শামীম ওসমান খোকা চন্দন শীলের মধুর প্রেমের গল্প

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৪৬ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার

শামীম ওসমান খোকা চন্দন শীলের মধুর প্রেমের গল্প

১৪ ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। নারায়ণগঞ্জের অনেক রাজনীতিক, এমপিদের বিয়ে হয়েছে প্রেম করে। অনেক পেশাজীবীও একই কাতারে। ভালোবাসা দিবস তথা ভ্যালেন্টাইন দিবসে এমপি শামীম ওসমান, এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা ও আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন শীলেরর প্রেম কাহিনী নিয়ে আয়োজন।

প্রেম করতে গিয়ে ভয় পেতেন শামীম ওসমান
সকলের কাছেই পরিচত ‘শামীম ওসমান’ নামটি। তিনি তৃতীয় বারের মতো নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছেন সংসদে। ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারে জন্ম নেয়া শামীম ওসমান ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা। তাবৎ নারায়ণগঞ্জের মানুষই তাঁকে ভয় পেতেন। কিন্তু এই সিংহ পুরুষও যে ভয় পেতেন, ভয়ে দৌড়েও পালাতেন, সেও আবার একজন নারীকে! শামীম ওসমানের সহধর্মীণি লিপি ওসমান। যাঁকে তিনি ভালোবাসতেন সেই কলেজ জীবন থেকেই। প্রেমটা তার সহজ ছিল না। প্রিয় প্রেমিকাকে পেতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। সহজেই ধরা না দেওয়ায় শামীম ওসমানকে ‘তাবিজ কবজ’ করা সহ অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু প্রতাপশালী শামীম ওসমানের সেই প্রেম কাহিনীর কথা জানতো না অনেকেই। সেই প্রেম কাহিনীর আদ্যোপান্তও তিনি বর্ণনা করেছেন একাধিকবার। জানিয়েছেন কিভাবে সালমা আক্তার লিপির সঙ্গে প্রেম করেছেন; দেখা করেছেন।

একাধিক অনুষ্ঠানে শামীম ওসমান বলেন, ‘‘আমি কোন দিন ভয় পাই না। মহিলা কলেজে একদিন ভয় পাইছিলাম; মারাত্মক পাইছি। ভয় পাইয়া, এমন ভয় পাইলাম, ভয় পাইয়া এক দৌড় দিয়ে এ কলেজের প্রিন্সিপালের রুমে চলে গেছি। আমারে গুলি করছে আমি ভয় পাই না; আমার উপরের বোমা মারছে আমি ভয় পাই না। পুলিশ ধরতে আসছে ভয় পাই না। সেনাবাহিনী ধরতে আসলে ভয় পাই না। কিন্তু সেইদিন ভয় পাইছিলাম। কারণ আমি ওনার (স্ত্রী সালমা ওসমান লিপি) পিছে পিছে একটু ঘুরতাম। বেশি চান্স দিত না। যেহেতু চান্স দেয় নাই বহুত ত্যাড়া মহিলা ছিল। এজন্য পিছে একটু বেশিই ঘুরতাম।

‘একটা পর্যায়ে ঘুরতে ঘুরতে ভাবলাম যে চান্স যখন দিলো না এটারেই বিয়া কইরাম। কিন্তু আমার বাসায় বাবা ছিল খুব কঠিন মানুষ। ভাইয়েরা আমাকে খুব শাসন করতো। আমি যখন তোলারাম কলেজের ভিপি। তখনও মাগরিবের নামাজের পর বাসায় ঢুকতে পারতাম না। মাগরিব পড়ার সাথে সাথে আমাকে বাসায় যেতে হবে এবং হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হবে। আমি যত বড় যত কিছুই হই না কেন। আমার এ দুঃখ আমার বন্ধু বান্ধবের ভাল্লেগেনা। এই যে হাই হুতাশ করি আল্লাহরে কি করে একে পাওয়া যায়। এতে আমার বন্ধুদের সহ্য হইলো না। আমার দুই বন্ধু একটা মারোয়ারী আরেকটা বন্ধু আছে এখন কানাডায়। ওরা বললো, আমার দুঃখে দুঃখিত হয়েছে। আমার কষ্টে কষ্টিত হয়েছে।’

৮৫ বা ৮৬ সালের ঘটনা দেখলাম এতগুলি গোল মরিচ নিয়ে এসেছে। এরকম পাঁচ কেজি গোল মরিচ। আমি বললাম, কি বলে এগুলো গোল মরিচ। আমি বলি কি করতে হবে বলে সকাল বেলা সাতটা গোল মরিচ ফজরের নামাজের আগে উঠাইয়া চুলার মধ্যে ছেড়ে দিবি। তারপর কি হবে তারা বললো গোল মরিচ যখন জ্বলবে তখন ওর (সালমা লিপি) মন তখন আমার জন্য জ্বলে উঠবে। সাত দিন লাগবে বেটা তারপর দেখবি তোর জন্য দৌড়াইয়ে চলে আসবে। তাই বন্ধুর কথায় ট্রাই করতে অসুবিধা কি। প্রতিদিন সকাল বেলা উঠাই রান্না ঘরে চুলার মধ্যে গোল মরিচ পোড়াই।

একদিন হঠাৎ করে পোড়ানোর সময় পিছনের চেয়ে দেখি বাবা পিছনের দাঁড়াইয়া আছে। বাবা জিজ্ঞাসা করে রান্না ঘরে কি করো। এর মধ্যে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। বাবা বলছে কি করো টস টস করে আওয়াজ হচ্ছে কেনো। বলছি গোল মরিচ পোড়াচ্ছি। বলে কেন পোড়াচ্ছো।

মিথ্যা করে বলি আব্বা আমারে এক ফকির বলছে ফজরের নামাজের আগে যদি এ গোল মরিচ পোড়ালে নাকি বাসার ভিতরে নাকি কোন খারাপ জিনিস আসতে পারবে না। আমাকে কাউকে জানাইতে মানা করছে। তারপর বলে তাহলে পোড়াও সমস্যা নাই। এরপর আন্দোলন লাগছে। একদিন মহিলা কলেজে ঢুকছি। ঢোকার পর ওই যে আমার বন্ধু বলছে দৌড় দিয়া আমার বাসায় চলে আসবে। আমার দিন শেষ বাসায় চলে আসলে আমার বাপ দিবো আমারে মাইর। তখনও আমার বিয়ের বয়স হয় নাই। কি করি! আমি ভাবছি মিথ্যা কথা হবে না।

রমার প্রেমে চন্দন শীল
‘তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, আমি একা বাসলেই তো চলবে না, তোমার উত্তরটা প্রয়োজন অপেক্ষায় রইলাম’ চিঠিতে লিখে সুতপা শীল রমাকে যৌবনে এভাবে প্রেম নিবেদনের চিঠি দিয়ে ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি চন্দন শীল। তিনি এখন মহানগর আওয়ামী লীগেরও সহ সভাপতি।

সেই চিঠির উত্তর পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ দুই বছর। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি চন্দন শীলকে জন্মদিনের উপহার দিয়ে  প্রেম প্রস্তাবের ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে প্রেমে সফল জুটির প্রেম কাহিনী নিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম এর বিশেষ আয়োজনে চন্দন শীল একান্ত আলাপচারিতা তার প্রেম রোমাঞ্চকতা তুলে ধরেন।

চন্দন শীলের বাবা রাজেন্দ্র নারায়ণ শীল ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার সহকারী পুলিশ সুপার। আর সুতপা শীল রমার বাবা পরেশ গুপ্ত ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। তার থেকেও বড় পরিচিতি পরেশ গুপ্ত ছিলেন  শেরপুর আড়াইআনি স্ট্যাটের জমিদার।  এই দুইজন ছিলেন একে অপরের বন্ধু।

শহরের নতুন পালপাড়া এলাকায় পাশাপাশি থাকতেন উভয় পরিবার। এই সূত্র ধরেই চন্দন রমার পরিচয় পরে  প্রেমের পথ ধরে পালিয়ে বিয়ে। ১৯৭৮ সালে চন্দন শীল এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন সরকারী  তোলারাম কলেজে। আর সুপতা শীল রমা এস এস সি পাশ করে ১৯৮১ সালে ভর্তি হন সরকারী মহিলা কলেজে। তোলারাম কলেজে চন্দন শীল শামীম ওসমানের নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। আর রমার পরিবারের লোকজন আগে থেকেই ছিল বামপন্থি রাজনীতির সমর্থক।

কলেজে যাওয়া আসার সময় অনেক ছেলেরা রমাকে বিরক্ত করতো। পারিবারিক সুসম্পর্ক এবং এলাকার  ছেলে হিসেবে রমা চন্দন শীলের কাছে এ বিষয় গুলো জানাতো। এক পর্যায়ে চন্দন রমার জন্য ভালোবাসার টান অনুভব করলেও মুখে বলার সাহস করতে পারেনি। ওই সময় তাদের দুইজনের মাঝে গান শোন ও গল্প উপন্যাসের বই পড়ার একটা নেশা ছিল। উভয়ের মাঝে অডিও ক্যাসেট ও বই আদান প্রদান হতো। একবার রমার কাছ থেকে একটি গল্পের বই এনে দীর্ঘ দিন ফেরত দেয়নি চন্দন শীল। রমা বইটির জন্য তাগিদ দিলে চন্দন শীল বইটি ফেরত দিতে রাজি হয়। বইটি ফেরত দেওয়ার সময় চন্দন শীল বইয়ের ভিতর রমাকে প্রেম নিবেদনের একটি চিঠি দেয়। যেখানে লেখা থাকে ‘তোমাকে ভালোবেসে  ফেলেছি, আমি একা বাসলেই চলবে না তোমার উত্তরটা প্রয়োজন, অপেক্ষায় রইলাম’।

চিঠিটি যাতে তার দৃষ্টিতে আসে সেজন্য তিনি চিঠি থাকা বইয়ের ওই অধ্যায়টি আবারও ভালোভাবে পড়ার অনুরোধ জানায়। এর পর থেকে রমার আচরণ গম্ভীর হয়ে যায়। আগের মত বারান্দায় আসে না।  দেখা হলে কথা বলে না। এমন আচরণে ভয় পেয়ে যায় চন্দন শীল। সে যদি পরিবারকে বিষয়টি জানায় তাহলে তার বাবা (রাজেন্দ্র নারায়ণ শীল) আর তাকে আস্ত রাখবে না। এই ভয়ে চন্দন শীল বেশ কয়েকদিন বেশি রাতে বাসায় ফেরে। যাতে করে তাকে কারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হয়। এর মধ্যে চন্দন রমার বাসায় টেলিফোন নাম্বারে ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করে। আগে অবাধে ফোন দিয়ে রমাকে ডেকে কথা বললেও ওই ঘটনার পর তার নাম মুখে নিতে সাহস হয় না। রমার মা কিংবা বাবার কণ্ঠ শুনলে কথা না বলেই ফোনটা রেখে দিতো।

একমাস পর অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রনে রমাদের বাসায় যায় চন্দন শীল। সেখানে তার কাছ থেকে চিঠির উত্তর জানতে চায় সে। চিঠির বিষয়টি  না জানার ভাব করে মুচকি হাসে রমা। হাসিতে স্বস্তি ফিরে প্রেমিক চন্দনের। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রয়ারী ছিল চন্দন শীলের জন্মদিন। ওই দিন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ঢাকায় ছিলেন তিনি। পরের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারী রমাকে দেখা যায় কলেজ গেইটের অদূরে এক বান্ধবীর সাথে। তাকে ডেকে হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। সে সাথে সাথে প্যাকেটটি খুলে দেখতে চাইলে রমা পরে খুলে দেখার জন্য বলে। পরে খুলে দেখে জন্মদিনের উপহার। এটা দেয়ার জন্য রমা ১৪  ফেব্রুয়ারী অপেক্ষায় ছিল। এ উপহারের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিক ভাবে চন্দন শীলের  প্রেম নিবেদনের উত্তর দেয় রমা।   এরপর তাদের  প্রেম শুধু বারান্দায় দাড়িয়ে চোখের দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এক সময় তাদের এ  প্রেমের সম্পর্ক কলেজের কমিউনিস্ট পার্টির কিছু লোকজন জানতে পারে। ৮৩ সালের শেষে দিকে চন্দন শীল নারায়ণগঞ্জের বাইরে বেড়াতে যায়। কাকতালীয়ভাবে রমাও তখন নারায়ণগঞ্জের বাইরে বেড়াতে যায়। এ সুযোগে কমিউনিস্ট পার্টির কিছু লোক প্রচার চালায় রমা ও চন্দন শীল মিলে পালিয়ে গেছে। কিছুদিন পর চন্দন শীল নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসে। তখনও রমা নারায়ণগঞ্জে আসেনি। রমা ছিল শেরপুরে তার বোনের বাড়িতে। তখন রমার মা চন্দন শীলকে ডেকে বাড়িতে নিয়ে যায়। চন্দন শীলকে লোকজনের বলাবলি করার কথা জানতে চাইলে তিনি সম্পর্কের কথা স্বীকার করে।  সেই সাথে তিনি জানিয়ে দেন যদি রমার পরিবার থেকে রমাকে সামলে রাখতে পারে তাহলে চন্দন শীলও আর এগুবে না।

চন্দন শীলের পরিবারে বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে শাসন করা হয়। দুই জনের পরিবারই পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ভয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহন করে। এ পরিস্থিতিতে দুইজনের পরিবারের যাতায়াত কমে যায়। কিন্তু রমা ও চন্দন শীল দুইজনেই তাদের প্রেমের সিদ্ধান্তে অটল ছিল। চন্দন শীলের বাবার চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন জেলায় বদলী হলেও ভাইবোনদের লেখাপড়ার স্বার্থে চন্দন শীলসহ পরিবারের অন্যরা নারায়ণগঞ্জের বাসায়ই থাকতেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালে প্রথম চন্দন শীলের উপর রাগ করে তার বাবা তাদের বাসা মিরপুর ১৪ নম্বরের থানা কোয়াটারে নেয়।  তখন প্রেম ও রাজনীতির কারণে চন্দন শীল প্রায়ই পরিবারকে না জানিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আসতো। তার বাবা রাজেন্দ্র নারায়ণ চন্দন শীলকে রাজনীতিতে বাধা না দিলেও অনেকট অস্বস্তিতে থাকতো। একটা সময় দুই পরিবার নিশ্চিত হয় তাদের আলাদা করা সম্ভব নয়। যদিও পারিবারিক ভাবেও তাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয়া সম্ভব ছিল না। একটা সময় চন্দন শীলের বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লে একদিন রমা তার পরিবারকে  না জানিয়ে তার অসুস্থ বাবাকে  দেখতে মিরপুরের বাসায় যায়। তখন চন্দন শীলের মা বাবা উভয়েই রমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষে চন্দন শীলের বাবা রমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে প্রস্তুতি নেয়।

প্রস্তাব পাঠানোর আগে ১৯৮৫ সালের ২৬ জানুয়ারী চন্দন শীল রমার সাথে কথা বলে। তখন রমা জানায় এই মুহূর্তে তাদের পরিবারে প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব নয়। কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন তাদের পরিবারের কোন সদস্য ছাত্রলীগের কর্মীদের সাথে বিয়ে দেয়া যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। রমার জন্য পরিবার ভাল বর খুঁজতে শুরু করেছে ততদিনে। রমা সিদ্ধান্ত নেয় তারা আজই বিয়ে করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ জানুয়ারী তারা নারায়ণগঞ্জ কোর্টে গিয়ে বিয়ে করে। বিয়ে শেষে চন্দন শীল ঢাকা তার এক মাসির বাড়িতে গিয়ে উঠে। তার মাসি ছিল নি:সন্তান এবং চন্দন শীলকে সে নিজের ছেলের মত আদর করতো। পরে বিকেলে চন্দন শীল তার এক বন্ধুর মাধ্যমে মিরপুরে বাসায় খবর পাঠায় এবং তার বড় ভাই রণ শংকরকে বিষয়টি জানাতে বলে।  বড় ভাই শুনে ওই দিন বিকেলেই তাদের নিয়ে ঢাকেশ্বরী কালী মন্দিরে নিয়ে ধর্মীয়ভাবে ধুমধাম করে বিয়ে দেয়। এরপর ৫/৬ দিন তাদের বাড়িতে ফেরা হয়নি। বাড়ির লোকজন জানত না তারা কোথায় আছে।

এদিকে রমার পরিবারের পক্ষ থেকে চন্দন শীলের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়। পরে পরিবারের জেরার মুখে চন্দন শীলের দাদা রণ শংকর চন্দন শীলের বিয়ে ব্যাপারটা জানিয়ে দেয় এবং তাদের বাড়িতে নিয়ে আসলে পরিবারের সবাই তাদের ঘরে তুলে নেয়। কিন্তু রমার পরিবার থেকে রাগ করে থাকে। ৮৫ সালে মার্চ মাসে চন্দন শীল তার বাবাকে চিকিৎসা করাতে কোলকাতা নিয়ে যায়। তখন রমাকে চট্টগ্রামে চন্দন শীলের ছোটদিদির বাড়িতে রেখে যায়।

কোলকাতায় চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যায় রাজেন্দ্র নারায়ণ। মৃত্যুর খবর পেয়ে রমাও কোলকাতায় যায়। বাবার শ্রাদ্ধ সহ সকল আনুষ্ঠানিকতা  শেষে জুলাই মাসে বাংলাদেশে আসে চন্দন শীলের পরিবার। দেশে এসে সংসারের দায়িত্ব পর চন্দন শীলে কাধে। এরমধ্যে আর শ্বশুর বাড়ির কোন খবর রাখেনি সে। তবে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাঠাতো রমা যদি বাড়িতে আসে তাহলে সমস্যা নাই। তখন চন্দন শীল অনেকটা জেদ করেই রমাকে তার বাবার বাড়িতে পাঠাতো। কিন্তু রমা যেতে চাইতো না। বাবার বাড়িতে রমাকে বেশ আদর যত্ন করা হতো। ১৯৯০ সালে চন্দন শীল ও রমা সংসারে জন্ম নেয় তাদের একমাত্র ছেলে অরজিৎ শীল মন্টি। তখন চন্দন শীলের তিন ভায়রা ভাই এসে তাকে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যায়। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে চন্দন শীল জানতে পারে এতো দিন তার শ্বশুর বাড়ির  লোকজন চন্দন শীলের ভয়ে তাকে আনতে যায়নি।

ছাদ থেকে লাফ দেন এমপি খোকা
ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে পেতে ছাঁদ থেকে লাফ দেয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা। জীবন মরণের সন্ধিক্ষনে বন্ধুরাই ছিল সঙ্গী। বিছানায় লাল কম্বলে মোড়ানো হাতে স্যালাইন নিয়ে খোকা ছোট চোখে তাকিয়ে দেখেন সামনে তার প্রিয় মানুষটি। ততক্ষণে তাদের মধ্যে ভালবাসার অনুভূতি সৃষ্টি হয়ে যায়। যা এখনো তাদের মধ্যে অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি প্রতিবেদককে এসব কথা জানান, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকার সহধর্মিনী ডালিয়া লিয়াকত। আর স্ত্রীর কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেন সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকা নিজেও।

দু’জনার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে বেশ। কিন্তু ভালোবাসা বদলায়নি এটুকুও। জনপ্রতিনিধি হয়ে যেমন মানুষের সেবায় ব্যস্ত থাকেন তেমনি একজন জীবনসঙ্গী হিসাবেও পরিবার ও ভালোবাসার মানুষটাকে সময় দিতে ভুল হয় না লিয়াকত হোসেন খোকার। তাদের এ ভালোবাসার ছোট্ট সংসার আলোকিত করে আসে লাবিবা হোসেন আদ্রিতা।

তাদের দীর্ঘ ভালোবাসার জীবনের তেমনি কিছু অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ডালিয়া লিয়াকত জানান, ১৯৮৪ সালে বর্তমান জেলা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের ৩ তলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন এমপি খোকার স্ত্রী ডালিয়া। নিচ তলা ছিল জেলা জাপা কার্যালয়, আশে পাশে থাকতেন লিয়াকত হোসেন খোকা, এমপি শামীম ওসমান, শামসুল সালেহীন, ভিপি আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদল সহ তাদের সহযোগীরা। এসএসসি পরিক্ষার্থী ডালিয়ার চলাচলে চোখ রাখতেন এমপি খোকা। সেই ভাল লাগা থেকে ভালবাসার প্রকাশ করে এমপি খোকা। তাতে রয়েছে ফিল্মী স্টাইলের কাহিনী।

ডালিয়া লিয়াকত বলেন, ‘তখন আমি সরকারি মহিলা কলেজে পড়ালেখা করি। ১৯৮৫ কি ৮৬’র কথা। একদিন ফ্রেন্ডের বাসায় পড়ার নোট নিতে চাষাঢ়া মোড় হয়ে সোনারগাঁও কনফেকশনারী (ক্যাফে) পাশে বন্ধু চঞ্চলকে সঙ্গে (বর্তমান আইনজীবী) নিয়ে চাষাঢ়ার ভিতরে যাচ্ছিলাম। তখন হঠাৎ ওই মোড়ে টি শার্ট পড়ে সুন্দর নায়কের মতো দেখতে খোকা রিকশা থামিয়ে দেয়। কিছুতেই যেতে দিচ্ছিল না। কোন ভাবেই বোঝাতে পারিনি যে এটা আমার পরিবারের সবাই জানলে সমস্যা হতে পারে। তারপর খোকার অনেক অনুরোধের পর ও আমার সঙ্গে থাকা বন্ধু চঞ্চলের কথায় সেখানের ক্যাফেতে গিয়ে প্রথম কথা হয়। তখনই বুঝতে পারি সে আমাকে ভালোবাসে।’

তিনি আরো বলেন, ‘লিয়াকত হোসেন খোকা’র ভালবাসা কথা শুনে রীতিমত আতংকে পড়ে যাই। তখন তাদের অনেক ভয় পেতাম। শামীম ওসমানের সঙ্গে চলাফেরা করে। এরপর একদিন আমি তখন নাদিয়া আপুর বাসায় কবিতা আবৃত্তি শেখার জন্য যেতাম। তখন হঠাৎ একদিন নাদিয়া আপু আমাকে আলম কেবিনের সামনে নিয়ে আসে। সেখানে এসে বলে লিয়াকত হোসেন খোকা ছাঁদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মাহত্যা করার চেষ্টা করেছে। এখন মূমূর্ষ অবস্থায় আছে। আমাকে শেষবারের মতো দেখতে চায়। ওই সময় আর মনটা কেমন জানি হয়ে ওঠে। অনেক কিছু পার হয়ে দেখতে যাই। তখন দরজার বাইরে শামীম ওসমান আমাকে প্রশ্ন করেছিল তুমি নিজেকে কি ভাবো? সাধারণ ভাবেই বলেছিলাম ‘মানুষ’।

তখন শামীম ওসমান আমাকে বলে ওর কিছু হলে আমাকে ছাড়বে না। তারপর রুমের ভিতরে প্রবেশ করে দেখি বিছানায় লাল কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছে। পাশে ডান হাতে স্যালাইন লাগানো। মাথার চুলগুলোও ভেজা। তবে এসব কিছু যে আমাকে পাওয়ার জন্য নাটক ছিল তা জানতে পেরেছি। বিয়ের ঠিক ৯ থেকে ১০ বছর পর। যে স্যালাইন লাগানো ছিল সেটার ভিতরে পানি তাও পাশে একটা প্লাস্টিকের ভল ছিল। আর চুলে তেল ও পানি দিয়ে ওইরকম করেছিল। এসব কিছু যখন জানতে চেয়েছি। তখন শুধু একটা কথাই বলেছে ‘মরে গেলে তোমাকে পাওয়া হতো না’। এভাবেই প্রেম ছিল দীর্ঘদিন। তারপর একসময় পরিবারের কাছে জানানোর পরও খোকা সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়নি। দুইজনের মাঝে একটা দুরত্ব তৈরি হলেও ভালোবাসা কমেনি।  সেই ভালবাসা দূরত্ব বদলে আরো কাছে ভীড়তে থাকে। দীর্ঘ ৪ বছর অপেক্ষা শেষে ১৯৯০ সালে দু’পরিবারের সম্মতিক্রমে দুই জনের বিবাহের কাবিন হয়। তার ঠিক ১ বছর পর ১৯৯১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খোকা বাড়িতে তুলে নেয়।

ডালিয়া লিয়াকত তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ভালোবাসা পবিত্র। আর তাই কেউ ভালোবাসাকে অপবিত্র করবে না। সবাই ভালোবাসার পবিত্রতা বজায় রাখবে।’

এসব কথা সঙ্গে একমত পোষণ করেন সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, ভালো লাগা থেকেই ভালোবাসার শুরু। তেমনি সেই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আগে ভালোবাসার মানুষের জন্য যেকোন সময় যেকোন রাস্তায় ছুটে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতাম। এখন তেমন কিছুই করতে হয় না। এখন ভালোবাসার মানুষ আমার কাছেই। এখনও শত ব্যস্ততার মাঝে ওদের নিয়ে সময় দিতে চেষ্টা করি।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও