‘ফাটাকেস্ট ও সিংহাম’ উপাধি পাওয়া এসপিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৪ পিএম, ৬ অক্টোবর ২০১৯ রবিবার

‘ফাটাকেস্ট ও সিংহাম’ উপাধি পাওয়া এসপিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত পুলিশ অফিসার হিসেবে এখন পর্যন্ত রেকর্ড গড়েছেন হারুন অর রশিদ। এই প্রথম কোন পুলিশ সুপারকে দেওয়া হয়েছে ‘সিংহাম, ফাটাকেস্ট’ কিংবা এ জাতীয় উপাধি। আর তিনিও পরিচ্ছন্ন নারায়ণগঞ্জ গড়তে একের পর এক অভিযান চালিয়ে আসছেন। কয়েকটি অভিযান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বেশীরভাগ অভিযানকেই সমর্থন করছেন নারায়ণগঞ্জবাসী। কোন অন্যায়কে তিনি পরোয়া করছেন না। এ অবস্থায় ১০ মাসে যে অর্জন করেছেন এ পুলিশ সুপার সেটা পরিকল্পিতভাবে ম্লানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সবশেষ একটি ঘটনায় এমটিই মনে করছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নিউজ নারায়ণগঞ্জকে তারা বলেন, ‘পুলিশ সুপার যেভাবে কাজ করছেন তাতে জেলার মন্ত্রী, এমপি, মেয়র সহ আপমর জনতার সমর্থন রয়েছে। এতে হয়তো অনেকে অন্যায় অপরাধ করতে পারছেন না। তাদের কেউ কেউ ক্ষুব্ধ থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশ কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে না।’

‘‘এক সময়ে পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করাটা ছিল সাধারণ মানুষের চাঁদে যাওয়ার সমান। কিন্তু এখন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যেকদিন সকালে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। তাৎক্ষনিক তাদের সমস্যার সমাধান করছেন। প্রত্যেকদিন শত শত ভুক্তভোগী পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আসছেন। সময় সাপেক্ষে সকলের সঙ্গেই পুলিশ সুপার কথা বলছেন। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। মানুষ যখন বন্ধু ভেবে পুলিশের শরনাপন্ন হচ্ছেন তখন কেউ কেউ এতে ক্ষুব্ধ। কারণ অভিযোগের একটি বড় অংশ দখলবাজী, ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পৃক্ত। সাধারণ মানুষ এসব হয়রানি থেকে পরিত্রাণের জন্যই পুলিশ সুপারের কাছ আসছেন। ফলে একটি পক্ষ পুলিশ সুপারকে বিতর্কিত করার প্রয়াস চালাচ্ছে।’’ বক্তব্যে যোগ করেন ওই কর্মকর্তা।

জানা যায়,  ৫ অক্টোবর দুপুরে চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শারদীয় দূর্গা পূজা উপলক্ষ্যে হিন্দু ধার্মালম্বী সহায় সম্বলহীন মানুষের মাঝে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ করা হয়। যা নারায়ণগঞ্জে এই প্রথম। যদিও পুলিশ প্রশাসনের বস্ত্র বিতরণ করা বড় কোনো ঘটনা নয়। তবে এই বস্ত্র বিতরণের মধ্য দিয়ে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সহায় সম্বলহীন মানুষের সহযোগিতায় বিত্তশালীদের এগিয়ে আসা।

ওই বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বস্ত্র বিতরণ করা নারায়ণগঞ্জ পুলিশ প্রশাসনের একটি চমৎকার উদ্যোগ। এবারই প্রথম পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে দূর্গাপূজা উপলক্ষ্যে হিন্দু ধর্মালম্বীদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে। একই সাথে খ্রিষ্টানদের বড় দিনের উৎসবেও পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ কেক সহ উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছিলেন। যদিও তুলনামূলকভাবে এগুলো বেশি কিছু না। তবে এটার ম্যাসেজ কিন্তু অনেক ভারী।

এর আগে গত ১ জুন এবারই প্রথম নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের উদ্যোগে চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে অসহায় গরীব ও দুঃস্থদের মাঝে ঈদ বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছিল। ঈদ বস্ত্র বিতরণ করতে গিয়ে পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেছিলেন, ব্যবসায়ীরা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ যারা গরিব কষ্ট করে দিনযাপন করে তাদের জন্য কষ্টের লাঘব হবে। আমরা এই কারণে গরীব মানুষের মাঝে ঈদ বস্ত্র বিতরণ করছি। আমরা মনে করি আমাদের পুলিশ সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে আবার পাশাপাপশি যারা গরিব তাদের পক্ষে বাংলাদেশ পুলিশ কাজ করবে। প্রতি বছরই আমরা গরীব মানুষের পাশে দাঁড়াই। শীতের সময় শীতবস্ত্র বিতরণ করি। ঈদ উপলক্ষে যাদের কাপড় নেই তাদের মাঝে কাপড় বিতরণ করছি। হয়তো আমরা সবাইকে দিতে পারবো না। তারপরেও আমরা চেষ্টা করছি গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

এরই মধ্যে জুয়ার আসরে অভিযান চালানো পুলিশ বাহিনীর নারায়ণগঞ্জের চৌকশ কর্তাব্যক্তি সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশেই দেখা গেছে তোফাজ্জল হোসেন তাপুকে। তাকে অনেকটা সম্মান দিয়েই পাশে বসান একটি পূজা কমিটির নেতারা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটা পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সুপারের অর্জনকে ম্লান করার একটি প্রয়াস।

বৃহস্পতিবার রাতে যে এলাকা থেকে তাপুকে গ্রেপ্তার করা হয় ৫ অক্টোবর শনিবার রাতে পঞ্চবটি হরিহর পাড়া এলাকার শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে একটি পূজা মন্ডপ পরিদর্শনের সময়ে পুলিশ সুপারের পাশে তাপুর বসে থাকার এ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট হওয়ার পর বেশ আলোচিত হয়ে উঠে। এসময় পুলিশ সুপারের সাথে আসা পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

তবে পুলিশ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলছেন, এটা পুলিশ প্রশাসনের কোন নিজস্ব অনুষ্ঠান না। জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই সদর উপজেলার বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শন করতে বের হন। এর মধ্যে ফতুল্লার পঞ্চবটিতে কয়েকটি মন্ডপ তিনি পরিদর্শন করেন। কোন একটি মন্ডপে হয়তো আয়োজকেরা কোন ব্যক্তিকে অতিথির আসনে বসাতে পারে। সেটা তো আর পুলিশের দোষ না। পুলিশ তো সবাইকে চিনে না।

একটি সূত্র জানায়, পঞ্চবটির শীষমহলে একটি পূজা মন্ডপে যান পুলিশ সুপার। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাপু। পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ যে চেয়ারে বসা ছিলেন তার বাম পাশের চেয়ারে বসা ছিলেন স্থানীয় এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান। আর তার বামের চেয়ারেই বসা ছিলেন তাপু। তাঁর এ বসার দৃশ্যে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের কয়েকজন জানান, একদিন আগে এ আলোচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন পুলিশ সুপারের আওতাধীন ডিবি একই এলাকার ইউনাইটেড ক্লাবে হানা দিয়ে তাপু সহ ৭জনকে আটক করে। অথচ একদিন পর সেই পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশেই তাপুকে অতিথি করে মূলত পুলিশ সুপারের অর্জনকে ম্লান করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এটা পুলিশ সুপারকে কলঙ্কিত করার হীন চেষ্টা মাত্র। পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ নিশ্চয়ই ব্যক্তিগতভাবে তোফাজ্জল হোসেন তাপুকে চিনেন না কিংবা তিনি জানতেন না যে, এই লোকই জুয়াড়ী হিসেবে গ্রেফতার হয়েছেন। যেখানে সরকার ক্যাসিনো আর জুয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে যেখানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে সেখানে এসপি হারুন জ্ঞাতস্বারে সেখানে উপস্থিত হবেন এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পরেই জুয়ার ব্যাপারে কঠোর হন পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি জুয়ার আস্তানায় পুলিশ ও ডিবি হানা দেয়। সেই সঙ্গে ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধেও হারুন অর রশিদ কঠোর অবস্থানে নেন। কে কোন দল করেন সেদিকে কর্ণপাত না করে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই আখ্যায়িত করে অভিযান চালাতে থাকে।

সবশেষ সদর উপজেলার ফতুল্লায় দ্যা ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন (ইউনাইটেড ক্লাব হিসেবে পরিচিত) এ অভিযান চালিয়ে ৭ জুয়ারী গ্রেফতার হলেও আদালত থেকে মাত্র ২শ টাকা জরিমানায় মুক্তি পেয়েছেন।

শুক্রবার বিকেলে তাদেরকে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আসামিদের কাছ থেকে ৩ বান্ডেল কার্ড, নগদ ২০ হাজার ৫শ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও