ছেলে ধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে নারায়ণগঞ্জে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৩ পিএম, ২০ জুলাই ২০১৯ শনিবার

ছেলে ধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে নারায়ণগঞ্জে

ছেলে ধরা আতঙ্ক সারা দেশের মত নারায়ণগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে এ জেলাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ছেলে ধরার ঘটনায় একজনকে গণপিটুনিতে মারা গেছে অন্যজন আহত অবস্থায় রয়েছেন। যেকারণে অভিভাবকরা বেশ আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। সন্তানরা বাড়ির বাইরে বের হলেই এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকেন অভিভাবকরা। তাছাড়া সুযোগ পেলেই বাড়ির ভিতরেও প্রবেশ করছে ছেলে ধরারা। এর ফলে ছেলে ধরা আতঙ্ক এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, বিগত কয়েকদিন যাবত শিশুদের গলা কাটা কল্লা নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি চক্র প্রচার করছে ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেখানে অন্তত এক লাখ শিশু-কিশোরের কল্লা (মাথামুন্ড} দিতে হবে। সে মতে ৪২টি দল সারাদেশে শিশু-কিশোরদের কল্লা সংগ্রহে কাজ করছে।’

এমনই গুজব ছড়িয়ে পড়ছে উপজেলার প্রতিটি ঘরে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শিশু-কিশোরদের অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। স্কুলে স্কুলে জারি করা হয়েছে সতর্কবস্থা। বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ছাত্রীদের উপস্থিতির হার আগের চেয়ে কমে গেছে। অনেক অভিভাবক ভয়ে সন্তানদের স্কুলেও পাঠাচ্ছেন না। অথচ রূপগঞ্জের কোথাও কল্লা কাটার ঘটনা ঘটেছে-এমন খবর বা তথ্য পাওয়া যায়নি।

অপরিচিত লোক দেখলেই মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বিপাকে পড়ছে ভিক্ষুক-ফেরিওয়ালা। অপরিচিত কেউ ভিক্ষা চাইতে গেলে গৃহস্থরা ভিক্ষা না দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও না কোথাও শিশু ধরে নিয়ে গলা কাটছে এমন গুজবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মাঝে। এর ফলে কোন শিশু কিশোরদের কোন অপরিচিত লোক যদি ডাকে বা কাছে আছে তবেই ছেলে ধরা হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তাতে করে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ছেলে ধরা হওয়ার বিষয়টি যাচাই বাছাইয়ের আগেই সন্দেহভাজনকে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হচ্ছে। যেকারণে এই আতঙ্কা আরো প্রবল আকার ধারণ করছে।

২০ জুলাই সকালে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় পৃথক ঘটনায় ছেলে ধরা সন্দেহে এক নারী ও যুবকে গণপিটুনি দিয়েছে এলাকাবাসী। এতে নারীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও যুবক মারা যায়।

এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পাগলাবাড়ির সামনে সিরাজ নামের যুবক সাদিয়া (৬) নামে এক স্কুল ছাত্রীকে কোলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সাদিয়া ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার শুরু করে। এতে এলাকাবাসী ছেলে ধরা সন্দেহে অজ্ঞাত যুবককে গণপিটুনি দেয় এবং সাদিয়াকে উদ্ধার করে। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় যুবককে উদ্ধার করে শহরের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে পাঠায়। পরে সেখানকার জরুরী বিভাগের ডাক্তার যুবককে মৃত ঘোষণা করেন।

উদ্ধারকৃত শিশু সাদিয়া একই এলাকার রাজমিস্ত্রি সোহেল মিয়ার মেয়ে। সে মিজমিজি আলামিন নগর এলাকার আইডিয়াল ইসলামিক স্কুলের শিশু শ্রেনির ছাত্রী।

এদিকে বেলা সাড়ে ১১টায় সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী শাপলা চত্ত্বর এলাকায় শারমিন (২০) নামে এক নারী ৫ বছরের এক শিশুকে খেলনা ও খাবার দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শিশুটি চিৎকার শুরু করে। এতে এলাকাবাসী ছেলে ধরা সন্দেহে ওই নারীকে গণপিটুনি দেয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ওই নারীকে আটক দেখিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে। আটক শারিমন ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকার সালমান মিয়ার স্ত্রী।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম জানান, ছেলে ধরা সন্দেহে এলাকাবাসী এক নারীকে গণপিটুনি দিচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীকে আটক করা হয়। ওই নারী মাথা দিয়ে রক্ত পরছিল। তাই চিকিৎসার জন্য শহরের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গত ১০ জুলাই নগরীর দুই নম্বর রেল গেইট এলাকায় নগরীর ব্যস্ততম সড়কে হঠাৎ দেখা যায়, তিন শিশুকে বকাঝকা করে রিকশায় নিয়ে যাচ্ছেন এক যুবক। বাচ্চাদের কান্না দেখে সন্দেহ হয় সাধারণ জনগণের। রিকশা থামিয়ে ভিড় জমায় আশেপাশের লোকজন। এক পর্যায়ে শিশু অপহরণকারী ভেবে যুবককে গণপিটুনি দেয় তারা। পরে উত্তেজিত জনতা ওই যুবক ও শিশুদের পার্শ্ববর্তী পুলিশ বক্সে নিয়ে গেলে জানা যায় আসল ঘটনা।

এই গুজবের কারণেই সোনারগাঁয়ে ছেলে ধরা সন্দেহে মারধরের শিকার হন মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারী। গত ১১ জুলাই দুপুরে সোনারগাঁয়ের শম্ভুপুরা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

সোনারগাঁ থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ জানান, দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে জনৈক রুবেলের বাড়ির সামনে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী (৫৫) এসে দাঁড়ায়। তখন রুবেলের স্ত্রী খালেদা বেগম ওই নারীর বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, রংপুর। পরে খালেদা তাকে পাগল বলে বাড়ির সামনে থেকে চলে যেতে বললে সে চলে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছেলে ধরা আতঙ্ক এতোটাই প্রবল আকার ধারণ করেছে যে সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই ছেলে ধরা হিসেবে গণ্য করে গণপিটুনি দেয়া হচ্ছে। এরুপ ঘটনায় অনেকে আহত হচ্ছে আবার অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। এতে করে যদি প্রকৃত ছেলে ধরাকে মেরে ফেলা হয় সেক্ষেত্রে অজানা তথ্যগুলোও চাপা পড়ে যায়। আর যদি নিরপরাধ ব্যক্তি হয় তাহলে তো কথাই নেই। তাই এক্ষেত্রে যথাযথভাবে যাচাই বাছাইয়ের জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নেয়া একান্ত প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুবাস চন্দ্র সাহা জানান, ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনির এসব ঘটনা ঘটছে। সিদ্ধিরগঞ্জে গণপিটুনিতে এক যুবক নিহত ও এক নারী আহত হওয়ার ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ব্যপারে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একই সাথে তিনি এসব গুজবে কান না দিয়ে এমন কোন ঘটনা ঘটলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে থানা পুলিশকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ জানান।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও