্টু।

নকশা কর্মচারী থেকে কোটিপতি পিন্টু

আমলাপাড়া মরণ চন্দ্র কর্মকারের দোকানে প্রায় ৯বছর যাবৎ পিন্টু স্বর্ণের গহনার নকশা কাজে নিয়োজিত ছিল। একটি চক্রের পাইকারী স্বর্ণ বিক্রি সাথে পিন্টু জড়িয়ে যান। এতে টাকা সন্ধানে তার গ্রামের বাড়ী ভাইদের জায়গা বিক্রি করে টাকা স্বর্ণপট্টিতে পাইকারী স্বর্ণ ক্রয় বিক্রয়তে লাগান। তার বিক্রি টাকা তার জীবনের চাকা ঘুরে যান। ভাইদের জন্য তিনি গ্রামের বাড়ীতে জায়গা ক্রয় ও বাড়ী করে দেন। জমানো টাকা দিয়ে তিনি আমলাপাড়া ৮নং কে সি নাগ রোডের একটি ভবনে দোকান কিনে ‘পিন্টু স্বর্ণ শিল্পালয় স্বর্ণ দোকান’ গড়ে তুলেন। তিনি এই দোকান মালিক হিসেবে বসতে শুরু করে। স্বর্ণ ক্রয় ও বন্ধক করতে তিনি ছিলেন পারদর্শী। ক্রেতা বা বন্ধক ছুটাতে ব্যর্থ হলে সামনেই বলতেন, “স্বর্ণগুলো টুকরো টুকরো করে গলাইয়া দে”। এমনতা প্রায় সময় পিন্টু মুখে শুনে অনেক অবাক হতেন। এই সুন্দর মানুষ ও ঠান্ডা মানুষ কেমন কথা বলেন? পিন্টু আরেক দোকান ক্রয় করে স্বর্ণপট্টিতেই। তখন তার নিয়ে অনেক কানাঘুষা চলতো স্বর্ণপট্টিতে।

প্রবীরের সাথে পিন্টু সম্পর্ক

নিহত প্রবীর ঘোষ ছিলেন তারা বাবা ভোলানাথ ঘোষের দোকানের পলিশ শ্রমিক। তাদের নিজস্ব দোকান হলেও কষ্টে জীবন করতো প্রবীর ঘোষের পরিবার। ব্যবসার একটি অংশের টাকা থেকে বাবা ভোলানাথ ঘোষ ও প্রবীর ঘোষ মিলে তার ছোট ভাই সৌমিক চন্দ্র ঘোষকে ইটালিতে পাঠান। এরপর থেকে কিছু পরিবর্তন হয় প্রবীর পরিবারের। স্বর্ণ পলিশ ও নকশা কাজে গভীর সম্পর্ক হয় প্রবীর ও পিন্টু সাথে। প্রবীর ও পিন্টু সকল বন্ধুরা একত্রে ঠান্ডু মিয়ার বাড়ী আশেপাশে গলিতে আড্ডা জমতো। তাদের দুইজনের সাথে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক ছিল কম। ভোলানাথ ঘোষ অসুস্থ হওয়া পর থেকে বাবা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন প্রবীর ঘোষ। তখন দোকান ও পরিবার দিক দেখাশোনা করতো তাদের ছোট ছেলে বিপ্লব চন্দ্র ঘোষ। এ সময় বাড়ীতে আসা যাওয়া ছিল পিন্টু দেবনাথের। পিন্টু দেবনাথ প্রায় সময় বাড়ীতে আসতেন এবং অনেক সময় কাটাতেন বলে জানা গেছে। তার সাথে সত্যতা পাওয়া গেছে প্রবীরের ছোট ভাই বিপ্লব চন্দ্র ঘোষের কাছে। তিনি বলেন, প্রবীর দা সাথে প্রায় সময় পিন্টু বাসা আসতেন। তিনিই যে আমার দাদা থেকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করবে ভাবতে পারছি না।

একটি সূত্রে জানা গেছে, ক্রেতাদের স্বর্ণ বিক্রি ও বন্ধক নিয়ে প্রবীর ও পিন্টুর সম্পর্ক ছিল অনেক মজবুত। তাদের মধ্যে কমিশনও ভাগবাটোয়ারা হত। কিন্ত সে টা কেউ জানতো না। আমলাপাড়া ঠান্ডু বাড়ীতে পিন্টু ঘরেই রাত ও গভীর রাতও বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা জমতো। প্রতিবেশীরা তারা স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ভাড়া থাকতেন বলেন কেউ তাদের প্রতিবাদ বা জিজ্ঞাসা করতেন না।

গত কয়েক বছরে পিন্টু দেবনাথ আক্রান্ত হয় কঠিন রোগে। একবার হয় স্ট্রোক আবার হয় হার্ট অ্যাটাক। দুবারই পিন্টু দেবনাথের অবস্থা হয় সংকটাপন্ন। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন পিন্টু দেবনাথ। ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধু প্রবীর ঘোষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়েযান ভারতের মাদ্রাজে। ওপেন হার্ট সার্জারী করা হয় সেখানে। পরিচর্যার দায়িত্ব উঠিয়ে নেন নিজ কাঁধে। এর জন্য যত ব্যয় সকল কিছুই করেন বন্ধু প্রবীর ঘোষ। সংসার চালানোসহ যত খরচ সকল কিছু দেন প্রবীর ঘোষ। তার পরও বন্ধুকে খরচ এর অনূভব করতে দেননি। পিন্টু দেবনাথের শারীরিক ভাবে সুস্থ্য রাখার জন্যই তাকে অর্থনৈতিক ভাবে কোন কষ্টই বুঝতে দেননি।

প্রবীর হত্যা

পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিন্টুর দেওয়া তথ্য মতেই রাতেই শহরের কালীরবাজারের একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিদর্শন করা হয় যেখান থেকে সে চাপাতি কিনেছিল। ওই দোকান মালিক সত্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া শহরের চারারগোপ এলাকাতে চান্দু অ্যান্ড কোং দোকানের পাশে কামারের দোকানে গিয়ে ওই চাপাতি শান করা হয়। ওই দোকান মালিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

প্রসঙ্গত নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার ঠান্ডু মিয়ার ৪ তলা ভবনের নিচে সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। টুকরো টুকরো করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় ভবনের সেপটিক ট্যাংকে। পঁচন ধরে যায় লাশের মধ্যে। প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে মাথা, পা, হাত ও শরীরকে বিচ্ছিন্ন করে। হত্যার পর অংশগুলো সিমেন্টের ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয়।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও