লঞ্চে কর্মস্থলে ফিরছে মানুষ, বাল্কহেড চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৮ পিএম, ১০ জুন ২০১৯ সোমবার

ফাইল ফটো
ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে এবছর ১ জুন থেকে ৮ জুন পর্যন্ত বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ রাখার সরকারী নির্দেশনা ছিল। তবে ঈদের ছুটি শেষে এখন কর্মস্থলে ফিরছে সাধারণ মানুষ। নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানীমুখী যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোতেও উপচেপড়া ভীড়। এছাড়া বালুবাহী বাল্কহেডগুলো দিনের বেলায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে যেমন চলাচল করে তেমনি রাতের বেলাতেও চলাচল করে। এতে করে রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। কারণ এর আগেও বালুবাহী ও পণ্যবাহী নৌযানের ধাক্কায় যাত্রীবাহি লঞ্চ ডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।

জানা গেছে, নদী পথকে নিরাপদ রাখতে রাতের বেলায় মালবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পাশাপাশি ১ জুন থেকে ৮ জুন পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, মেঘনা, বুড়িগঙ্গানদীসহ দেশের সকল নদীতে দিনের বেলায় বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ রাখার জন্যও বলা হয়েছিল। এছাড়াও নৌরুটে জাল ফেলা বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়।

এদিকে ৯ জুন থেকে যেমন বালুবাহী বাল্কহেডসহ সকল ধরনের পণ্যবাহী নৌযান চলাচল যেমন শুরু হয়েছে তেমনি কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। এতে করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেনা কেউই।

২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাট এলাকাতে ১০-১২ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা শীতলক্ষ্যা পারাপারের সময়ে বালুবাহী একটি বাল্কহেড ধাক্কা দেয়। এতে নৌকাটি তলিয়ে যায়। তখন যাত্রীরা সাতরিয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও তাৎক্ষনিক চাঁন মিয়া (৪০), তার স্ত্রী সেতু বেগম (২৫) ও তার ছেলে সাব্বির আহমেদ সাফিন (৪) নিখোঁজ থাকে। পরে নদীর পূর্ব পাড়ে সাতরিয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হয় চাঁন মিয়া। পরে সেতু বেগম ও সাব্বিরের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০১৫ সালের ৩০ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যায় নৌকা ডুবিতে আল আমিন (১৯) নামের গার্মেন্ট শ্রমিক নিহত হয়। নিহত আল আমিন বন্দর উপজেলার চৌরাপাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে। সে সিদ্ধিরগঞ্জ জেলেপাড়া এলাকার বনানী গার্মেন্টের শ্রমিক। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এএসআই সাখাওয়াত হোসেন জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের চিত্তরঞ্জন এলাকায় শীতলক্ষ্যায় নদীতে যাত্রী নিয়ে ৮-১০ বহন করা একটি নৌকা পারাপারের সময়ে ‘এলাহী ভরসা’ নামে বালুবাহী বাল্কহেড ধাক্কা দেয়। এতে সবাই সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও আলআমিন নিখোঁজ থাকে। বালুবাহী বাল্কহেড আটক করা হয়েছে। নিখোঁজ গার্মেন্ট শ্রমিককে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ শ্রমিক শিপনের (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।নিহত শিপন মিয়া গোপালগঞ্জ জেলার দুর্গাপুর এলাকার জোবেদ মিয়ার ছেলে। মোহনপুর থেকে বালুবাহী ‘বালুকনা’ নামের একটি বাল্কহেড চর কিশোরগঞ্জ এলাকায় আসার সময়ে ‘এমভি মাগফেরাত’ নামের একটি লাইটারেজ জাহাজ ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ওই বাল্কহেডটি পানিতে তলিয়ে যায়। ওই ঘটনায় নিখোঁজ ছিল শিপন।

এর আগে ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে মতলবের উদ্দেশ্যে এমএল সারস নামীয় লঞ্চটি সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ছেড়ে আসে। লঞ্চটি গজারিয়ার ইসমানিরচরে মধ্যবর্তী এলাকায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পৌছলে পেছন থেকে ফিরোজ ফারজানা নামে বালু বহনকারী একটি বালুুবাহী কার্গো (এম-৩৩৩২৪) পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এ সময় যাত্রীসহ লঞ্চটি ডুবে যায়। ২৫-৩০ জন যাত্রী স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে সক্ষম হয়। একই পরিবারের ৬ জন ও একই পরিবারের দুইজনসহ মোট ১৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০১২ সালের ১২ মার্চ মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত সিটি অয়েল মিলের মালিকানাধীন এমভি সিটি-১ কার্গো জাহাজটি শরিয়তপুরের সুরেশ্বর ঘাট থেকে ২ শতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসার পথে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার চরনয়াপুর এলাকায় মেঘনা নদীতে ‘শরিয়তপুর-১’ লঞ্চটিকে ধাক্কা দিলে লঞ্চটি উল্টে ডুবে যায় এবং লঞ্চে থাকা ১৪৭ জন যাত্রী নিহত হয়।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক বাবু লাল বৈদ্য জানান, বাল্কহেডগুলো নদীতে বিপজ্জনকভাবে চলাচল করে। এগুলোর না থাকে বাতি না থাকে প্রশিক্ষিত চালক। তাই ঈদুল ফিতরের যাত্রীদের নিরাপত্তার লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৮ জুন পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, মেঘনা, বুড়িগঙ্গানদীসহ দেশের সকল নদীতে দিনের বেলায় বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ রাখার জন্যও বলা হয়েছিল। ৯ জুন থেকে বাল্কহেডগুলো চলাচল শুরু হয়েছে। তবে বাল্কহেডগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নৌ পুলিশ ও কোষ্টগার্ডকে পত্র দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও আলোচনা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ নৌ পুলিশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ হাকিম জানান, বাল্কহেডগুলো যাতে রাতের বেলায় চলাচল করতে না পারে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে যাতে চলাচল করতে না পারে সেজন্য নৌ পুলিশের একাধিক টিম নদীতে টহলে রয়েছে। আশা করছি কোন ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই যাত্রীরা কর্মস্থলে ফিরতে পারবে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও