গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর, প্রেস ক্লাব সভাপতির কণ্ঠে ‘সৎ এসপি’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩০ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর, প্রেস ক্লাব সভাপতির কণ্ঠে ‘সৎ এসপি’

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদকে বদলীর পেছনে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে দেশের প্রথম সারির দৈনিক প্রথম আলো সহ অন্য দৈনিক এ সংক্রান্ত খবর কয়েকদিন ধরেই ফলাও করে প্রকাশ হচ্ছে। ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিসি টিভি ফুটেজ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে বদলী করা হয়। কয়েকদিন ধরে পুরো জেলা জুড়ে চাঁদাবাজি ও বদলীর ঘটনায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতিকে দেখা গেছে এসপির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

বদলী হওয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদের বিষয়ে তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি হারুনের চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়ীকে উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘এসপি হারুনকে বিভিন্ন অভিযোগের কারণে সরিয়ে আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের শিগগিরই তদন্ত শুরু হবে।’

এদিকে এসপির বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম, ‘‘কর্ম মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। সততার সাথে নিষ্ঠার সাথে একাগ্রতার সাথে যারা কাজ করে তাদেরকে সবাইকে উপরে রাখে। তেমনই একজন মানুষ ছিলেন বিদায়ী এসপি (হারুন অর রশিদ)। নারায়ণগঞ্জবাসীর অনেক দিনের স্বপ্ন সুন্দর নারায়ণগঞ্জ শান্তিময় নারায়ণগঞ্জ গড়ার। সে সুন্দর শান্তিময় নারায়ণগঞ্জের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে ছিলেন তিনি। একটা বিশাল স্বপ্নকে তিনি বাস্তবায়নের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজকে সেই প্রত্যাশার সিংহভাগ পেয়ে মানুষজন অনেকটা স্বস্তিতে আছে। দীর্ঘদিন যাবত মানুষ যে শান্তির প্রত্যাশায় ছিলেন এই দুই প্রশাসন একসাথে কাজ করে তা এনে দিয়েছিল।’’

তিনি আরো বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সমস্ত মানুষের কাছে বিদায়ী এসপি হারুন অর রশিদ সারা জীবন বেঁচে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। বিদায় বেলা অনেক দুঃখ ভারক্রান্ত মন থাকে। আজকে যাকে হারাচ্ছি উনি নিয়ম অনুযায়ী চলে যাচ্ছেন। একদিন পুলিশের বড় কর্মকর্তা হবেন। দেশকে অনেক কিছু দেবেন। তার মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে আরো অনেক দূর যাবেন।’

মাহাবুবুর রহমান মাসুম আরো বলেন, ‘‘দেন দরবারের দিক থেকে আজকের পুলিশ আর বিগত দিনের পুলিশ কিন্তু এক না। দেশ গঠন ও উন্নয়নে পুলিশ কিন্তু একটা মাধ্যম যার মাধ্যমে সবাই এগিয়ে আসবে। সেই পুলিশ আমরা চাই জনগণের বন্ধুর পুলিশ। আজকে পুলিশের প্রত্যাশা, দেশের প্রত্যাশা, জনগণের প্রত্যাশা একাকার হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’’

মাসুম বলেন, আমরা কিন্তু একটা দরিদ্র দেশ ছিলাম এখন দেশ উন্নত হয়েছে আরো এগিয়ে যাবে। অর্থনীতি শুধু এগিয়ে গেলে হবেনা মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেকটি পেশার লোককে এগিয়ে যেতে হবে। আমি বিশ্বাস করি আজকে হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে নারায়ণঞ্জের পুলিশের সেই মান উন্নয়ন হয়েছে। পরবর্তীতে যে আসবে এবং যারা আছেন তারা অন্যায়নের সাথে আপোশ করবেনা, মিথ্যাকে মিথ্যার সাথে আপোশ করবেননা, সত্যতে সত্য বলবেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, গত ২ নভেম্বর ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক শওকত আজিজ রাসেলের গাড়ি থেকে গুলি মদ বিয়ার উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে রাসেলদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আম্বর গ্রুপের মালিকানাধীন নিউজ বাংলাদেশে ওই ঘটনায় একটি ভিডিও আপলোড হয় যেখানে দেখানো হয় ১ নভেম্বর রাতে রাজধানীর বাসা থেকে রাসেলের স্ত্রী ও ছেলেকে নারায়ণগঞ্জ ডিবির একটি টিম তুলে নিয়ে আসে। যদিও পুলিশ দাবী করেছিল নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে রাসেলের গাড়ি থেকে দুইজনকে আটক ও মদ বিয়ার গুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। এই ঘটনায় প্রেক্ষিতে এসপি হারুনকে পুলিশ অধিদপ্তরের টিআর শাখায় বদলি করা হয়।

সর্বশেষ ৬ নভেম্বর দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ-২০১৯ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেসময় এসপি হারুন অর রশিদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে স্যালুট দেন। তবে হাস্যেজ্জল মন্ত্রী এসপি হারুনের দিকে ঘুরে তাঁকাতেই মুখ গম্ভির করে মাথা নাড়িয়ে কিছু একটা বলেন। এর পরপরই এসপি হারুন অনুষ্ঠান স্থাল ত্যাগ করেন।

এর আগে গত ২ নভেম্বর আলোচিত এই এসপি হারুন যোগদান করে প্রশংসার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি একের পর এক অভিযান চালিয়ে আলোচনায় চলে আসেন। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বেশ প্রশংসিত হয়েছেন। তখন চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী, জুয়ারী, মাদক ব্যবসায়ী সহ বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের কাউকে ছাড় দেননি। যেকারণে প্রশংসার ধারবাহিকতায় তাকে সিংহাম ও ফাটাকেস্ট উপাধি দেয়া হয়। তবে এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের সাথে তার বেশ বৈরি সম্পর্ক তৈরি হয়। অন্যদিকে সাংবাদিক, সুশিল সমাজ, রাজনীতিক নেতা সহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন তাকে সমর্থন করে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতো। এসপি হারুন বলতে অনেকে অস্থির থাকতো। আবার অনেকে এসপি সাথে ছবি তুলে, এক মঞ্চে অনুষ্ঠানে যোগদান করে তাকে সমর্থন করে গেছেন। কিন্তু প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতেই অর্থাৎ এসপির বদলীর ঘটনায় অনেকে নিরবে দূরে সরে যান। তবে এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম শেষ বেলাতেও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। যেখানে এসপির চাঁদাবাজি নিয়ে সর্বমহলে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে।

এতে অনেকে বলছেন, কালো আর সাদার মাঝে যে পার্থক্য বুঝেনা তারাই বিতর্কিত ও অসৎ ব্যক্তিকে সমর্থন করে যাবে। যারা প্রকাশ্য অন্যায়ের ভিডিও দেখেও না দেখার ভান করে থাকে তাদেরকে দেখানো যাবেনা, তাদের জাগানো সম্ভব নয়। তারা অন্ধের মত সব সময় একটা বিশ্বাসের উপর অটল থাকে। অন্যায় দেখলেও তারা অতীতের হিসেব কষে মানদণ্ড করে থাকে। তাই সবার উচিত বিবেককে জাগ্রত করা।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও