এসপি হারুনের অভাব বুঝছে নারায়ণগঞ্জবাসী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৫:০৫ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৯ শনিবার

এসপি হারুনের অভাব বুঝছে নারায়ণগঞ্জবাসী

সদ্য বিদায়ী জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদের অভাব প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করছে নারায়ণগঞ্জবাসী। বাজার, রাস্তা ঘাট, উৎসব থেকে শুরু করে সর্বত্রই একই অনুপস্থিতি। ১১ মাসের বাসিন্দা যেন নগরবাসীর মধ্যমনি হয়ে ছিলেন। কারণ তার চলে যাওয়ার পর থেকেই নগরীর চেইন অব কমান্ডই যেন ভেঙে পড়েছে। নেই কোন নিয়ম শৃঙ্খলা, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কি, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, জুয়ারী, মাদক ব্যবসা সহ অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন। এর থেকে পরিত্রাণ চায় নগরবাসী।

২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের এসপি হিসেবে যোগ দেন হারুন অর রশিদ। ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদকে পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলি করা হয়। তবে গত ৭ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মনিরুল ইসলামের কাছে।

এদিকে বদলীর ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের এক শ্রেনির মানুষের মধ্যে আনন্দ উৎসব শুরু হয়েছে। সেইদিন বিকেল থেকে ফাঁকা ফুটপাত আবারও দখল করতে শুরু করে অবৈধ দখলদাররা। হকাররা যার অবস্থানে পুনরায় বহাল হতে শুরু করে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ফুটপাতের পাশে দোকানগুলোরও নিজ নিজ আসবাবপত্র রেখে ফুটপাত দখল করা। ফুটপাত ও রাস্তার পাশে অবাদে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, কাভার্ডভ্যান সহ যানবাহন পার্কিং শুরু হয়। এসব কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আবারও অবৈধ স্ট্যান্ড হিসেবে দখল করে নিয়েছে লেগুনা, সিএনজি, টেম্পুর জন্য। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভারী যানবাহন চলাচল করছে। অবাধে নগরীতে ঢুকছে অবৈধ যানবাহন ব্যাটারি চালিত রিকশা, অটোরিকশা, টেম্পু সহ বিভিন্ন পরিবহন। রাত ৮টার পর সাধারণ মানুষের চলাচলের সুযোগ থাকে না। এতে করে নগরীতে প্রায় প্রতিদিনই ছোট বড় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে মানুষের চলাচলে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি চাষাঢ়া রেল লাইন মসজিদ, ডাক বাংলো মোড়, জিয়া হলের সামনে, রাইফেল ক্লাবের সামনে, চাষাঢ়া শহীদ মিনারের সামনে, বাগে জান্নাত মসিজদের সামনে, ডনচেম্বার, নিউ মেট্রো হল মোড়, কালীরবাজার, বাস টার্মিনাল, ডিআইটি, মন্ডলপাড়া, দেওভোগ, টানবাজার, ২নং রেল গেট, কলেজ রোড সহ শহরের অলিগলিতে চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে চলেছে। প্রতিনিয়ত অস্ত্রের ভয় কিংবা ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মূল্যবান সম্পদ। একই সঙ্গে আবার অনেককে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখমও করা হচ্ছে।

চুরি ছিনতাইয়ে শেষ নয় ওইসব এলাকায় বেড়ছে বখাটেদের আনাগোনা। মহল্লার মোড়গুলোতে দলগত ভাবে আড্ডা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এলাকায় নতুন মানুষ, মেয়ে, নারী সহ বিভিন্ন মানুষকে উত্ত্যক্ত করে, খারাপ মন্তব্য করে। এতে প্রতিবাদ করলে সৃষ্টি হয় ঝগড়া যা কখন ছোট আবার কখনো বড় আকারে রূপ নেয়।

নতুন করে আবারও বিভিন্ন মহল্লার অলিগলিতে মাদক সেবনকারীদের দেখা যাচ্ছে। সঙ্গবদ্ধভাবে বসে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করছে। আর সকলের সামনে বিভিন্ন কৌশলে বিক্রি করা হচ্ছে মাদকও। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গলাচিপা, বোয়ালিয়া খাল নতুন সড়ক, কলেজ রোড, জামতলা, চাঁদমারী বস্তি, টানবাজার কোলোনী, দেওভোগ, নিতাইগঞ্জ, পাইকপাড়া সহ বিভিন্ন এলাকা।

দীর্ঘদিন কিশোরদের গ্রুপ করে আড্ডা দিতে না দেখা গেলেও নতুন করে আবারও বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে শুরু করেছে। এলাকায় এলাকায় মহড়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন ওই সব কিশোররা।

এগুলো ছাড়াও ফুটপাত থেকে চাঁদা, বাস ট্রাক থেকে চাঁদা, বিভিন্ন দোকান থেকে চাঁদা, রিকশা-অটোরিকশা, সিএনজি-টেম্পু, স্ট্যান্ডের নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এসব চাঁদাবাজদের সনাক্ত করার জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও বলেছেন।

জানা গেছে, ঈদ ও পূজাকে কেন্দ্র করে চুরি ছিনতাই বন্ধে এসপি হারুনের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কয়েকদিনের অভিযানে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬৫জন চোর ও ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়। এরপর থেকেই নগরজুড়ে ছিল না কোন চুরি ছিনতাইয়ের আতঙ্ক। নিরাপত্তার স্বার্থে নগরজুড়ে জরুরী আইনী পদক্ষেপের জন্য জেলার প্রতিটি থানা এলাকায় মোবাইল টিম নিয়োগ করা হয়।

এখাই শেষ নয় নগর জুড়ে জুয়ার আড্ডা, অবৈধ ক্লাব, মাদকের আড্ডা সহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে শতাধিক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়। যারা সবাই জামিনে বের হয়ে গেছে। চাঁদাবাজা, ভূমিদস্যূ, অস্ত্রবাজ, দুর্নীতি ও অপকর্মকারী জনপ্রতিনিধি সহ বিভিন্ন পর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। যাদের বিরুদ্ধে নগরবাসী অভিযোগ দিয়েছে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক পদক্ষে গ্রহণ করেছেন। ফলে কিশোর গ্যাং, বখাটে, মাদক সেবনকারী, মাদক ব্যবসায়ী গা ঢাকা দেন। সার্বক্ষনিক নারায়ণগঞ্জের সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে প্রতিনিয়ত বিশেষ অভিযান চালিয়েছেন।

যেকোন উৎসব অনুষ্ঠানকে ঘীরে আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলার কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছেন। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হতো। সকাল বিকেল রাত সার্বক্ষনিক পুলিশের টহল দেওয়া হতো। ফলে গত ১১ মাসে নারায়ণগঞ্জের সব থেকে বড় দুটি ঈদ জামাত, শারদীয় দুর্গাপূজা, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা সহ সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এখানেই শেষ নয় এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে শতাধিক মানুষ প্রতিদিন লাইন ধরেছেন। আর ওইসব সমস্যাও তাৎক্ষনিক সমাধানের পদক্ষেপ নিয়েছেন এসপি হারুন। অনেকেই সমস্যা সমাধান হলে দোয়া করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার জমি দীর্ঘদিন ধরে এক প্রভাবশালী লোকজন দখল করে রেখেছিল। জমি দখল ছেড়ে দিবে এজন্য অনেক টাকাও নিয়েছে। মামলা করেও যখন কোন সমাধান আসছিল না তখন এসপি হারুনের কাছে যাই। তখন তিনিই এক ঘণ্টার মধ্যে অবৈধ দখলদারদের উঠিয়ে দেন। আমার জায়গা বুঝিয়ে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘আমার স্বামীর দীর্ঘদিনের জমানো টাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনে। কিন্তু স্থানীয় সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালীরা সেটা দখল করে নিয়েছিল। এ নিয়ে কোথাও অভিযোগ দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। কিন্তু এসপি হারুনকে দুপুরে জানানোর পর রাতেই ওইসব সন্ত্রাসীদের হাত থেকে ফ্ল্যাট খালি করে আমাদের বুঝিয়ে দেয়। যা এতো দিন ওসি সহ অন্য কেউ করতে পারছিল না। কিন্তু এখন এসপি নেই তাই ভয় হয়। আবার না সন্ত্রাসীরা ফ্ল্যাট দখল নিতে আসে।

সোমবার দুপুরে এক সভায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও এসপি হারুনের না থাকায় নগরীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, এসপি হারুন চলে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ যেন স্বর্গরাজ্য হয়ে গেছে। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, যততত্র স্ট্যান্ড করে চাঁদাবাজী, আন্তঃজেলা বাসও নগরীতে রাখছে চাঁদাবাজী করছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীতে ট্রাক চলাচল করে যানজট সৃষ্টি করছে। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে আহবান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘ফুটপাত নিয়ে এক বছর আগে আমার উপর আক্রমন করা হয়েছে। আমার অনেক লোক আহত হয়েছে। তারপরও ফুটপাতে হকার বসেছে। এ নিয়ে এসপি হারুন সাহেবকে আমরা চিঠি লিখেছিলাম। তিনি নিজ উদ্যোগে এগুলো পরিস্কার রাখার চেষ্টা করেছেন। এখন তিনি চলে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জ যেন আবার স্বর্গরাজ্য হয়ে গেছে। যার যার মতো সে সে পূর্বের জায়গায় ফেরত এসেছে। সকল অবৈধ যানবাহন স্ট্যান্ড পূর্বের জায়গায় ফেরত এসেছে। এটা একটা সহজ প্রক্রিয়া একজন এসপি আসবে চলে যাবে, ডিসি আসবে চলে যাবে ও মেয়র আসবে চলে যাবে কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কাজ তো থেমে থাকার কথা না। তাহলে কিভাবে নারায়ণগঞ্জ শহর আবারও স্বর্গরাজ্য হয়ে গেল। সবাই খুশি হয়ে গেল কারণ আর উচ্ছেদ নাই, ফুটপাত যেভাবে আছে সেভাবে বসবে, যেভাবে ছিল সেভাবে চলবে।’


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও