করোনায় চাষাঢ়ায় মদের বার ফের চালুর পাঁয়তারা

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:২৪ পিএম, ২৯ জুন ২০২০ সোমবার

করোনায় চাষাঢ়ায় মদের বার ফের চালুর পাঁয়তারা

সাড়ে ৪ মাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বালুর মাঠ এলাকাতে প্যারাডাইজ ভবনে আলোচিত মদের বার ব্লু পিয়ার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সেই নির্দেশনা অমান্য করে ফের মদের বার চালুর চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে ব্লু পিয়ার বার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। করোনার এই মহামারীকালেও ব্লু পিয়ার বার কর্তৃপক্ষ তাদের রেস্টুরেন্ট চালু করার নামে আবারো শুরু করেছে অপকর্ম। মুসলমানদের উপাসনালয় মসজিদ ও নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে আবারো অপকর্ম শুরু হওয়ায় এতে করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে। অবিলম্বে আবারো সেই মদের বার বন্ধ করা না হলে কঠোর আন্দোলন করার পদক্ষেপ নিবেন বলেও জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

জানা গেছে, শহরের ভাষা সৈনিক সড়ক যেটা বালুরমাট হিসেবে পরিচিত সেখানে রয়েছে প্যারাইজ ক্যাবলস গ্রুপের মালিকানাধীন বহুতল ভবন। এ ভবনের ৮, ৯ ও ১০ এ তিনটি ফ্লোর ৪০ লাখ টাকা অ্যাডভান্সে ভাড়া নিয়ে ‘ব্লু পেয়ার’ নামক একটি সুসজ্জিত বারের ডেকোরেশনের কাজ সম্পন্ন করেন এর মালিক গাজী মুক্তার। প্যারাডাইজের পক্ষে ভাড়া দিয়েছেন মোবারক হোসেন।

গত ২৯ জানুয়ারি ব্লু পিয়ার রেস্টুরেন্টের নামে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করে মালিক পক্ষ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মদের বার নিয়ে মিথ্যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে দাবি করে রেস্টুরেন্টটির প্রধান নির্বাহী গাজী মোক্তার হোসেন বলেছিলেন, বারের বিষয়টি মিথ্যা প্রচারণা। এটি একটি রেস্টুরেন্ট। বার করার চিন্তাভাবনা তাদের নেই। সাংবাদিকদের ফাঁকি দেওয়ার কিছু নাই। একটি ভালো মানের রেস্টুরেন্ট করেছি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য। এখানে অনেক বিদেশী ক্রেতা থাকেন। তাদের জন্য বিশ্বমানের খাবার থাকবে এই রেস্টুরেন্টে।

তবে ফেব্রুয়ারীর শুরু হতেই আনুষ্ঠানিকভাবেই মদ বিয়ার বিক্রি শুরু হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ রেস্টুরেন্ট কাম বারের প্রচারণার জন্য নারায়ণগঞ্জের যেসব এলাকাতে বিদেশীরা বসবাস করছেন তাদের কাছে লিফলেট পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এছাড়াও বারের সদস্য ফি ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেও চালানো হচ্ছে প্রচারণা। ওই বারের সদস্য হলে তাকে যেমন ব্লু পিয়ার কর্তৃপক্ষ মদ সেবনের পারমিট করে দিবে তেমনি সদস্য কার্ড থাকলে তার সঙ্গে অর্থ না থাকলেও কার্ড নম্বর অনুযায়ী তিনি নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ মদ সেবন করতে পারবেন। কারণ দেখা যায় অনেক সময় মদ্যপ ব্যক্তি অতিরিক্ত মদ সেবনের কারণে সেন্সলেস (জ্ঞানহীন) হয়ে পড়েন। সেক্ষেত্রে যাতে টাকা নিয়ে কোন সমস্যা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই বিভিন্ন মহলে সদস্য হওয়ার প্রস্তাবনা দিচ্ছে ব্লু পিয়ার কর্তৃপক্ষ। এজন্য তারা বিভিন্ন এলিট শ্রেনীর বসবাসকারী এলাকায় এজেন্টও নিয়োগ দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শহর ও শহরতলীর অভিজাত এলাকাগুলোতে অনেকটা নিরবেই চলছে এ ধরনের প্রচারণা। পাশাপাশি যেসব এলাকাতে বিদেশীরা বসবাস করে বিশেষ করে ভূইগড়ের রূপায়ন টাউন, বিসিক শিল্পনগরী, আদমজী ইপিজেড, শিবুমার্কেট শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকাতেও চলছে নিরবে প্রচারণা।

লাইসেন্স অনুযায়ী এ বারের ওয়্যার হাউজে সর্বোচ্চ ৫ হাজার লিটার মদ, বিয়ার, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় রাখা যাবে। ওয়্যার হাউজের আয়তন ১১৪ বর্গফুট যার মধ্যে দৈর্ঘ্য ১৮ দশমিক ৭ ফুট ও প্রস্থ্য হবে ৬ দশমিক ১ ফুট। অনুমতি পত্রে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।

ওই পত্রে দেখা গেছে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই মদের বারের অনুমোদন প্রদান করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এক বছর মেয়াদী এর লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের (২০২০) ৩০ জুন। ব্লু পিয়ার রেস্টুরেন্টের ৯তম তলায় বারটি চলবে লেখা আছে অনুমতি পত্রে। এতে আরো বলা হয়েছে, ৯ম তলায় ৪ হাজার ৩শ স্কয়ার ফুটের বারে ৮০টি আসন রাখা যাবে। বার প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ২১ বছরের কম কাউকে পানীয় পরিবেশন করা যাবে না।

এদিকে মদের বার নিয়ে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি আলেম ওলামারাও এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ৭ ফেব্রুয়ারী জুমআর নামাজ শেষে ডিআইটি রেল কলোনী জামে মসজিদের সামনে গণ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে আবদুল আউয়াল ৭ দিনের সময় বেধে দিয়েছিলেন।

শহরের চাষাঢ়ায় বালুর মাঠ এলাকাতে প্যারাডাইস ভবনে ‘ব্লু পিয়ার’ নামক রেস্টুরেন্টে মদ বিক্রি শুরু হলে তা যে কোন মূল্যে গুড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আবদুল আউয়াল। ইতোপূর্বেও তিনি নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি অনৈসলামিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আমাদের অনেক আপত্তির মুখেও রেস্টুরেন্ট নাকি চালু হয়েছে। যদি সেখানে মদ বিক্রি হয় তাহলে আমরা কঠিনভাবে লড়বো। প্রাণ জান মৃত্যু হলেও সেটা গুড়িয়ে দিব।

ইসলামী আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেছিলেন, নূর মসজিদের পাশে গড়ে ওঠা মদের বার অপসারণের দাবিতে আমরা এর আগে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দিয়েছি। তারা আমাদের আশ^স্ত করেছিলেন এ বিষয়ে তারা পদক্ষেপ নিবেন। কিন্তু প্রশাসন কোন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা হুশিয়ারী দিয়ে বলতে চাই অবিলম্বে মসজিদের পাশে মদের বার অপসারণ করতে হবে। নয়তো আমরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবো। আমরা কারো রক্তচক্ষুকে ভয় পাইনা। অপশক্তির কালোহাত ভেঙ্গে দিতে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে।

ওই ঘোষণার পরে ১২ ফেব্রুয়ারী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পরিদর্শন করে চাষাঢ়ায় বালুর মাঠ এলাকাতে প্যারাডাইজ ভবনে আলোচিত মদের বারটি বন্ধের নির্দেশ দেন। দুপুরে পরিদর্শনের পর সন্ধ্যায় বার বন্ধের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

পরে ১৩ ফেব্রুয়ারী দুপুরে শহরের চাষাঢ়ায় রাইফেল ক্লাব মিলনায়তনে মদের বার বন্ধের দাবীতে আন্দোলন করা স্থানীয় আলেম ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান। ওই সভায় সেলিম ওসমান বলেন, ‘কোন মদ্য বিক্রির দোকান থাকতে পারবে না। আমি ইসলাম কায়েমের জন্য শান্তির জন্য কাজ করবো যতদিন বেঁচে থাকবো।’

তিনি ওলামাদের পরিপ্রেক্ষতে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেন, আপনারা আন্দোলনে নামার আগে প্রথমে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা উচিত ছিল। তাদের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণে অনেক সুবিধা হতো। পত্রিকায় দেখেছি আপনারা এ সমস্যা সমাধানের জন্য নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৫ আসনের সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। গতকাল আমি আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলকে সাথে নিয়ে পুলিশ সুপারের সাথে আলোচনা করেছি। সেখানে বলেছি যদি আপনারা মদ বিক্রির প্রমান পান তাহলে ব্যবস্থা নিবেন। উনারা ব্যবস্থা নিয়েছেন। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এদিকে ওই ঘটনার পরে দীর্ঘদিন মদের বার বন্ধ থাকলেও গত কিছুদিন ধরে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে ব্লু পিয়ার নামের মদের বারে মদ বিক্রির কারবার চলে আসছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে প্রাণঘাতি করোনার কারণে প্রশাসনের তৎপরতা কিছুটা কমে যাওয়ার সুযোগে ব্লু পিয়ার কর্তৃপক্ষ এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই জানান, ব্লু পিয়ার নামের রেষ্টুরেন্টে আবারো মদের বার চালু হয়েছে বলে আমিও জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে শীঘ্রই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমি কথা বলবো।

হেফাজতে ইসলামের মহানগরের সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান জানান, মসজিদের পাশে মদের বার কখনোই মেনে নেওয়া হবেনা। আমরা এর আগেও মদের বার বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম। যদি মদের বারটি বন্ধ না হয় তাহলে শীঘ্রই আবারো সকল আলেম ওলামাদের সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলনে নামবো।

এ বিষয়ে জানতে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের সহকারী পরিচালকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল ধরেননি।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও