নারায়ণগঞ্জে থামছেই না ধর্ষণ গণধর্ষণের নারকীয়তা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১১ পিএম, ২৫ জুন ২০১৯ মঙ্গলবার

নারায়ণগঞ্জে থামছেই না ধর্ষণ গণধর্ষণের নারকীয়তা

নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণ গণধর্ষণের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনার পাশাপাশি বলাৎকারে প্রবণতাও বেড়েছে। নারী শিশু কেউ এই নরপশুদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। এতে করে নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবুও অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে ছাড়া পেয়ে ফের নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

১৫ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনার সচিত্র তুলে ধরা হল।

সিদ্ধিরগঞ্জে আইসক্রিম খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ২৫ জুন দুপুরে ওই শিশুর মা বাদি হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। গত ২৪ জুন সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। গ্রেফতারকৃত আল আমিন (২০) সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি দক্ষিনপাড়া এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জসিম উদ্দিন জানান, সোমবার সকালে ওই শিশু তারই ছোট ভাইকে নিয়ে বাসার সামনে খেলা করছিল। ওই সময় পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া অভিযুক্ত আলামিন শিশুটিকে আইসক্রিম খাওয়ানোর কথা বলে তার রুমে নিয়ে যায়। পরে রুমের দরজা বন্ধ করে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। শিশুটি রক্তাক্ত অবস্থায় কান্না শুরু করলে তার মুখ চেপে ধরে হত্যার হুমকি দিয়ে রুম থেকে বের করে দেয়। পরে শিশুটি বাসায় গিয়ে তার দাদীর কাছে সব কিছু জানায়। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা মিলে অভিযুক্ত আলামিনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে এবং মেয়েটিকে স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়।

রূপগঞ্জে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষনের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২৫ জুন সকালে উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের নাগেরবাগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এসময় ধর্ষণের চেষ্টাকারী সোলেমানকে এলাকাবাসী পিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ্য করে।

ভুলতা ফাড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শহিদুল আলম জানান, মঙ্গলবার সকালে সোলেমান তিন বছরের এক শিশুকে চকলেট কিনে দেওয়া কথা বলে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এসময় ওই শিশুর চিৎকারে তার মা সহ এলাকাবাসী এগিয়ে আসলে সোলেমান পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এলাকাবাসী সোলেমান আটক করে পুলিশের সোপর্দ করে।

২২ জুন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক মাদরাসা ছাত্রী (১৩) ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওই কিশোরীকে একটি ঘরে আটকে রেখে রাতভর ধর্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ ধর্ষক রাকিবকে আটক করেছে।

পুলিশ জানায়, ধর্ষিতার পিতা বিদেশে থাকেন এবং মেয়ে খড়িয়া মাদরাসার ছাত্রী। মা মেয়ে আড়াইহাজার নাগেরচরে ভাড়া বাসায় থাকেন। একই বাড়ীতে ভাড়া থাকে ধর্ষক রাকিব (১৯) ও তার পরিবার। রাকিব প্রায় সময় ছাত্রীটিকে মাদরাসায় যাতায়তের পথে উত্যক্ত করতো। ২১ জুন রাতে রাকিব ধর্ষিতাকে ফুসলিয়ে তার ঘরে নিয়ে যায়। তার বাসা সেদিন ফাঁকা ছিল। ওই বাসায় রাতভর তাকে আটকে রেখে কয়েকবার ধর্ষণ করে। ভোর বেলা ধর্ষিতা কৌশলে রাকিবের ঘর থেকে বের হয়ে বাসায় গিয়ে তার মাকে সব খুলে বলে। পরে ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে রাকিবকে আসামী করে শনিবার রাতে মামলা দায়ের করেন।

২১ জুন সোনারগাঁয়ে এক কুয়েত প্রবাসীর স্ত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে দুই বখাটের বিরুদ্ধে। শুক্রবার রাতে উপজেলার সনমান্দী ইউপির ঈমানেরকান্দি এলাকায় ঘটেছে। এ ঘটনায় ধর্ষিতা বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ আনোয়ার নামের এক ধর্ষককে আটক করেছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সনমান্দি ইউনিয়নের ঈমানেরকান্দি গ্রামে এক কুয়েত প্রবাসীর স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করেন। গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে মোবাইলের নেটওয়ার্কে সমস্যা থাকায় তিনি তার প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে মোবাইল নিয়ে ঘর থেকে বের হন। এসময় লম্পট আনোয়ার ও সালাউদ্দিন নামের দুই বখাটে তার মুখে গামছা পেঁচিয়ে তাকে জোরপূর্বক পাশের একটি ক্ষেতে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর গৃহবধূ ঘরে না ফেরায় তার মা তাকে খুঁজতে বাহিরে বের হন। এসময় তিনি গৃহবধূকে ডাকতে ডাকতে ক্ষেতের কাছে গেলে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়।

২১ জুন প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করা হয় চাচাতো দুই বোনকে। পরে একই কক্ষে ২০ দিন ধরে আটকে রেখে দুই বোনকে একাধিকবার ধর্ষণ করে দুই ধর্ষক। ফতুল্লা থানাধীন গিরিধারা এলাকার একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে অপহৃত দুই কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২ জুন বিকাল সাড়ে ৩টায় সিদ্ধিরগঞ্জের আইয়ুবনগর এলাকা থেকে দুই চাচাতো বোনকে অপহরণ করে আল আমিন ও তার বন্ধু রিয়াদ। পরে তাদেরকে ফতুল্লা থানাধীন গিরিধারা এলাকার জনৈক সেলিনা আক্তারের বাসায় নিয়ে যায় দুই বন্ধু। বাসার এক কক্ষেই দুই কিশোরী বোনকে নিয়ে রাত্রি যাপন করতে থাকে। অপহরণের ওই রাত থেকেই একই কক্ষে দুই বন্ধু অসংখ্যবার তাদেরকে ধর্ষণ করে বলে উল্লেখ করা হয় মামলায়। তাদেরকে তাদের স্বজনরা খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ২১ জুন এক অপহৃতার বাবা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি জিডি করে। জিডির সূত্র ধরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এস আই হাফিজুর রহমান ওই রাতেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার গিরিধারা এলাকা হতে তাদেরকে উদ্ধার এবং দুই ধর্ষককে গ্রেফতার করে।

১৭ জুন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের শিকার মাদরাসা ছাত্রীটি সাড়ে ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে।

পুলিশ জানায়, উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের জোকারদিয়া নয়াপাড়া গ্রামের ওই কিশোরী (১৫) লতব্দী মহিলা মাদরাসার ছাত্রী। গত ৪ জানুয়ারী ওই ছাত্রীরকে একই এলাকার মৃত. মোতালেব মিয়ার ছেলে ইয়াসিন (৩৮) তাকে ফুসলিয়ে তার নির্মাণাধীন দালানের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। এরপর বেশ কয়েকবার ধর্ষিতাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একই স্থানে শারীরিক মেলা মেশা করতে বাধ্য করে। ফলে ধর্ষিতা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ১৭ জুন ধর্ষিতা অন্তঃসত্ত্বা জনিত কারণে বমি করতে থাকলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার ধর্ষিতাকে সাড়ে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে রিপোর্ট প্রদান করেন।

পরে ধর্ষিতা তার পিতাকে ঘটনা খুলে বললে ধর্ষিতার পিতা বিষয়টি নিয়ে ধর্ষক ইয়াসিনের সাথে কথা বলে। ধর্ষক তাকে কিছু টাকা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষিতাকে অপারেশনের মাধ্যমে তার গর্ভের সন্তান নষ্ট করে ফেলার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ধর্ষিতার পিতা তাতে রাজী না হয়ে সোমবার রাতে আড়াইহাজার থানায় এসে ধর্ষণের মামলাটি দায়ের করে। ইয়াসিন ধর্ষিতার দূরসম্পর্কের চাচা হন বলে জানা গেছে।

২০ জুন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় মোবাইলে ভিডিও গেমস দেখার প্রলোভন দেখিয়ে ৮ বছরের শিশুকে বলাৎকার করেছে লম্পট হযরত আলী (৪৫)। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা লম্পট হযরত আলীকে আটক করে গনপিটুনী দিয়ে ওই রাতে বন্দর থানা পুলিশে সোপর্দ করেছে।

জানা গেছে, বন্দর থানার সালেহনগরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় একই বাড়ী ভাড়াটিয়া মৃত দুদু মিয়ার লম্পট ছেলে হযরত আলী শিশুটিকে মোবাইলে ভিডিও গেমস দেখার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুকে তার ঘরে নিয়ে যায়। পরে শিশুটিকে জোর করে বলাৎকার করে। শিশুটির চিৎকার শুনে তার মা মনি বেগম ও স্থানীয় এলাকাবাসী দ্রুত ঘটনাস্থলে আসলে ওই সময় লম্পট হযরত আলী দরজা খুলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় স্থানীয় জনতা লম্পটকে আটক করে গনপিটুনী দিয়ে ওই রাতে বন্দর থানা পুলিশে সোপর্দ করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের নারকীয় ঘটনায় এক একটি পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ধর্ষিতার পাশাপাশি তার পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আর সমাজের চোখেও তারা হেয় প্রতিপন্ন হয়। এভাবেই পুরো সমাজ এই ভাইরাসে জর্জরিত হয়ে পড়ছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও