কোরবানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ‘কৃত্রিম’ বানভাসী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫৯ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২০ মঙ্গলবার

কোরবানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ‘কৃত্রিম’ বানভাসী

ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। প্রাণঘাতি করোনার মহামারির মধ্যেও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ঘাটে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশু। তবে ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ডিএনডি ও এর আশপাশের এলাকার মানুষের মাঝে নতুন করে তৈরী হয়েছে দুশ্চিন্তা। কারণ এসব এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তৈরী হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

পানিবন্দী জীবনে যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেই সময়ে জলাবদ্ধতার মধ্যে কোরবানির পশু কিনে কোথায় রাখবেন? কোথায় কোরবানি দিবেন? কিভাবেই বা কোরবানি দিবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়েই নতুন করে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পানিবন্দী এসব মানুষের।

গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধের ভেতরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা ও এর আশেপাশের ডিএনডি অধ্যুষ্যিত এলাকার নি¤œাঞ্চলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিতে ৩২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ডিএনডি বাধের ভেতর ৫৬ বর্গ কিলোমিটার বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে ফতুল্লার রামার বাগ, সস্তাপুর, গাবতলা, কায়েমপুর, চাঁদমারী, ইসলামবাগ, শহীদ নগর, মাসদাইর, ইসদাইর, গাবতলী, এনায়েত নগর, তল্লা, সবুজবাগ, কুতুবপুর, পাগলা, দেলপাড়া, আলীগঞ্জ, দাপা, পিলকুনি, ভূঁইগড়, রঘুনাথপুর, কুতুবআইল, নয়াআটি, লামাপাড়া, জালকুড়ির নি¤œ এলাকাতে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।

এছাড়া ডিএনডি বাঁধের বাইরে বিশেষ করে ফতুল্লার লালপুর, লালখা, কাঠেরপুল , ইদ্রাকপুর, হাজী বাড়ি, ও মাসদাইর নতুন বাজার এলাকার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এখন বৃষ্টির পানিতে তৈরী ‘কৃত্রিম’ বন্যায় আটকা। এসব এলাকার মধ্যে এখন সব চেয়ে খারাপ অবস্থা লালপুরের পৌষা পুকুরপাড় এলাকা। ওই এলাকার ঘরে বাইরে সব খানেই পানি। এলাকাটির সব চেয়ে উচু জায়গাতেও এখন হাঁটু পানি। আর নিচু জায়গায় কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকাটিতে ডাইংয়ের মত ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকায় সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্যে পানি নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সারিসারি বহতল এবং টিন সেট বাড়ি থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে কোনো ভাড়াটিয়া নেই। কয়েকটি বাড়িতে হাতে গোনা ভাড়াটিয়া, আবার কোনো বাড়িতে শুধুই বাড়িওয়ালারই বানভাসী মানুষের মত বসবাস করছেন। জলাবদ্ধতায় অতিষ্ঠ হয়ে কোনো কোনো বাড়ির ভাড়াটিয়া, বাড়িওয়ারা সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। মানুষ না থাকায় এলাকার অধিকাংশ দোকন ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। পুরো এলাকাজুড়ে এখন শুধুই থৈ থৈ করছে বিভিন্ন ডাইংয়ের কেমিক্যাল মিশ্রিত দুর্গন্ধ যুক্ত বিষাক্ত পানি। আর সেই পানির মধ্যে চলাচলের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে নৌকা।

প্রাণঘাতি করোনার কারণে থমকে যাওয়া জীবন যখন স্বাভাবিক করে গতিতে চলতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনি জলাবদ্ধতায় এসব এলাকার মানুষের জীবণ আবার থমগে গেছে। জলাবদ্ধতার দুশ্চিন্তার মধ্যেই ঈদুল আজহার ঠিক আগ মুহূর্তেই এমন পরিস্থিতিতে কোরবানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এসব এলাকার মানুষ।

লালপুর পৌষা পুকুরপাড় এলাকার বাসীন্দা শাহাদাত হোসেন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা পানি বন্দী। আগে এলাকার একেবারে নিচু এলাকায় পানি থাকতো। উচু এলাকায় পানি থাকলেও নেমে যেতো। যে কারণে কোরবানি নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হতো না। এলাকার সবাই শুকনো এলাকায় একত্র হয়ে কোরবানি দিতাম। কিন্তু এইবার এলাকার সবচেয়ে উচু এলাকাতেও পানি উঠেছে। যে কারণে নতুন করে কোরবানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঈদে সবাই আনন্দ করে খুমি হয়। কিন্তু ঈদ যত কাছে আসছে আমাদের চিন্তা তত বাড়ছে। গরু কিনে কোথায় রাখব, কিবাবে কোরবানি দিব, কোথায় কোরবানি দিব এসব নিয়ে চিন্তা করেই আমাদের দিন কাটছে। পানি কমার কোনো লক্ষণ দেখছি না। উপরন্তু প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে, পানি আরো বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত যে কি করব সেটাও আমরা জানি না।’

এ প্রসঙ্গে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এলাকাটিতে যেহেতু কোনো খাল নাই তাই জলাবদ্ধতা নিরসন অসম্ভব। আমাদের হাতে কিছু করার নাই। আর পাশে কোন বুড়িগঙ্গা নদী আছে কিন্তু সেখানে নিষ্কাশন ব্যবস্থাও সহজ বিষয় না। আমরা চেষ্টা করছি এই এলাকাকে যাতে ডিএনডি প্রজেক্টের মধ্যে নেওয়া যায়। কিন্তু ডিএনডি প্রজেক্টের কাজ এখনো শেষ হয়নি। প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে তো আমরা নতুন করে কোনো এলাকাকে যুক্ত করতে পারবো। ডিএনডি প্রজেক্টের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু করার নেই।’

ডিএনডি বাঁধের বাইরে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতার কারণ জানা গেলেও বাঁধের ফেতরের মানুষের মনে এখনো জলাবদ্ধতার কারণ অজানা। বাধের ভেতরের মেগা প্রকল্পের কাজ ২ বছর আগে শুরু হলেও এখনো দৃশ্যমান জলাবদ্ধতা নিরসনে তেমন সুফল পাওয়া না যাওয়াকে হতাশাজনক হতাশাজনক হিসেবে উল্লেখ করছেন তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে ডিএনডি বাধের ভেতরে জালকুড়ির বাসীন্দা দেলোয়ার হোসেন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমরা ডিএনডি বাঁধের ভেতরে। কিন্তু তারপরেও বৃষ্টিতে এলাকা তলিয়ে গেছে। পানি ধীর গতিতে নামছে।’

জানা যায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা তথা ডিএনডি বাঁধের ভেতরে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের কাজ কাজের ধীরগতি ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অসহযোগিতাকে এবং উচ্চ আদালতে ২৬ জন অবৈধ স্থাপনা মালিকের মামলার কারণে ডিএনডি প্রকল্পের কাজের গতি কমে যায়।

ডিএনডি সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে জানান, ‘ডিএনডি প্রকল্পের কাজ যেকোন প্রকল্পের থেকে খুব চ্যালেঞ্জিং। মূলত এখানে ডাম্পিং নেই, খালগুলোর নিচ দিয়ে গ্যাস, বিদ্যুতের, ওয়াসার সহ বিভিন্ন লাইন রয়েছে। যার জন্য পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও উচ্চ আদালত থেকে ২৬ জন অবৈধ স্থাপনার মালিক স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে। এ ২৬ জনের জন্য ২২ লাখ লোকের সমস্যা হচ্ছে। আমরা এসব কিছুই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজ করছি।’


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও