জুয়া নিষিদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ক্লাবগুলোতে লাল সংকেত

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৭ পিএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বুধবার

জুয়া নিষিদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ক্লাবগুলোতে লাল সংকেত

সারা দেশের টাকা বা অন্য কিছুর বিনিময়ে তাস, ডাইস, হাউজি খেলা সহ সব ধরনের জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে জুয়ার উপকরণ পাওয়া গেলে তা জব্দ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের খেলার অনুমতি দাতা, খেলার আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে করে সারা দেশের মত নারায়ণগঞ্জেও সকাল প্রকার জুয়া খেলা নিষিদ্ধ হয়েছে। এর ফলে প্রভাবশালী জুয়া ব্যবসায়ীরা বেশ বিপাকে পড়বে। কারণ এতে করে কোটি কোটি টাকার জুয়ার প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাবে।

বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. মাহমুদ হাসান তালুকদারের হাইকোর্ট বেঞ্চ ১০ ফেব্রুয়ারী এ রায় দিয়েছেন। ঢাকা ক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ১৩টি অভিজাত ক্লাবে জুয়া খেলা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনে এ রায় দেওয়া হয়েছে।

আদালত বলেছেন, যেসব খেলার ফলাফল দক্ষতার বদলে ‘চান্স’ বা ভাগ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়, সেগুলোই জুয়া খেলা। হাউজি, ডাইস, থ্রি কার্ড, ফ্লাস, ওয়ান টেনসহ এ জাতীয় অন্যান্য খেলা দক্ষতার পরিবর্তে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। আইনে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব খেলার আয়োজন করা অপরাধ। যারা এই ধরনের কর্মকা-ে জড়িত, তারা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী।

আদালত ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছে বলেন, বর্তমান সরকার ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়, এই অভিযানের মূখ্য উদ্দেশ্যে হচ্ছে ক্যাসিনো ও জুয়া খেলাকে নিরুৎসাহিত করা।

যে ১৩টি ক্লাবের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করা হয় সেগুলো হলো- ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাব, গুলশান ক্লাব, বনানী ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব (ঢাকা), লেডিস ক্লাব (ঢাকা), ক্যাডেট কলেজ ক্লাব (গুলশান-১), নারায়ণঞ্জ ক্লাব, চিটাগাং ক্লাব, চিটাগাং সিনিয়র্স ক্লাব, সিলেট ক্লাব ও খুলনা ক্লাব।

আদালতের নির্দেশনার পর নারায়ণগঞ্জের যেসব ক্লাবে জুয়া হয় সেখানে লাল সংকেত দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু অনলাইন নিউজ পোর্টাল নারায়ণগঞ্জ টুডেকে বলেন, আমাদের ক্লাবে হাউজি বা ডাইস জাতীয় কোনো জুয়া খেলা নেই। অনেক আগে হাউজি হত। সেটি বন্ধ হয়েছে। এখন হয়তোবা কেউ কেউ সময় কাটানোর জন্য প্লেকার্ড খেলে থাকতে পারে। সেটি আসলে জুয়া নয়, যে অর্থে বলা হচ্ছে। তারপরও মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ সবার উপরে।

তিনি আরও বলেন, আমি ইতোমধ্যে নোটিশ তৈরি করেছি। সকল মেম্বারদেরকেই সেটি জানিয়ে দেব। আগে পরে যদি কেউ টাইম পাস করার জন্যও কার্ড খেলে থাকেন, যাতে এখন থেকে আর সেটি কেউ না খেলেন। এরপরও যদি আমাদের চোখে তেমন কিছু পড়ে তাহলে ক্লাবের নিয়মতান্ত্রিক ভাবে, গঠনতন্ত্র মোতাবেক ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করবো।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন কৌশলে জুয়া খেলা হয়ে থাকে। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, ইউনাইটেড ক্লাব নামে যেসব ক্লাবগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ সেখানে দেদারছে জুয়ার আসর জমে উঠে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ও ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া করেও জুয়ার আসর বসানো হয়। এছাড়া ক্রিকেট খেলা সহ বিভিন্ন খেলার নামেও জুয়ার আসর বসে বিভিন্ন কৌশলে। তবে হাউজি, ডাইস, থ্রি কার্ড, ফ্লাস, ওয়ান টেনসহ এ জাতীয় জুয়া খেলাগুলো সাধারণত প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আসর বসে। কারণ পুলিশ প্রশাসন থেকে সব কিছু ম্যানেজ করেই এসব খেলার আসর বসাতে হয়। এর নানা নজিরও গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে উঠে এসেছে। তবে একে একে জুয়ার আসরে হানা দিয়ে উপস্থিত জুয়ারী ও পরিচালনাকারীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে গডফাদাররা অধরা রয়ে গেছে। কিন্তু এবার হাইকোর্টের এই নির্দেশনার ফলে জুয়ার খাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা গডফাদাররা বেশ বিপাকে পড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন অভিজাত ক্লাব ও ফ্ল্যাটবাসায় বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয়ে অবাধে চলছে জুয়ার আড্ডা। শহরের নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন ও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকাতেও একাধিক জুয়ার স্পট রয়েছে। এছাঢ়া শহরের চাঁদমারী, ঋষিপাড়াসহ শহরতলীতেও রয়েছে অসংখ্য জুয়ার স্পট। জুয়ার গডফাদাররা আইনের আওতায় না আসায় নতুন আড্ডাখানা গড়ে উঠছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তারা ওই সকল জুয়ার আড্ডা পরিচালনাকারী গডফাদারদের থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে শেল্টার দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, মোঃ হারুন অর রশিদ নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসাবে যোগদানের পর ২০১৯ সালের শুরুতে জুয়ার আসরে অভিযান চালিয়ে একযোগে ৪০ জন জুয়ারিকে গ্রেফতার করলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরে আরো ১২ জনকে আটক করা হয়। তবে জুয়ারীরা আটক হলেও জুয়া পরিচালনাকারী গডফাদাররা রয়ে গিয়েছিল ধরা ছোয়ার বাইরে। যে কারণে তারা আবারো নতুন আড্ডাখানা খুলে বসেছিল। ইতিপূর্বে নারায়ণগঞ্জ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন রেলস্টেশন, চারারগোপ ও ৫নং সারঘাট এলাকায় জুয়ার আসর পরিচালনা করার অভিযোগ ছিল শাহজাহান ওরফে বড় শাহজাহান, ছোট শাহজাহানের বিরুদ্ধে। এছাড়া তাদের সঙ্গে বিশেষ পেশার আরো কয়েকজন জড়িত ছিল। তবে পুলিশ প্রশাসন সাড়াশি অভিযান চালানোর পর ওই এলাকার জুয়ার আসর বন্ধ হলে জুয়ার গডফাদাররা কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিল। শহরের জিমখানা এলাকায় নতুন করে জুয়ার আসর বসায় ওই চক্রটি। নগরীর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল ও নাসিক ভবনের বিপরীতে ওয়ালটন প্লাজার পাশে অবস্থিত অঞ্জন নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধিন দোতলা ঘরেই বসানো হয়েছিল জুয়ার আসর। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গেই চলছিল জুয়ার আসর। পরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরে সদর মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে জুয়ার আসরটির দরজা তালাবদ্ধ করে দেয়। জুয়ার আসরটি থেকে প্রশাসন ও বিশেষ পেশার লোকদের নিয়মিত মাসোহারাও দেয়া হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, গত ৩ অক্টোবর রাতে সদর উপজেলার ফতুল্লার পঞ্চবটি শীষমহল এলাকাতে ‘‘দ্যা ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন (ইউনাইটেড ক্লাব হিসেবে পরিচিত) ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ৭ জুয়ারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আসামিদের কাছ থেকে ৩ বান্ডেল কার্ড, নগদ ২০ হাজার ৫শ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ৮ মার্চ সন্ধ্যায় সুতা ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের টানবাজারস্থ কার্যালয়ে অবস্থিত ইয়ার্ন মার্চেন্ট ক্লাব থেকে ১২ জুয়ারিকে আটক করে সদর মডেল থানা পুলিশ।

৫ মার্চ মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ারীদের হাত থেকে রেহাই পেতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ও নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা ওসির কাছে অভিযোগ করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ঋষিপাড়া এলাকাবাসী।

গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী রাতে ডিবি পুলিশের ব্লক রেইড পরিচালিত হয়। উক্ত অভিযানে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নং ঘাট এলাকা, কালিরবাজার, বঙ্গবন্ধু সড়কের আশে পাশের এলাকায় এবং সাইনবোর্ড এলাকায় বিভিন্ন জুয়ার আসর হতে ৪০জনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারী দুপুরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালতে শুনানী শেষে প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে অর্থদন্ড করে জামিন প্রদান করা হয়। মামলায় জুয়া বোর্ডের প্রধান শাহজাহান সহ অজ্ঞাত ১০-১৫জনকে আসামী করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১০ মার্চ সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের (বিবি রোড) কালিরবাজার এলাকায় অবস্থিত আমান ভবনে একটি জুয়ার স্পটে অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় জুয়াড়িরা পালিয়ে গেলেও তাদের ফেলে যাওয়া তাস জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই স্পটটি নিয়ন্ত্রন করে ডিস ব্যবসায়ী শামীম ওরফে পিজা শামীম। তিনি প্রভাবশালী একজন এমপির বন্ধু পরিচয় দেন নিজেকে। এছাড়া তিনি ওই বন্ধুর পরিচয়ে একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতেও ছিলেন।

গত ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর রাতে কালিরবাজার সিটি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ২১ জুয়ারীকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ওই সিটি ক্লাবের পরিচালনাকারী হলেন ডিস ব্যবসায়ীদের নেতা শামীম ওরফে পিজা শামীম। পরে ২১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজার স্বর্ণপট্টিতে জুয়া খেলাসহ অনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দেন স্বর্ণপট্টি এলাকার ব্যবসায়ীরা। স্মারকলিপিতে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, স্বর্ণপট্টি এলাকায় কতিপয় ব্যাক্তি একাধিক বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে জুয়ার আসর বসিয়েছে। ওইসকল জুয়ার আসরে জেলার বিভিন্ন থানা এলাকার সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ নানা ধরনের অপরাধীরা প্রতিনিয়ত আসা যাওয়া করছে। এছাড়া গভীর রাতে মদ পান করে হৈ চৈ করে এলাকার শান্তি নষ্ট করছে। বাঁধা দিতে গেলে বিশেষ পেশার পরিচয় এমনকি এমপি রাজনৈতিক নেতাদের লোক বলে পরিচয় দিচ্ছে ও ভয়ভীতিসহ হুমকী দিচ্ছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও