বিমান ছিনতাই : পলাশের স্ত্রী চিত্রনায়িকা সিমলাকে জিজ্ঞাসাবাদ

ছবি ও নিউজ বিডি নিউজ হতে নেওয়া : || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:১২ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বিমান ছিনতাই : পলাশের স্ত্রী চিত্রনায়িকা সিমলাকে জিজ্ঞাসাবাদ

বিমান ছিনতাই করতে গিয়ে কমান্ডো অভিযানে নিহত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের পলাশ আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী চিত্রনায়িকা সামসুর নাহার সিমলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

সিমলা বৃহস্পতিবার ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট কার্যালয়ে এলে বেলা দেড়টা পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া। খবর বিডি নিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমের।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেরিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নে সিমলা বলেন, পলাশ কেন বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করতে গেছেন, তা তিনি বলতে পারবেন না।

“আমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর মনে হয়েছিল ওর মানসিক সমস্যা আছে। তাই তিক্ত হয়ে ডিভোর্স দিই।”

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ মাঝআকাশে ছিনতাইয়ের চেষ্টা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা টানটান উত্তেজনার পর চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে কমান্ডো অভিযানে নিহত হন ‘পিস্তলধারী’ এক যুবক।

পরে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জানা যায়, ওই যুবক নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের দুধঘাটা এলাকার পিয়ার জাহান সরদারের ছেলে পলাশ আহমেদ।

তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী সামসুর নাহার সিমলা। ওই ঘটনার মাস তিনেক আগে তাদের বিচ্ছেদে হয়েছিল। ঘটনার দিন অভিযান পরিচালনাকারীরা জানিয়েছিলেন, পিস্তলধারী যুবক (পলাশ) ‘স্ত্রীর বিষয়ে’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। অবশ্য পরে সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় জানা যায়, পলাশের হাতে থাকা সেদিনের পিস্তলটি ছিল দেশে তৈরি প্লাস্টিকের খেলনা।

ওই ঘটনায় পলাশসহ কয়েকজনকে আসামি করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানায় ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলা করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৩ ও ৬ (১) ধারা এবং বিমান-নিরাপত্তা বিরোধী অপরাধ দমন আইনের ১১ (২) ও ১৩ (২) ধারায় দায়ের করা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গত ২৪ মার্চ কাউন্টার টেরোরিজমের একটি দল পলাশের বাবা পিয়ার জাহান, মা রেনু বেগম, চাচা দ্বীন ইসলামসহ আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীসহ ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

সিনেমার শুটিংয়ের জন্য ভারতে অবস্থানরত সিমলাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে সেদিনই জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

বৃহস্পতিবার সেই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্ত কর্মকর্তা রাজেশ বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিমলা গত ২৫ অগাস্ট দেশে ফেরেন। এরপর তার সাথে যোগাযোগ করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে আজ বিভিন্ন বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।”

উল্লেখ্য ফেসবুকে নায়িকা সিমলার সঙ্গে অসংখ্য অন্তরঙ্গ ছবি রয়েছে পলাশের। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তারা বিবাহিত ছিলেন। ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে ফেসবুকে সিমলার সঙ্গে তোলা ছবি দিয়ে পলাশ লেখেন, “এ হচ্ছে আমার বউ যে আমার হাজার ভুলের মাঝে, আমাকে সহ্য করে পার করে দিল একটি বছর। দোয়া করবেন যাতে সারাটা জীবন এ পাগলিটা আমি এক সাথে থেকে যেন মরতে পারি। বউ অনেক ভালোবাসি তোমায় আর কষ্ট দেব না। শুভ বিবাহবার্ষিকী আদরের পুতুল বউ আমার। আই লাভ ইউ লট মোর দেন মাইসেলফ!” এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি বিকেল ৩টা ১৫মিনিটে মাহমুদ পলাশের ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্ট থেকে আপলোড করা হয়। যেখানে নায়িকা শিমলা ও মাহমুদ পলাশের অনেক ঘনিষ্ট ছবি দিয়ে বিরহের গানের ভিডিওটি তৈরী করা হয়েছে। গানটি তিনি নিজের কণ্ঠে গয়েছেন। এবং গানের ক্যাপশন হিসেবে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে ‘জাস্ট সি ইউ সুন’। এছাড়া পলাশের ওই ফেসবুকে জনপ্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান দম্পতি ও ভারতীয় এক খলনায়কসহ বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তোলা ছবি পোষ্ট করা হয়েছিল।

নিহতের সর্বশেষ স্ট্যাটাস ঘৃনা নিশ্বাসে প্রশ্বাসে : নিহত মাহাদী ওরফে মাহমুদ পলাশের সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নাম মাহিবি জাহান। সেখানে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ইনফরমেশন টেকনোলজি বিজনেস এনালিস্ট। শিক্ষাগত যোগ্যতা দেয়া আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। বসবাস করেন যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে। তার ফেসবুকে দেখা গেছে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত ছিল মাহাদী ওরফে মাহমুদ পলাশের। তবে ‘অবাধ্য ছেলে’ উল্লেখ করে বাবা পিয়ার জাহান জানান, পলাশ কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেনি।

তার ফেসবুকে দেখা যায় শিমলাকে নিয়ে একটি হৃদয়স্পর্শী বিরহের গান দিয়ে একটি ভিডিও তৈরী করে আপরোড করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সর্বশেষ পোস্ট করেছেন তিনি। তাঁর ফেসবুক একাউন্ট থেকে দেখা যায় সর্বশেষ যে পোস্টটি তিনি করেছিলেন তা ছিলো কারো প্রতি প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ৩মিনিটে শেষ পোস্টে তিনি লিখেছেন ‘ঘৃনা নি:শ্বাসে প্রশ্বাসে’। তবে এখানে কার প্রতি তার এত ঘৃণা তার নাম উল্লেখ করনেনি তিনি। তবে তাঁর পূর্বের পোস্টগুলো দেখে ধারণা করা যায় যে এই পোষ্টটিও চিত্র নায়িকা শিমলাকে নিয়েই করা। সেদিন বিকেলেই তিনি দুবাইগামী বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। পরে কমান্ডো অভিযানে সে মারা যান।

পিতার অবাধ্য ছিল নিহত পলাশ : পিয়ার জাহান ও রেনু আক্তার দম্পত্তির একমাত্র ছেলে ছিল পলাশ মাহমুদ। পলাশের ৩ বোনের মধ্যে ২ জনের বিয়ে হয়েছে। পিয়ার জাহান ১৯৯০ সাল থেকে বিদেশে থাকতেন। প্রথমে কুয়েত এবং পরে সৌদি আরবে ছিলেন তিনি। প্রবাসী বাবার দেয়া টাকা-পয়সা নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতো পলাশ। নাচ, গান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র শিল্পে জড়িয়ে পড়ে সে। এরই মধ্যে সে কয়েকটি শর্টফিল্মও তৈরি করেছে। এক সময় সোনারগাঁয়ের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায় পলাশ। এরপর টাকার প্রয়োজন ছাড়া বাড়িতে যেত না সে। এদিকে তার বিদেশ ফেরত বাবা পিয়ার জাহান এখন এলাকায় একটি মুদি দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

নিহতের পিতা পিয়ার জাহান বলেন, ছেলে পলাশ মাহমুদ সোনারগাঁ উপজেলার মঙ্গলেরগাঁও তাহেরপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা থেকে ২০১২ সালে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে পাস করে। দাখিল পাস করে সে সোনাগাঁও ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে পড়া অবস্থায় সে ঢাকায় চলে যায়। তারপর থেকে তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। এক পর্যায়ে জানা যায়, পলাশ নাকি ঢাকায় চলচ্চিত্রে কাজ করার চেষ্টা করছে। তখন বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসলেও এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশতো না, কথা বলতো না। পলাশ ২০১৪ সালে বগুড়া সদর উপজেলায় মেঘলা নামের এক মেয়েকে প্রথম বিয়ে করে। তাদের সংসারে আড়াই বছর বয়সি আয়ান নামে একটি পুত্র সন্তান আছে। এছাড়া প্রায় বছর খানেক পূর্বে পলাশ চিত্রনায়িকা সিমলাকে বাড়িতে নিয়ে এসে সে তাকে বিয়ে করেছে বলে জানায়। এসময় সিমলাও বিয়ের কথা স্বীকার করে। পলাশের মা রেনু আক্তার জানান, বিয়ের পর ৩ মাস পর্যন্ত পুত্রবধূ সিমলার সঙ্গে তাদের কথাবার্তা হয়েছে। এসময় তিনি তাকে পলাশকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেন। কিন্তু পরে আর সিমলার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। হয়তো পলাশের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙ্গে গিয়েছিলো।

তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে সিমলা নামে এক মেয়েকে রাতের বেলা বাড়িতে নিয়ে আসে পলাশ। মেয়েটিকে চিত্রনায়িকা ও তার প্রেমিকা বলে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দুই মাস পর আবার সিমলাকে বাড়িতে নিয়ে এসে বিবাহিত স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়। বিয়ের কথা সিমলাও আমাদের কাছে স্বীকার করে। ওই রাতেই তারা আবার ঢাকায় চলে যায়। আমরা সিমলাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তাকে বলেছি আমার ছেলেকে যেন ভালো পথে ফিরিয়ে আনে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটি অবাধ্য ছিল। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে প্রবাস থেকে আমার পাঠানো টাকা সে নানা পথে খরচ করেছে।

হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে পলাশের : নিহতের পিতা আরো জানান, সর্বশেষ ২০-২৫ দিন আগে পলাশ বাড়িতে আসে। বাড়িতে আসার পর তার আচরণে বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করে, মসজিদে গিয়ে আজানও দিয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার বাড়ি থেকে যাওয়া আগে বলেছে, সে কাজের সন্ধানে দুবাই যাবে। চট্টগ্রামে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় পলাশের মৃত্যুর খবর ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারেন বলে জানান তিনি।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও