শৃঙ্খলা ফিরেছে শীতলক্ষ্যায়

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৮ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার

শৃঙ্খলা ফিরেছে শীতলক্ষ্যায়

সংকীর্ণ হয়ে পড়া নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যার নৌরুটে এলোমেলো বার্থিং বন্ধের লক্ষ্যে অভিযান শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। অভিযানের কারণে শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন পয়েন্টে এলোপাথারি জাহাজ বার্থিং (নোঙর) বন্ধ হয়ে শৃঙ্খলা ফিরেছে শীতলক্ষ্যায়। সরেজমিনে শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ইতোমধ্যে ৬টি জাহাজের মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, একসময় বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ পরিচিতি পেয়েছিল শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করেই। বৃটিশ শাসনামলে এই শীতলক্ষ্যার মাতলাঘাটেই (যা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের ভিআইপি টার্মিনাল) ভীড়তো ভারতীয়সহ বিদেশী জাহাজগুলো। মাতলাঘাট থেকে কলকাতা রুটে চলাচল করতো জাহাজ। তবে কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের সেই ঐতিহ্য। প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব ও দূষণে মূমূর্ষ শীতলক্ষ্যার নৌরুটও ক্রমশ সংকীর্ন হয়ে পড়েছিল।

শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা প্রিমিয়ার সিমেন্ট, বসুন্ধরা সিমেন্ট, সিমেক্স সিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট, বাংলাদেশ সিমেন্ট, সুপারক্রীট সিমেন্ট, মীর সিমেন্ট, সাতঘোড়া বা ইস্টার্ন সিমেন্টসহ বেশ কয়েকটি সিমেন্ট কারখানাগুলোর সামনে ক্লিংকার ও ফ্ল্যাইঅ্যাশবাহী অসংখ্য বড় আকারের জাহাজ নোঙর করে রাখে। এছাড়াও সিটি মিল, শবনাম ভেজিটেবল, রূপচাঁদা, আফতাব ফুড, পারটেক্স গ্রুপ, এসি আইসহ বড় শিল্পকারখানাগুলোর সামনে অসংখ্য বৃহদাকারের জাহাজ নৌঙ্গর করে রাখে। নিতাইগঞ্জ পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্রের সামনেও অসংখ্য পণ্যবোঝাই নৌযান বার্থিং করে রাখা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জে পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর সামনেও অনেক জাহাজ বার্থিং করে রাখা হয়। এতে করে ওই এলাকাগুলো দিয়ে দু’টি নৌযান পাশাপাশি যেতে পারেনা। জোয়ার ভাটার কারণে অনেকসময় চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়। ছোট নৌযানগুলোর অনেকগুলোতেই সার্টিফিকেটধারী চালক নেই। একদম অদক্ষ চালক দিয়েই অনেক নৌযান চলছে। প্রশিক্ষণ না থাকায় কোন দিকে হর্ণ দিতে হবেও তাও অনেকে জানেনা। এছাড়া বালুমহালের ইজারাদারের নিয়োজিত সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে অনেক বালুবাহী বাল্কহেডের চালকরা রাতে চালায়। তারা দিনের বেলায় লস্কর, বাবুর্চির হাতে স্টিয়ারিং দিয়ে ঘুমিয়ে নেয়। এতে করে দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

গত ১৫ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ^রী নদীর নৌপথকে নিরাপদ করাসহ ৬ দফা দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন নিরাপদ নৌরুট চাই একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এরপর ২৩ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নিরাপদ নৌপথ চাই শীর্ষক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবন্ত নৌযান আগামী ২ মাসের মধ্যে অপসারণ করতে হবে।

অন্যথায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ডুবন্ত নৌযানগুলো জব্দ করে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া বিভিন্ন কলকারখানা, সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, ডকইয়ার্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে এলোপাথারি জাহাজ বার্থিং (নোঙ্গর) বন্ধে এবং নৌপথের নিরাপত্তায় একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া দ্রুত যেসকল নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সম্পন্ন হয়নি সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন ৭টি রুটে অন্তত ৭০টি লঞ্চ চলাচল করে থাকে। প্রতিদিন চলাচল করে থাকে অসংখ্য পণ্যবাহী নৌযান। ১৩টি খেয়াঘাটে যাত্রীরা পারাপার হচ্ছে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও নৌকায়। নৌরুট সংকীর্ন হয়ে পড়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

এদিকে গত কয়েকদিন ধরে শীতলক্ষ্যার উভয় তীঁরে এলোপাথারি জাহাজ বার্থিং (নোঙর) বন্ধে অভিযানে নামে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। গত ২ ফেব্রুয়ারী শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন তীরে এলোপাথারি বার্থিংয়ের কারণে ৬টি নৌযানের মালিক, মাস্টার ও ড্রাইভার ১৩ জনের বিরুদ্ধে ঢাকাস্থ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের নৌ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক বাবু লাল বৈদ্য।

বিবাদীরা হলেন এমভি উমাইজার মালিক মোহসেন উদ্দিন, মাস্টার মো: সাইফুল ইসলাম, ড্রাইভারী কাজী মো: আক্কাস আলী, এমভি সিতারার মাস্টার আবুল হোসেন ও ড্রাইভার আব্দুর রহমান শেখ, এমভি ওকিনাওয়া-২ এর মালিক মো: আল হাসান, মাস্টার মো: আবুল কালাম আজাদ, ড্রাইভার আবু তাহের খান, এমভি আটলান্টিস এর মালিক এজেড ফিরোজ কবির চৌধুরী, মাস্টার বাহাদুর হাওলাদার, ড্রাইভার মোস্তফা কামাল, এমভি আল জোবায়ের-৪ এর মালিক মো: মজিবুল হক, এমভি শুকরিয়া এর মালিক মো: তৈয়বউল্লাহ।

বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক শেখ মাসুদ কামাল জানান, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামনে এলোপাথারি জাহাজ বার্থিং (নোঙর) বন্ধে আমাদের অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে ৬টি নৌযানের মালিক মাস্টার ও ড্রাইভার ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই মামলা দায়ের এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামনে আমাদের একাধিক টিম গিয়ে সতর্ক করার পরে বন্ধ হয়েছে এলোপাথারি জাহাজ বার্থিং (নোঙর)। বর্তমানে শীতলক্ষ্যার তীরে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও