গণপিটুনীতে হত্যা:বাবা মেয়ে পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ টেস্ট করা হবে

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:২৩ পিএম, ২১ জুলাই ২০১৯ রবিবার

গণপিটুনীতে হত্যা:বাবা মেয়ে পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ টেস্ট করা হবে

‘কিছুতেই ভুলে থাকতে পারছিলেন না মেয়েকে। বিভিন্নস্থানে খোঁজও করে ছিলেন। কিন্তু পাননি। অবশেষে পেয়েছিলেন। মেয়ের খোঁজ পাওয়াতেই মেয়ের প্রতি ভালবাসা বেড়ে যায় বাক প্রতিবন্ধী বাবা সিরাজের। বাড়ির পাশের একটি মোবাইল দোকানির কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার করে চুড়ি, লিপিস্টিক ক্রয় করে মেয়ের কাছে নিয়ে যান রাজমিস্ত্রীর জোগালীর কাজ করা দরিদ্র সিরাজ। কিন্তু সেই যাওয়ায় তার শেষ যাওয়া।’

তাঁর স্ত্রীর বর্তমান স্বামীর ভুল তথ্যে তাকে গণপিটুনি খেয়ে নিহত হতে হলো। পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি সিরাজের ভাই ও এলাকাবাসীর। সহজ-সরল এ প্রতিবন্ধীর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ২১ জুলাই রোববার বেলা ১১ টায় এলাকায় মিছিল করেছেন এলাকাবাসী। আগের দিন ২০ জুলাই শনিবার সকাল পৌনে ৯টায় সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পূর্বপাড়া আল-আমিন নগর এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে এলাকাবাসীর গণপিটুনিতে নিহত হন সিরাজ।

প্রায় ১০ বছর পূর্বে শামসুন্নাহারের সাথে বিয়ে হয় বাক প্রতিবন্ধী সিরাজের। ৬ বছরের এক কন্যা সন্তানও রয়েছে তাদের। ৪ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সবার বড় সিরাজ। বাক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও কখনো কারো সাথে বিাবদে জড়াতো না সিরাজ। বাড়ির অন্যদের বোঝা না হয়ে নিজেই রাজমিস্ত্রীর সহযোগী হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। প্রায় বছর খানেক পূর্ব থেকে এলাকার বিদ্যুৎ মিস্ত্রী আ. মান্নান ওরফে সোহেলের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে তার স্ত্রী শামসুন্নাহার। এক পর্যায়ে উভয়ে পালিয়ে যায়। সাথে নিয়ে যায় কন্যা মিনজুকেও।

এরপর সম্ভাব্য সকাল স্থানে স্ত্রী কন্যার সন্ধান করেন সিরাজ ও তার স্বজনেরা। কিন্তু কোন হদিস পাননি। ৫-৬ মাস পূর্বে স্ত্রী শামসুন্নাহার ডিভোর্স লেটার পাঠান সিরাজের কাছে। সেই থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন সিরাজ। স্ত্রীকে না পেলেও নিজে নিজে কন্যাকে সন্ধান করতে থাকেন। এক পর্যায়ে কিছুদিন পূর্বে কন্যার সন্ধান পান সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি আল আমিন নগর এলাকায়।

২০ জুলাই শনিবার কন্যা মিনজুকে দেখতে যান সিরাজ। নিজের কাছে টাকা না থাকায় বাসার পাশের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমানের কাছ থেকে ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে মেয়ের জন্য চুড়ি ও লিপিস্টিক ক্রয় করে মেয়েকে দেখতে যায় সিরাজ। মেয়ের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে তার স্ত্রীর বর্তমান স্বামী আব্দুল মান্নান ওরফে সোহেল তাকে দেখে ফেলে গলাকাটা বললে এলাকাবাসী গণধোলাই দেয় হতভাগা সিরাজকে। সেখান থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

২১ জুলাই রোববার তার লাশ সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলোগেইট এলাকায় নিয়ে আসলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এলাকাবাসী। তাদের অনেককেই আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেছে-এমন করে মানুষকে পিটুনি দিয়ে মারতে পারলো লোকজন। লাশকে ঘিরে থাকা এলাকাবাসী ও তার মেঝো ভাই আলম সিরাজের হত্যাকান্ডকে পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করে। এসময় তারা সিরাজ হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে মিছিলও করে।

সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো এলাকার ঠিকাদার মোহর চানের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন মৃত সিরাজ। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলার লাল মোহন থানার মুগিয়া বাজার এলাকায়। তার পিতার নাম আ. রশিদ মন্ডল। মায়ের নাম কমলা খাতুন।

নিহত বাক প্রতিবন্ধী সিরাজের সঙ্গে স্কুলছাত্রী সাদিয়া ওরফে মিনজুর কোন রক্তের সম্পর্ক ছিল কিনা সেটা নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষা করবে পুলিশ। সিরাজকে পরিকল্পিতভাবে মেয়ের সৎ পিতার চক্রান্তে গণপিটুনীতে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিহত সিরাজের ভাই আলম।

অপরদিকে সামসুন্নাহারকে সিরাজের স্ত্রী দাবি করা হলেও সামসুন্নাহার জানিয়েছেন সিরাজকে তিনি চিনতেন না। তার সঙ্গে সিরাজের বিয়ে হয়নি।

এদিকে নিহত সিরাজের ভাই আলম পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে দাবি করলেও শামসুন্নাহারের দাবি সিরাজ তার স্বামী নয়। তিনি সিরাজকে চিনতেন না। যে কারণে সিরাজ আসলেই সাদিয়া ওরফে সানজু নামের ওই মেয়েটির পিতা কিনা সেটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যে কারণে নিহত সিরাজের সঙ্গে ওই মেয়েটির ডিএনএ টেষ্ট করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলাটির বাদি সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই সাখাওয়াত। তিনি জানান, নিহত সিরাজ ও মেয়েটির ডিএনএ টেষ্টের ফলাফল পেলেই প্রকৃত ঘটনাটি নিশ্চিত হওয়া যাবে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও