স্বজনেরা আসে না, মুখাগ্নি করা ওরা এগারো জনই পরম আত্মীয়

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৭:৫৬ পিএম, ৩ জুন ২০২০ বুধবার

স্বজনেরা আসে না, মুখাগ্নি করা ওরা এগারো জনই পরম আত্মীয়

‘মৃত্যুর পর যখন রাত থেকে সকাল পর্যন্ত লাশ সৎকারে কেউ আসছিল না তখন এগিয়ে আসে ওরা এগার জন। ওই এগারো জনের নাম পরিচয় কিছু জানেন না মৃত্যের স্বজনেরা। আর তারাই এখনও পরম আত্মীয়। ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে মুখাগ্নিও করছেন ওই এগারো জন। করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।’

৩ জুন ভোর রাতে মারা যান শহরের নতুন পালপাড়া এলাকার মনিন্দ্র সাহা (৮৬)। তবে তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। বাধ্যকজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবার পক্ষ থেকে জানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওরা এগারো জন হলেন বর্তমানা করোনা পরিস্থিতিতে আক্রান্ত, উপসর্গ আছে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুর পর মরদেহ সৎকারের একটি দল। যার প্রতিনিধিত্ব করছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক ফুটবলার ও পালপাড়া পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রিপন ভাওয়াল। আর এ দলের অন্যান্য সদস্যরা কেউ চাকরীজীবী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ ছাত্র, কেউ বেকার যুবক। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ সৎকারে কেউ যখন এগিয়ে আসছিল না, আগের দিন রাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত মরদেহ ঘরে বিছানায় ছিল, আত্মীয় স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরাও দরজা লাগিয়ে ঘরে বসে ছিল করোনার ভয়ে। তখনই রিপন ভাওয়াল নিজে ‘ওরা এগারো জন’ নামে সৎকার দলটি গঠন করেন। যার পর থেকে এখনও পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত, উপসর্গ আছে ও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এমন ১৩ জনের মরদেহ সৎকার করেছেন দলটি। যার মধ্যে কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা খরচ বহন করলেও অনেক গুলোর খরচও তারাই বহন করেন।

মনিন্দ্র সাহার ছেলে রতন সাহা বলেন, ‘ভোর ৩টা ৪০ মিনিটে বাধ্যকজনিত কারণে বাবা মারা যায়। তার করোনা কিংবা উপসর্গ কিছুই ছিল না। তিনি বয়স হয়েছে তাই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু আত্মীয় স্বজনদের জানানো হলেও করোনার ভয়ে কেউ আসেনি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ওনারা (ওরা এগারো জন দল) মরদেহ সৎকার করেন। পরে ওনাদের খবর দেই। ওনারা এসে বাবার দেহ বের করে নিয়ে যায়। শশ্মানে দাহ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছু করে তারপর আসেন। এসময় আমি ও আমার বোন জামাতা উপস্থিত ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘করোনায় মারা গেলে ভয় পায় সেটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুতেও কেউ এগিয়ে আসে না সেটা দুঃখজনক। রিপন ভাইয়েরা এসেছেন আত্মীয় হয়ে। তাদের সহযোগিতা না থাকলে কিভাবে সৎকার করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভগবান তাদের সবাইকে সুস্থ রাখুক।’

রিপন ভাওয়াল জানান, পরিবারের সদস্যরা জানালে আমাদের টিম তাদের বাসায় গিয়ে মরদেহ শশ্মানে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরে শশ্মানে সৎকার শেষ করেই সবাই বাসায় ফিরে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ওরা এগারো জন টিম এখনও পর্যন্ত ১৩জনের মরদেহ সৎকার করেছে। যার মধ্যে ৩ থেকে ৪জন করোনায় আক্রান্ত ছিল। আর কয়েকজনের মধ্যে উপসর্গ ছিল। আর কয়েকজন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। আমাদের এ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে। আমাদের জানালেই আমরা মরদেহ সৎকারে সকল ধরনের সহযোগিতা করবো। এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা শুধু সকালের কাছে আশীর্বাদ চাই যাতে সবাই সুস্থ থেকে এ কাজ চালিয়ে যেতে পারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত।

তিনি বলেন, ‘করোনার এ কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থবিধি ও সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। অপ্রয়োজনে কেউ ঘর থেকে বের হবে না। জরুরী প্রয়োজনে বের হলেও সবাই মাস্ক ব্যবহার করবেন, বার বার হাত ধোয়া সহ স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম মানতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে গোপন না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিলে সবাই ভালো হয়ে যাবে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও