মামা পুলিশ আইলো দৌঁড় দে’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৫ পিএম, ১৮ জুলাই ২০২০ শনিবার

মামা পুলিশ আইলো দৌঁড় দে’

‘মামা সামনে সবাই দৌঁড়াইতাছে কেন? তুই কাস্টমার দেখ আমি একটু সামনে গিয়া দেইখা আসি। মামা খাঁচি লইয়া দৌড় দে পুলিশ আইতাছে। সামনেরটিরেও কইয়া দে দৌঁড় দিতে।’

১৭ জুলাই শুক্রবার বিকেলে পুলিশ দেখে তাঁর বন্ধুকে মালামাল নিয়ে লুকানোর জন্য এভাবেই চেঁচিয়ে বলছিল হকার শরিফুল ইসলাম। সে এবং তাঁর বন্ধু মইনুদ্দিন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে জুতা বিক্রি করে। শরিফুল দূর থেকে দৌঁড় দেওয়ার কথা বলতেই মুহূর্তেই জুতার খাঁচি নিয়ে দৌঁড়ে বঙ্গবন্ধু সড়কের মাঝে চলে যায় মইনুদ্দিন। তাঁকে দেখে পাশে দাঁড়ানো হকাররাও যে যার মত লুকিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডেই হকার শূন্য হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত। একদিকে হার্ডলাইনে প্রশাসন। তেমনি প্রতিনিয়ত কৌশল পাল্টিয়ে ফুটপাতে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হকাররা। যে কারণে বঙ্গবন্ধু সড়কে আবারো তৈরি হয়েছে হকার পুলিশের লুকোচুরি খেলা।

এ প্রসঙ্গে হকার শরিফুল ইসলাম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আগের মত বেঁচাকেনা করতে পারি না ভাই। আধাঘণ্টাও দাঁড়াইতে পারি না পুলিশ দৌঁড়ানি দেয়। এলাকার এক বড় ভাই এইখানে হকারি করতো। তাঁর পরামর্শে বন্ধুর লগে প্রায় দুই বছর আগে ব্যবসায় নামছিলাম। প্রথমদিকে তো ভালোই চলতো। কিন্তু এখন আর বইতেও পারি না। আজকে ছুটির দিন ভাই। তাও পুলিশ বইতে দেয় নাই। ঈদের আর ১০ থেকে ১২ দিক বাকি। আমাগোও তো ঘর সংসার, পোলামাইয়া আছে। তাই দৌঁড়ানি খাইয়াই বইতে হয়।’

ফুটপাতে ফিরতে কঠোর থেকে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে হকার নেতারা। এর প্রেক্ষিতে গত ১৩ জুলাই বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ১ ঘণ্টা চাষাঢ়া অবরোধ করে রাখ হকাররা। সেই অবরোধ থেকে আরো কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছেন হকার নেতারা। তবে ফুটপাতে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না বলে সেদিনই পুলিশের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর থানা ওসি আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেছিলেন, ‘ হকারদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। তাঁদের কি দাবী আমরা সেটাও বুঝতে পারি না। আমরা জানি না কেন তাঁরা আন্দোলন করছে। আমরা শুনছি রাস্তা অবরোধ করছে তাই এসে রাস্তা পরিস্কার করে দিয়েছি। আমরা কোনো বেআইনি কাজকে সমর্থন দিতে পারি না। ফুটপাথে বসা বেআইননি কাজ। আমরা কোনো বেআইনি দাবী মেনে নিব না। ফুটপাথ হচ্ছে যারা রাস্তা দিয়ে হাটবে তাদের জন্য। আমরা কখনও তাদেরকে বসতে দেয় না।’

প্রশাসনের অবস্থান আবরো স্পষ্ট করে গত ১৬ জুলাই বিকেলে আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওপেন হাউজ ডে’ তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ‘ক’ সার্কেল মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী বলেছেন, ‘আপনারা জানেন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত নিয়ে একটা ইস্যু ছিল। বিভিন্ন সময় ফুটপাত নিয়ে বিভিন্ন ইস্যু উঠে এসেছে। ফুটপাতে কোনো হকার থাকবে না, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা দেখছেন যে সেই ফুটপাত এখন পরিষ্কার আছে। হকাররা ফুটপাতে নাই।’

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালের ১৬ জানুারি এই সড়কেই লঙ্কাকা- ঘটেছিল। সেনদিন ‘হকারমুক্ত ফুটপাত চাই’ স্লোগানে চাষাঢ়ার দিকে পদযাত্রা নিয়ে এগিয়ে আসার সময় সায়াম প্লাজার সামনে চতুর দিক থেকে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর উপর বৃষ্টির মতো বর্ষিত হতে থাকে ইটপাটকেল। মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় চাষাঢ়া ও এর আশপাশের এলাকা। তখন মেয়র আইভীকে বাঁচাতে মানব ঢাল তৈরী করে সমর্থক ও নেতাকর্মীরা।

হকার সহ আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সমর্থকদের মধ্যে তৈরী হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ। পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সেক্রেটারি শরীফউদ্দিন সবুজ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের শহরের সভাপতি জুয়েল হোসেন সহ অন্তত অর্ধশত আহত হয়েছিলেন।

সেই আন্দোলনের পর দির্ঘদিন ফুটপাত দখল মুক্ত করতে প্রশাসনের হার্ডলাইন লক্ষ্য করা যায়নি। তবে ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জের তৎকালিন এসপি হারুণ অর রশিদের নোটিশ বিহীন এক ঘন্টার উচ্ছেদ অভিযানে হকার মুক্ত হয় বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত। এর পর দির্ঘদিন ফুটপাতে আর হকাররা ফিরতে পারেনি। এসপি হারুণের বদলির পর আবারো শিথিল হতে থাকে পুলিশের অবস্থান। যে কারণে আবারো ফুটপাত চলে যায় হকারদের দখলে।

তবে সম্প্রতি আবারো আটঘাট বেঁধে ফুটপাত হকার মুক্ত করার অভিযানে নামে পুলিশ। প্রতিদিন টহল দেয়া শুরু পুলিশের টিম। যে কারণে আবারো ফুটপাত হকার মুক্ত হতে থাকে। তবে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে এখনো কৌশলে ফুটপাতে বসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হকাররা। এখনো সেই অবস্থাতেই চলছে বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতের অবস্থা। দেখার বিষয় আগামীতে কি হয়।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও