করোনা উপসর্গে মিশনপাড়ায় সিদ্দিকুরের মৃত্যু

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:১৭ পিএম, ৭ এপ্রিল ২০২০ মঙ্গলবার

করোনা উপসর্গে মিশনপাড়ায় সিদ্দিকুরের মৃত্যু

করোনা উপসর্গে নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়া এলাকাতে সিদ্দিকুর রহমান নামের এক ব্যক্তি মারা গেছে। ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে তিনি মারা যান।

স্থানীয়রা জানান, মিশনপাড়া এলাকার জলিল মিয়ার ছেলে সিদ্দিকুর রহমান কয়েকদিন ধরেই জ্বর, ঠান্ড, সর্দি, ব্যাথা সহ করোনা উপসর্গ রোগ ভুগছিলেন। তাকে নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু ঘটে।

স্থানীয় ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু জানান, সিদ্দিকুর রহমান কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা গেছেন। করোনা রিপোর্ট হাতে পেলে জানা যাবে পজেটিভ ছিল না নেগেটিভ।

প্রসঙ্গত বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরও ৪১ জন যাদের মধ্যে ১৫ জনই নারায়ণগঞ্জের।

এ নিয়ে দেশে ভাইরাসটিতে আক্রান্তে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে।

আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সোমবার ব্রিফিংয়ে বলেন, “নারায়ণগঞ্জে ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করেছি, সেখানে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ওখান থেকে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে। যদি কোথাও একই জায়গায় কম দূরত্বের মধ্যে একাধিক রোগী থাকে তখনই আমরা সেটাকে ক্লাস্টার হিসেবে আইডেন্টিফাই করে ইনভেস্টিগেশন করে থাকি।”

করোনা উপসর্গে গিটারিস্টের মৃত্যু

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সঙ্গীত জগতের আলোচিত মুখ ‘হিরো লিসান’ ইন্তেকাল করেছেন যাঁর প্রকৃত নাম খাইরুল আলম হিরো (৩০)।

প্রচন্ড জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগে ৭ এপ্রিল ভোরে তিনি মারা যান। পরে শহরের দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে তার মৃতদেহ একটি অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর চেষ্টা করলে আশেপাশের লোকজনের বাধায় সেটা ফেলে রেখেই চলে যান চালক। ওই সময়ে পরিবারের লোকজনও আসেনি ধরতে।

স্থানীয়রা জানান, দেওভোগ কৃষ্ণচূড়া এলাকার বাসিন্দা খাইরুল আলম হিরো মূলত সঙ্গীত জগতে ‘হিরো লিসান’ নামেই পরিচিত। তিনি মূলত বেস গিটারস্টি। সেই সঙ্গে ঝুটের ব্যবসাও করতেন। গত ৭-৮দিন আগে তিনি প্রচন্ড জ্বরে ভুগছিলেন। সেই সঙ্গে শ্বাসকষ্টও ছিল। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে একটি বেসরকারী ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।

সেখানে চিকিৎসা শেষে তাকে তাকে শহরের দেওভোগের বাসায় আনা হয়। ৭ এপ্রিল ভোরে মারা যান। ওই সময়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলার চেষ্টা করলে আশেপাশের লোকজন এসে বাধা হয়। ফলে মৃতদেহ পড়ে থাকে বাড়ির গেটের ভেতরেই।

এদিকে সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র আফরোজা হাসান বিভা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোস্তফা আলী শেখ ও ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। তাদের উপস্থিতিতে লাশ স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পরিবার ও বাড়ির সকলকে আপাতত হোম কোয়ান্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। মৃতের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে।

করোনা উপসর্গে ব্যবসায়ীর মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া মাসুদা প্লাজার মালিক চৌধুরী মুহাম্মদ হাসান করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। ৬ এপ্রিল সোমবার দিনগত রাত ১২টায় রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থার মারা যান।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৬-৭ দিন ধরেই জ্বর, সর্দি সহ আরো কিছু রোগে ভুগছিলেন হাসান। পরে তাকে রোববার রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সোমবার দিনগত রাতে ভর্তি করা হয়। ইতোমধ্যে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে রিপোর্ট দেওয়া হবে। তবে তিনি করোনা উপসর্গে ভুগছিলেন।

হাসানের বেয়াই মিজানুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে করোনা উপসর্গ জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে জানা যাবে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ জানান, তিনি শুনে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। লাশ আনার চেষ্টা চলছে।

৫ জনের মৃত্যু

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের ১৮নং ওয়ার্ডে করোনা আক্রান্ত হয়ে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম ফারুক আহমেদ (৫০)। সে নারায়ণগঞ্জ শহরের শীতলক্ষ্যায় বসবাস করেন। এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৫ জনে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোস্তফা আলী শেখ জানান, দুই সপ্তাহ ধরে ফারুকের জ্বর ছিল। পরে রাজধানীতে কুয়েত মৈত্রি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে তার নমুনা পরীক্ষা করা হলে পজেটিভ রিপোর্ট আসে। ৬ এপ্রিল দুপুরে তিনি মারা যান। খবর পেয়ে সিটি করপোরেশনের ১৮নং ওয়ার্ডের শীতলক্ষ্যা এলাকায় ফারুকের বাড়ি ও আশপাশ লকডাউন করে দেওয়া হয়।

নিহত ফারুক হোসেন উপজেলার পিলকুনী মোল্লা বাড়ীর আলাউদ্দিন মিয়ার ছেলে। নারায়ণগঞ্জ শহরের নয়ন সুপার মার্কেটে তার একটি ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান রয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ঢাকার খিলগাঁয়ে দাফন করা হয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলায় ব্রাদার্স রোড এলাকায় গিয়াসউদ্দিন (৬০) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। ৫ এপ্রিল রোববার বিকেলে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোস্তাফা আলী, স্থানীয় ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার, ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই বাড়িটি অঘোষিত লক ডাউন করে দিয়েছে।

ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, জামতলায় গিয়াসউদ্দিন নামের একজন কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা গেছেন। তার শরীরে করোনা ভাইরাস পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোস্তাফা আলী জানান, গিয়াসউদ্দিন ৪ এপ্রিল অসুস্থবোধ করেন। পরে তাকে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হল। সেখান থেকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ৫ এপ্রিল বিকেলে জানানো হয় মারা গেছে।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ জানান, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি ছিলাম। আপাতত ব্রাদার্স রোডের ৫ তলা ভবনের ৮টি পরিবার সহ পুরো বাড়ির সকলকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হবে।

এর আগে শহরের দেওভোগ আখড়া রথবাড়ি এলাকাতে চিত্তরঞ্জন ঘোষ নামের একজনের মৃত্যু ঘটে। তিনি শহরের সোনারবাংলা মার্কেটে একটি কাপড়েরর দোকানের কর্মচারী।

তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আবু সাইদ মাতবর (৫৫) নামের হোসিয়ারী ব্যবসায়ী মারা গেছেন। গত ৪ এপ্রিল সকাল ৯টায় রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবু সাইদ মাতবর মারা যান। তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুচিন্তানগর এলাকার বাসিন্দা। মৃতের বাড়ি বাংলাবাজার আমবাজার আম্মাজান মঞ্জিলে। তিনি মৃত আলী হোসেন চেয়ারম্যানের ছেলে। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।

আর এই ঘটনায় ‘বড় আমবাগান’ এলাকার দুই শতাধিক পরিবারকে লকডাউন করে দিয়েছে প্রশাসন। গত শনিবার রাত ১টায় উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ‘বড় আমবাগান’ এলাকার লকডাউন ঘোষণা করেন সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক ও সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি জেলা করোনা বিষয়ক ফোকাল পারসন ও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জায়েদুল ইসলাম।

এসময় তিনি উত্তরে হেয়ায়েতুল্লাহ খোকনের বাড়ি থেকে দক্ষিণে বাংলাবাজার ব্যাংকের মোড় পর্যন্ত এবং পূর্বে হাসেমবাগলেন মোড় থেকে পশ্চিমে প্রধান বাড়ির মেইন রোড পর্যন্ত লকডাউন এলাকা চিহ্নিত করে দেন। সেখানে পাহারায় পুলিশ বাসানো হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও নাহিদা বারিক জানান, শনিবার সকাল ৯টায় রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবু সাইদ মাতবর মারা যান। পরে লাশ আইইডিসিআরের তত্ত্বাবধানে খিলগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এর আগে শিউলী ওরফে পুতুল নামে ৪৫ বছর বয়সী এক নারী প্রচন্ড জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। গত ২৯ মার্চ তাকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেল সেখানকার ডাক্তার তাকে ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কিন্তু সেটা না করে বন্দরে তার বাসায় নিয়ে আসে। পরদিন গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেদিনই তাকে বন্দর নিয়ে এসে দাফন করা হয়। নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা শেষে গত ২ এপ্রিল করোনার পজেটিভ রিপোর্ট ধরা পড়ে। এ ঘটনায় জানার পর রাতেই প্রশাসন ও পুলিশ সেখানে উপস্থিত হন। রাতেই বন্দরের রসুলবাগ এলাকার জামাল সোপ কারখানা থেকে রসুলবাগ মোড় পর্যন্ত সড়কটি লক ডাউন করে দেয় হয়। সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

নিহত নারীকে দাফনের আগে গোসল করানো নারীর বাসাও লকডাউন করেছে প্রশাসন। এছাড়া চিকিৎসা সেবা দেওয়ায় ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয় সহ ৭জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার রসুলবাগ জামে মসজিদ ও বাগবাড়ি জামে মসজিদে জুমআর নামাজ হয়নি। পাইকপাড়া এলাকায় ওই নারী বাবার বাড়ির বাবা-মা সহ পরিবারের সকলকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও