সকলের একবাক্য : মাদক ও অন্যায়ে প্রতিবাদী রায়হান

ছবি ও নিউজ প্রথম আলো হতে নেওয়া || ১০:০৭ পিএম, ২৫ জুলাই ২০২০ শনিবার

সকলের একবাক্য : মাদক ও অন্যায়ে প্রতিবাদী রায়হান

মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে আল জাজিরায় কথা বলায় গ্রেপ্তার রায়হান কবির নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নিজ এলাকায়ও সবার কাছে প্রতিবাদী তরুণ হিসেবে পরিচিত। যেকোনো বিপদ-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করেন। এমন নিরপরাধ তরুণ শুধু সত্য বলার কারণে গ্রেপ্তার হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।

২৫ জুলাই শনিবার সকালে বন্দরে শাহি মসজিদ নুরবাগ এলাকায় গেলে রায়হানকে নিয়ে এলাকাবাসীর উচ্চ ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তাঁরা রায়হানের গ্রেপ্তারে ব্যাপক ক্ষুব্ধ। তাঁরা রায়হানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

রায়হানদের প্রতিবেশী শাকিলা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রায়হান খুবই ভালো ছেলে। সে আমাদের এলাকার গর্ব। টেলিভিশনে মালয়েশিয়ায় ওর গ্রেপ্তারের খবর দেখার পর থেকে খুব খারাপ লাগছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভালো-মন্দ সবকিছুতে রায়হান এগিয়ে আসত। কেউ পড়াশোনা করতে পারছে না, তাকে নিজের বই দিয়ে, অর্থ দিয়ে সাহায্য করত। এলাকায় মাদক ও অন্যায় কোনো কিছু হলেই প্রতিবাদ করত।’

আরেক প্রতিবেশী আমেনা বেগম বলেন, ‘আমি মৃত অবস্থায় ছিলাম, আমাকে রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে রায়হান। শুধু আমি একা নই, আমার মতো অনেকের পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ত সে। তাহলে ওর কেন এত বিপদ হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন, ওর মুক্তির ব্যবস্থা করেন। আমাদের ছেলেকে আমাদের বুকে ফিরিয়ে দিন।’

রায়হানের বাবা শাহ্ আলম নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটি বিসিক শিল্প নগরীতে একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার স্যাম্পলম্যান। সংসারে রায়হান ছাড়াও আরেকটি মেয়ে রয়েছে। রায়হান ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে মালয়েশিয়ায় পড়তে যান। তাঁর বোন নারায়ণগঞ্জ কলেজে স্নাতক পড়ছেন।

রায়হানের বোন মেহেরুন নেসা বলেন, তাঁর ভাই সব সময় তাঁকে বলতেন মানুষের পাশে থাকতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। ভাইয়ের কথা শুনে তিনিও এভাবে চলতে চেষ্টা করছেন।

শাহ্ আলম জানান, মালয়েশিয়ায় স্নাতক পাস করে ঈদুল ফিতরের আগে একটি কোম্পানিতে চাকরি হয় তাঁর ছেলের। কিন্তু চাকরির টাকা সেখানেই কষ্টে থাকা মানুষের জন্য খরচ করতেন রায়হান।

ছেলের সম্পর্কে বলতে গিয়ে শাহ্ আলম বলেন, এলাকায় আগে তাঁর একটি মুদিদোকান ছিল। ওই দোকানে তিনি সিগারেট বিক্রি করতেন। একদিন তাঁর ছেলে রায়হান এসে বললেন, সিগারেট বিক্রি করলে এলাকার ছেলেরা খারাপ হয়ে যাবে। ছেলের প্রতিবাদের পর থেকে তিনি সিগারেট বিক্রি করা বন্ধ করে দেন। সর্বশেষ দুদিন আগে ছেলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ হয়েছিল।

শাহ্ আলম বলেন, রায়হান ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদকারী। এলাকার লোকজনের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁর ছেলে তো কোনো অন্যায় করেনি। প্রবাসী ও দেশের মানুষের স্বার্থে লকডাউন পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছে। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সরকারের কাছে আবেদন, তারা তাঁর ছেলের পাশে দাঁড়াক। তাকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করুক।

রায়হানের মা রাশিদা বেগম বলেন, লকডাউনে বন্ধুকে দেখতে গিয়ে তাঁর খারাপ অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারেনি রায়হান। তাই সে আল জাজিরা টেলিভিশনে কথা বলেছে। রায়হান সব সময় মানুষের ভালো চেয়েছে। কখনো খারাপ চায়নি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে লকডাউনে বন্দী থেকেও মানুষের জন্য খাবার পাঠিয়েছে। সবার কাছে আমার ছেলের সুনাম শুনতে পাবেন।’

নূরবাগ এলাকার পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি জাবেদ হোসেন বলেন, রায়হান খুব ভালো ছেলে। কোনো নেশা, আড্ডায় নেই। ও ছোটবেলা থেকেই এলাকার সবার জন্য কাঁদে। সবার বিপদে-আপদে পাশে থেকেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত এমন একটি নিরপরাধ ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ছাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া।

রায়হানের বিষয়ে যোগাযোগ করলে জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি (রায়হানের গ্রেপ্তার) আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’

৩ জুলাই আল জাজিরার ইংরেজি অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ‘লকআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি লকডাউন চলাকালে দেশটির সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ উঠে আসে। প্রতিবেদনে তরুণ রায়হান কবির বাংলাদেশিদের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন দেখে রায়হানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে মালয়েশিয়ান পুলিশ।

আল জাজিরায় প্রচারিত ‘১০১ ইস্ট’ অনুষ্ঠানে ২৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ওই প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এতে করোনাভাইরাস মহামারিতে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে সরকারের আচরণ নিয়ে কথা বলেছিলেন রায়হান কবির। সংবাদমাধ্যমটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকে এর সমালোচনা শুরু করে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার ওই প্রতিবেদনে তোলা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।

ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আল জাজিরার বেশ কয়েকজন কর্মীকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।

আল জাজিরার ওই প্রতিবেদন প্রচারের পর থেকেই সাক্ষাৎকার দাতা বাংলাদেশি রায়হান কবিরের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তার বিষয়ে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিও দেওয়া হয়। পরে রায়হানের ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) বাতিল করে দেওয়া হয়। এতে করে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হন তিনি।

শুক্রবার মালয়েশিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের টুইট বার্তায় বলা হয়েছে, ‘অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে পলাতক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশি রায়হান কবিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

গ্রেফতারের আগে বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় রায়হান কবির নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি মিথ্যা বলিনি। আমি শুধু অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছি। আমি অভিবাসী ও আমাদের দেশের সম্মান নিশ্চিত করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, সব অভিবাসী ও বাংলাদেশ আমার পক্ষে থাকবে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও