আলোচিত কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন হত্যায় নাটকীয় মোড়

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩২ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার

আলোচিত কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন হত্যায় নাটকীয় মোড়

নারায়ণগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর কুমার সাহা হত্যা মামলায় ফাঁসির আদেশ হয়েছে পিন্টু দেবনাথের। তার সামনে এখন ফাঁসির দড়ি। এছাড়া পিন্টুর বিরুদ্ধে কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছিল। নিহতের পরিবার ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের প্রত্যাশা ছিল এ মামলাতেই পিন্টুর সর্বোচ্চ সাজা হবে।

তবে মামলার যখন সকল কার্যক্রম শেষের দিকে। যুক্তিতর্কও যখন সম্পন্নের পথে তখনই বাধ সাধলো পিন্টুর একটি সাক্ষ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলাটির দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই এ কাজটি করছে পিন্টু।

জানা গেছে, পূর্ব নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী ১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে যুক্তিতর্কের শেষ পর্যায়ে এসে আসামী পিন্টু দেবনাথ হত্যার দায় অস্বীকার করলে আদালত ফের স্বাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সওয়াল জওয়াবে পিন্টু দেবনাথ বলেন কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনার জন্য সে স্বপনকে টাকা দিয়েছে। আর ওই টাকা দিতে হবে এই জন্য স্বপন ওই জায়গায় চলে গেছে। সেখান থেকে স্বপন নাটক সাজিয়েছে। স্বপন কখনও হত্যা হয় নাই। তাকে মারাও হয়নি। পুলিশের ভয়ে সে এর আগে হত্যার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল। স্বপন হত্যা মামলায় আসামী পিন্টু দেবনাথের দায় অস্বীকার করায় আদালত পুনরায় স্বাক্ষীদের স্বাক্ষ্য ও পিন্টু দেবনাথের বক্তব্য যাচাই বাছাইয়ের জন্য রায় ঘোষণায় একটু সময় নেয়া হচ্ছে। কারণ ইচ্ছা করলেই রায় ঘোষণা করা যায় না। অনেক কিছু যাছাই বাছাই করে রায় ঘোষণা করা হয়। যদিও এর আগে পিন্টু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছিল। কিন্তু স্বাক্ষ্য পর্যায়ে সে আদালতকে বলেছে অনেকের ভয়ে সে এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ফলে বিচারক এ ব্যাপারে বেশ সতর্ক অবস্থানে আছেন। কারণ হুট করে তো কোন রায় দেওয়া যায় না। আর যেহেতু পিন্টু এ ধরনের স্বাক্ষ্য দিয়েছে সেহেতু বিষয়টি আমলে নিয়েছে আদালত। সে কারণেই মামলার সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে আবারো সাক্ষ্য গ্রহণ হবে। বিচারক মামলাটি ফের স্বাক্ষী পর্যায়ে নিয়ে গেছে এবং যাদের স্বাক্ষী বাকী রয়েছে তাদেরও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, বন্ধু প্রবীরের মাধ্যমে পিন্টুর সঙ্গে পরিচয় হয় স্বপন সাহার। বন্ধুত্বের সম্পর্ক গভীর হলে পিন্টুকে ভারতে ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখায় স্বপন। আর এ কারণে স্বপন ও পিন্টু বেশ কয়েকবার ভারত ভ্রমণ করে। কলকাতায় স্বপনের বোন-ভাগ্নি থাকায় সেখানে তার যাতায়াত ছিল। স্বপনের সঙ্গে পিন্টু যতবার কলকাতায় গেছে তার সব খরচ বহন করেছে পিন্টু। ২০১৩-১৪ সালে স্বপনের মাধ্যমে কলকাতার দুর্গানগরে একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রথমে তিন লাখ টাকায় বায়না করা হয়। এর পরবর্তী দেড়-দুই বছরে কিস্তিতে ফ্ল্যাটের ৪০ লাখ টাকা স্বপনের মাধ্যমে পরিশোধ করে পিন্টু। কিন্তু ফ্ল্যাটটি পিন্টুকে বুঝিয়ে না দিয়ে আত্মসাতের চেষ্টা এবং তার সম্পর্কে রত্মাসহ অন্যান্য বন্ধুর কাছে নেতিবাচক কথাবার্তা বলায় স্বপনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল পিন্টু। নিজের টাকায় কেনা ফ্ল্যাট বুঝে না পেয়ে ক্ষোভ থেকেই স্বপনকে খুন করার পরিকল্পনা নেয় পিন্টু।

এখানে উল্লেখ্য গত ২৯ মে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষ হত্যা মামলায় আসামি পিন্টু  দেবনাথের মৃত্যুদন্ড, দোকান কর্মচারী বাপেন ভৌমিকের ৭ বছরের কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার রায় দেন। মূলত ২০১৮ সালের ১৮ জুন প্রবীর হত্যার ক্লু খুঁজতে গিয়েই তখন বেরিয়ে আসে স্বপন হত্যার বিষয়টি।

এর আগে কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহাকে ৭ টুকরো করে হত্যার পরে শীতলক্ষ্যায় লাশ ফেলে দেয়ার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বন্ধুরূপী ঘাতক পিন্টু। গত বছরের ২২ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মহসীনের আদালতে পিন্টুর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।

তিনদিন আগে ১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী পিন্টুর বান্ধবী রত্মা রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। একইদিন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন আবদুল্লাহ আল মোল্লা মামুনও।

আদালতে পিন্টু জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলায় হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্মা রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় মাসদাইরের ওই ফ্ল্যাটে। এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্মা রানী। এতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন। এরপর শীল পাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করে পিন্টু। পরে বাথরুমে নিয়ে বটি দিয়ে লাশ গুমের জন্য ৭ টুকরো করা হয়। পরে রাতে ৫টি বাজারের ব্যাগে করে ওই লাশ তিন দফায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নিয়ে ফেলে দেয় পিন্টু। সহায়তা করে রত্মা। সে ও পিন্টু মিলেই বাড়ির নিচে ব্যাগগুলো নামায়। মাসদাইর থেকে তিন দফায় ঘাটে ব্যাগগুলো আনা হয়। প্রথম দফায় একটি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুটি করে ব্যাগ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের পাশে সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে আনে। মাসদাইর থেকে রিকশায় করে লাশবোঝাই ব্যাগগুলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য উপরে দেওয়া হয় সবজি। প্রত্যেকবার সে বৈঠা চালানো নৌকা রিজার্ভ করে বন্দর ঘাটে যাওয়ার জন্য। পরে মাঝির অগোচরে ব্যাগগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। এর মধ্যে একটি নৌকার মাঝি পিন্টুকে জিজ্ঞাসা করেছিল ব্যাগে কী। উত্তরে পিন্টু বলেছিল পূজার জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। পূজা তো শেষ তাই নিয়ম অনুযায়ী প্রতিমা নদীতে ফেলতে হয়। এগুলো ব্যাগের ভেতরে করে এনেছিলাম।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও