কোন ভুল করি নাই তদন্তেই প্রমাণিত হবে : এসপি হারুন

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৯ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

কোন ভুল করি নাই তদন্তেই প্রমাণিত হবে : এসপি হারুন

সদ্য বিদায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ বলেছেন, ‘আমি কোন ভুল করি নাই। সব তদন্তে প্রমাণ হবে। আমি নারায়ণগঞ্জের কল্যাণে কাজ করে গিয়েছি। তবে আমি যদি কাজ করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জে গন্যমান্য ব্যক্তি, সাংবাদিক সহ কারো মনে দুঃখ দিয়ে থাকি তাহলে ক্ষমা করবেন। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যুর বিরুদ্ধে আমি যেমন কাজ করেছি আগামীতে যে নতুন পুলিশ সুপার আসবেন তিনিও এটা ধরে রাখবেন।

৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় জেলা পুলিশ লাইনের সম্মেলন কক্ষে জেলা পুলিশের উদ্যোগে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মনিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন, র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল কাজী শামসের উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আব্দুল্লাহ আল মামুন, নূরে আলম প্রমুখ।

উল্লেখ্য, গত ১ নভেম্বর রাতে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেমের ছেলে শওকত আজিজ রাসেলর স্ত্রী ফারা রাসেল ও ছেলে আনাব আজিজকে বাসা থেকে তুলে আনার অভিযোগ ওঠে এসিপ হারুন ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিমের বিরুদ্ধে।

কিন্তু অভিযোগের আগে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে হারুন অর রশীদ বলেন, শওকত আজিজের গাড়ি থেকে ২৮টি গুলি, ১২০০টি ইয়াবা, ২৪ বোতল বিদেশী মদ, ৪৮ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। আর শওকত আজিজ ও তাঁর গাড়ি চালকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের আটক করা হয়েছিল।

এর প্রেক্ষিতে পরদিন শওকত আজিজ গণমাধ্যমকে বলেন, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় হারুন অর রশীদ তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। সে কারণে তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে গুলশানের বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যান। আর বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা ক্লাব থেকে তাঁর গাড়িটি হারুন অর রশীদের লোকজন নিয়ে গিয়ে নাটক সাজান।

এসপি হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে, আমরা মামলার অপরাধীকে ধরতে গিয়ে, আমরা বিভিন্ন ভাবে সমালোচনার শিকার হয়েছি। আমি মনে করি তদন্তে এটা আসলে বের হবে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা।’

তিনি বলেন, আমরা মনে করি প্রতিটি বিষয়ে দেখা আমাদের দরকার। একটা মানুষের নামে যদি কিছু ওয়ারেন্ট থাকে, ওয়ারেন্টের প্রেক্ষিতে যদি আনা হয় তাহলে কিন্তু আইনের ব্যতয় নয়। তারপরে ওয়ারেন্টের আসামি যদি ভিআইপি হয় তাদেরকে আমরা ভিআইপি সেবা দিয়ে আনি। তারা যদি অসুস্থতাবোধ করে তার ক্ষেত্রে মুচলেকা দেওয়ার বিধানও আমাদের কাছে আছে। সেটাও আমরা করি, সেটা আমরা করেছি।

এসপি হারুন আরো বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে বলে থাকে, ঘুরে ফিরে যদি পুলিশ কারো পক্ষে কাজ করে আর তখন বলে, আমার কাজটা লিগ্যাল, সেটা করবেই। আর যার কাজটা করতে পারি নাই সে বলবে, আসলে আমি তো টাকা দিতে পারি নাই। এটাই আমাদের পুলিশের নিয়তি। আবার কারো কাজটা করলাম, সে বলবে আমি টাকা দিয়ে করেছি, টাকা দেইনি বলে করে নাই। আসলে পুলিশের বিরুদ্ধে এটা কমন অভিযোগ। আপনি আমার বিরুদ্ধে বলতেই পারেন। আপনার সঙ্গে যদি আমার তিন বছর কথা নাও হয়, আপনি যদি বলে দেন যে, এসপি সাহেব আমার কাছে ৫টা টাকা চেয়েছে। এতে আমার কিছু করার নেই। এটা তদন্তের দায়িত্ব। তদন্তে বুঝা যাবে আসলে আপনার কাছে টাকাটা চেয়েছে কিনা। পুলিশ সদস্য, আমি ও আমরা চেষ্টা করেছি নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা। এবং সেই পরিস্থিতি ঠিক করতে গিয়ে হয়তো আমরা সবাইকে খুশি করতে পারি নাই। এতে যদি আমি কারো মনে আঘাত দিয়ে থাকি ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’

এসপি হারুন বলেন, আমার প্রতি সহকর্মীদের যেমন সার্পোট ছিল তেমনি আমার সহকর্মীদের যদি কেউ লাঞ্ছিত করে, অস্ত্র ঠেকায়, গালিগালাজ করে এটাও আমি মেনে নিতে পারি নাই। এবং মেনে নিতে পারি নাই বলেই সেদিন ওই ব্যক্তিটি কতবড় শক্তিশালী, কতবড় সম্পদশালী এটা আমি দেখি নাই। আমার কাছে মনে হয়েছে, একটা নরমাল মানুষের যে অপরাধ সেটা সেরকম অপরাধ। সে অপরাধের কারণে মামলা হয়েছে, আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। যে কথাটি বলা হয়েছে দুইজনকে ধরে আনা হয়েছে টাকা দেইনি বলে। মামলা হয়েছে, মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ক্রমে। সেখানে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তার ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে পর তারা ফিরে গেছে। তারা মুচলেকা দিয়ে ফিরে গেছে এবং তার মা তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় এসেছে।

তিনি বলেন, আসলে নারায়ণগঞ্জে আমার যতদিন চাকরি করা কথা ভাগ্যে ছিল ততদিনই আমি করেছি। তারপরও আমার ঊর্ধ্বতনরা তদন্ত করে দেখবেন। আমার প্রতিটি কাজে যৌক্তিকতা আছে কিনা অবশ্যই দেখবেন। আমি মনে করি নারায়ণগঞ্জ পুলিশের প্রতিটা কাজ তদন্তে তার স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। আমরা মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি।

নিজের কর্মকান্ড নিয়ে এসপি হারুন বলেন, ‘‘আমি নারায়ণগঞ্জের কল্যাণের জন্য, শহরটাকে সুন্দর করার প্রত্যয় নিয়ে যে, নারায়ণগঞ্জ ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক শহর। নারায়ণগঞ্জ ঢাকার পাশে একটি সুন্দর শহর। সেখানে সন্ত্রাসীরা আনাগোনা করবে, মাসলম্যানরা আনাগোনা করবে, মাদক ব্যবসায়ীরা আনাগোনা করবে এটা আমরা আপনার যারা অভিভাবকরা রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সুধী মন্ডলী ও সাংবাদিক তারা কেউ চান না। আর চান না বলেই কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে। আমরা পুলিশ হয়তো মনে করেছি আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যা। কোন মানুষ বাড়ি, ঘর, জায়গা হারাবে তার বিচার চাওয়াটা জায়গা থাকবে না মানুষটা অসহায়। আমি দেখেছি এর দায় এক সময় পুলিশের ঘাড়েই বরতায়। পুলিশ এর জন্য দায়ী। কারণ পুলিশ ইচ্ছা করলে ওই জায়গায় গেলে, মানুষের কাছে গেলে কথা শুনলে আসল যে অপরাধী সে কিন্তু ঠিকই সরে যাবে।

নারায়ণগঞ্জবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে এসপি বলেন, এ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজের পক্ষে নারায়ণগঞ্জের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ, এলাকার সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি কেউ কোন তদবির করে নাই। কেউ আমার কাছে তদবির করে নাই। এটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমরা যাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি তাদের ব্যবস্থা নিয়েছি কেউ আমাদের কোন তদবির করেনি। যার কারণে নারায়ণগঞ্জে স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আর আমি মনে করি আগামীতে যে নতুন পুলিশ সুপার আসবেন তিনিও এটা ধরে রাখবেন।

সহকর্মীদের পক্ষে ক্ষমা চেয়ে এসপি হারুন বলেন, আমার সহকর্মীরা প্রতিটি কাজে কর্মে আমাকে সহযোগিতা করেছে। অনেকেই আমার কর্মের কালে যেহেতু আমার রাগ বেশি  আমি অনেকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি, রাগারাগি করেছি। এটা একান্তই কর্মের বিষয়ে। এটা অন্য কোন কারণে না। আমার কারো সঙ্গে জেদ বা দ্বন্ধ নেই। আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখে আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে রাগ হয়ে কথা বলেছি। এতে যদি কেউ মনক্ষুন্ন হয়ে থাকেন তাহলে ধন্যবাদ ও স্বাগত জানাই আপনারা এটা ভুলে যাবেন ও ক্ষমা চাইছি আপনারা এটা মনে রাখবেন না। বিশেষ করে আমার একার পক্ষে তো সম্ভব না কিছু করা।

সাংবাদিকদের ধন্যবাদ ও ক্ষমা চেয়ে এসপি হারুন বলেন, বিশেষ করে প্রত্যকটি পুলিশ সদস্য যেভাবে মনদিয়ে প্রাণ্য দিয়ে, সুধী মণ্ডলী, কমিউনিটি সমাজ, প্রশাসন, র‌্যাব ও সাংবাদিক সহ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের মানুষ আমাকে যেভাবে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেছে সেটা সারাজীবন আমার মনে থাকবে। আমি নারায়ণগঞ্জ ছাড়া অন্য কোথাও সাংবাদিকদের কাছ থেকে এতো সহযোগিতা পাইনি। এজন্য নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানাই। আমার ভুলগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

গত বছরের ২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের এসপি হিসেবে যোগ দেন হারুন অর রশিদ। গত ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন আর রশীদকে পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলি করা হয়েছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও