৮ বছরেও রহস্য উদঘাটন হয়নি চঞ্চল হত্যার, কান্না থামছে না পরিবারের

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৮ পিএম, ১৬ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার

৮ বছরেও রহস্য উদঘাটন হয়নি চঞ্চল হত্যার, কান্না থামছে না পরিবারের

নারায়ণগঞ্জের তরুণ নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চল (২০) হত্যাকান্ডের ৮ বছর অতিবাহিত হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। চঞ্চলের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের অবহেলায় চঞ্চল হত্যাকান্ডের রহস্য এত বছরেও উদঘাটন হয়নি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। তা কবে নাগাদ শেষ হবে এখনও কিছু বলতে পারছেন না।

উল্লেখ্য ২০১২ সালের ১৬ জুলাই গভীর রাতে শহরের পশ্চিম দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে নিখোঁজ হয় চঞ্চল। ১৮ জুলাই বন্দর উপজেলার শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে চঞ্চলের লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে পুলিশ। খবর পেয়ে ১৯ জুলাই লাশের ছবি ও কাপড় দেখে লাশটি চঞ্চলের বলে শনাক্ত করেন তাঁর বড় ভাই জোবায়ের ইসলাম। পরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

২০১৫ সালের অক্টোবরে চঞ্চল হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত ৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) জমা দেয় তদন্তকারী কর্মকর্তা। ওই ৫জন হলো চঞ্চলের বন্ধু মেহেদি হাসান রুহিত, মীম প্রধান, রাকিব, রাশেদ, শফি। ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চার্জশীটের বিরুদ্ধে আদালতে না রাজি পিটিশন দায়ের করেন মামলার বাদী খালেদা আক্তার রুবিনা। ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বরে না রাজি গ্রহণ করে আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। এরপর গত ৭ বছরে তদন্ত সংস্থা সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।

দিদারুল ইসলাম চঞ্চল হত্যাকান্ডের সাত বছর উপলক্ষে বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে চঞ্চলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে গিয়ে দেখা যায়, চঞ্চলের রুমে এখনও আগের মতোই ফুলদানির জায়গাটা দখল করে রেখেছে বাঁশি গুলো। বিভিন্ন আকারে ও রঙয়ের ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের ৫টি বাঁশি। পাশে রয়েছে একতার দুইটা, তবলা, ডুমরু, খ্যামটা এসব সকল বাদযন্ত্রগুলো। তবে এ গুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিলো বাঁিশ। বাঁশি থাকলেও বাঁশি গুলো আজ আর বাজে না। চঞ্চলের ছবিটা এখনও ঝুলছে দেয়ালে। ছবিও প্রমাণ করে ক্ষণজন্মা তরুনের বাঁশির প্রতি ভালোবাসাটা। যেমনি ভাবে বাঁশিগুলো আছে তেমনি ভাবে নানা অর্জনের পুরস্কার গুলো পরে রয়েছে দেয়ালের র‌্যাকে। তিন তিনটা পুরষ্কার আর বইগুলোযে এখন স্মৃতি বাহক হয়ে আছে ঘরটিতে।

চঞ্চল নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের বাংলা বিভাগের ¯œাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়সেই চঞ্চল একজন সফল নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ ঐকিক থিয়েটারের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ক্ষণজন্মা এই নাট্যকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘শত মানুষের হাজার স্বপ্ন’, ‘হাড় তরঙ্গ’ এবং ‘বক্তাবলী’ নামে তিনটি নাটক রচনা করে। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ২০১২ সালের ১৩ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর উপলক্ষে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে যে ১০০টি মুক্তিযুদ্ধের নাটক মঞ্চস্থ হয় তার মধ্যে চঞ্চলের রচিত ‘বক্তাবলী’ নাটকটিও মঞ্চস্থ হয়। ওই নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে পুরস্কৃত করা হয় তাকে।

চঞ্চলের ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেল জানান, ২০১২ সালের ১৬ জুলাই গভীর রাতে বাসা থেকে বের হয় চঞ্চল। ওইদিন রাত তিনটায় চঞ্চল, তাঁর বন্ধু মীম প্রধান, রাকিব ও শফিক একত্রে শহরের ২নং রেলগেট এলাকার একটি দোকানে চা-নাশতা খেয়েছিল। চঞ্চলের মোবাইল রাত তিনটা ৯মিনিটে সর্বশেষ কল করেছিল মীম প্রধানের আত্মীয় মেহেদী হাসান। এর পর থেকে চঞ্চল নিখোঁজ হয়।

পমেল আরো জানান, চঞ্চল হত্যা মামলার আসামি মীম প্রধান ও রাকিবকে র‌্যাব-১১ গ্রেফতার করে। কিন্তু সন্দেহভাজন মেহেদী হাসান রুহিত, রাশেদ ও শফিকে আজও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মীম প্রধান ও রাকিবকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঠিকমতো জিজ্ঞাসাবাদ করলেই চঞ্চল হত্যার রহস্য বের হতো। এখন সিআইডি যে পরিদর্শক মামলাটি তদন্ত করছেন, তিনি মামলার ৮ নম্বর তদন্ত কর্মকর্তা। এর আগে যারা মামলাটি তদন্ত করেছেন কেউ হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।

চার্জশীটের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেওয়ার বিষয়ে পমেল বলেন, আমরা মনে করছি এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। এখানে কোন প্রকার তদন্ত ছাড়া, নতুন কোন আসামীকে গ্রেফতার না করে, কারো জবানবন্দি না নিয়ে একটি মনগড়া চার্জশীট দেয়া হয়েছে। আমরা যে অভিযোগ দিয়েছি তাই হুবহু চার্জশীটে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও চার্জশিটে বিভিন্ন বিষয় ত্রুটিপূর্ণ রয়েছে। ওই চার্জশীটে হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়নি। কিভাবে চঞ্চলকে হত্যা করা হয়েছে, কেন করা হয়েছে, কোথায় করা হয়েছে, কারা কারা জড়িত এসব কোন কিছুই ছিল না। এরকম চার্জশীট দিয়ে এমন একটি আলোচিত হত্যাকা-ের সঠিক বিচার পাবো না। তাই চার্জশীটের না রাজি দেই।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও