‘আমার ছেলেকে ফেরত দিন’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৩০ এএম, ৬ আগস্ট ২০২০ বৃহস্পতিবার

‘আমার ছেলেকে ফেরত দিন’

মালয়েশিয়ায় গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জের রায়হান কবিরকে দেশে ফেরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আকুতি জানিয়েছেন তারা মা ও বাবা। তবে মালয়েশিয়া সরকার বলছে তাকে ৩১ আগস্ট দেশে ফেরত পাঠাবে।

রায়হানের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হলেই তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির ইমিগ্রেশন মহাপরিচালক খাইরুল জাইমি দাউদ।

৫ আগস্ট বুধবার পুত্রজয়ায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, আমি কখন অনুমান করতে পারি না (রায়হানকে দেশে ফেরত পাঠাতে) তবে, বাংলাদেশের প্রথম ফ্লাইটে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। এর আগে তদন্তের স্বার্থে রায়হানকে ১৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

চলতি লকডাউনে মালয়েশিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সে দেশে বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী আচরণ করেছে বলে আলজাজিরা টেলিভিশনকে জানিয়েছেন রায়হান কবির (২৫)।

‘লকড আপ ইন মালয়েশিয়াস লকডাউন’ শিরোনামে ২৫ মিনিটের ডকুমেন্টারিটি আলজাজিরা টেলিভিশনে ৩ জুলাই প্রচারিত হলে মালয়েশিয়াজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হওয়ার পর মালয়েশিয়া সরকার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রতিবেদনটিকে ‘ভিত্তিহীন ও মিথ্যাচার’ বলে অভিহিত করে।

বিডি নিউজ তাদের এক সংবাদে জানান, মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার শাহী মসজিদ নুরবাগ এলাকার বাড়িতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে ছেলের সঙ্গে বিচ্ছেদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন তারা।

কথা বলতে বলতে ছেলের ছবি মোবাইল ফোনে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন রাশিদা বেগম। ছেলের সঙ্গে বিচ্ছেদের যাতনায় তিনি প্রায় শয্যাশায়ী।

রায়হানের মা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এবার ঈদে তাদের পরিবারে কোনো আনন্দ ছিল না। রায়হান দূরে থাকলেও ঈদের দিন ভিডিও কলে যোগাযোগ করেছে, কথা বলেছে। ছেলে এখন মালয়েশিয়ায় জেলখানায় বন্দী আমাদের কী ঈদ আছে? মায়ের মনে কী যে কষ্ট তা বলে বোঝানো যাবে না।

“প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ, আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরিয়ে দেন। মালয়েশিয়ান সরকারের কাছে আবেদন আমার ছেলেকে ফেরত দিন।”

রাশিদা বলেন, “আমার রায়হান মানুষের বিপদে পাশে থেকেছে। করোনায় মালয়েশিয়ায় লকডাউনের মধ্যেও বহু প্রবাসী মানুষের বাড়িতে সে খাবার পৌঁছে দিয়েছে। তাদের পাশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছে।

“সরকারের কাছে আবেদন তারা আমার ছেলের পাশে দাঁড়াক, তাকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করুক।”

রায়হানের বাবা শাহ্ আলম পঞ্চবটি বিসিক শিল্প নগরীর একটি পোশাক কারখানায় স্যাম্পলম্যান। তার দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় রায়হান ২০১৪ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মালয়েশিয়ায় পড়তে যান। মেয়েটি নারায়ণগঞ্জ কলেজে স্নাতক পড়ছেন।

শাহ্ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মালয়েশিয়ায় বিএ পাশ করে ঈদুল ফিতরের আগে সেখানে একটি কোম্পানিতে চাকরি হয় রায়হানের। কিন্তু বেতনের টাকা সেখানেই কষ্টে থাকা মানুষের জন্য খরচ করতো সে।

রায়হানের মা রাশিদা বেগম বলেন, ‘লকডাউনে বন্ধুকে দেখতে গিয়ে তার খারাপ অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারেনি। সে আল জাজিরা টেলিভিশনে কথা বলেছেন। ও সব সময় মানুষের ভালো চেয়েছে। কখনো খারাপ চায়নি।’

গ্রেপ্তারের আগে নিজের মা-বাবার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে পাঠিয়ে বার্তায় রায়হান বলেন, “আমার অপরাধটা কী? আমি তো কোনো মিথ্যা বলিনি। প্রবাসীদের ওপর যে বৈষম্য ও নিপীড়ন চলেছে, আমি শুধু সেই কথাগুলো বলেছি। আমি চাই প্রবাসে থাকা কোটি বাংলাদেশি ভালো থাকুক। আমি চাই পুরো বাংলাদেশ আমার পাশে থাকুক।”

তার বাবা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি, কোনো অপরাধ করেনি। দেশের মানুষ প্রবাসীদের সাথে সেখানে যে ধরণের নিপীড়ন করা হয়েছে সেটিই গণমাধ্যমে বলেছে; অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। দেশের স্বার্থেই সেটি বলেছে- এর বেশি কিছু নয়।

“এটি কোনো অপরাধ হতে পারে না। রায়হান ছোট বেলা থেকে অন্যের বিপদ-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।”

ছেলের বিপদে পাশে থাকতে দেশের মানুষকে আহ্বান জানিয়ে তাকে দেশে ফেরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আকুতি জানান তিনি।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি মালয়েশিয়ার সরকারের আচরণের সমালোচনা করে আল-জাজিরার ডকুমেন্টারিতে দেওয়া সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর ২৪ জুলাই রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ৩ জুলাই আল জাজিরা টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ওই প্রামাণ্য প্রতিবেদনে মহামারীর মধ্যে অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কর্মকা-ের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন রায়হান কবির।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, মহামারীর মধ্যে অবৈধ শ্রমিকদের আটক ও জেলে পাঠানোর মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকার বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এটা কোনো মানবিক আচরণ হতে পারে না।

তবে দেশটির সরকারের কর্মকর্তারা আল জাজিরার ওই খবর ‘ভুল, বিভ্রান্তিকর এবং অন্যায্য’ বলে দাবি করেন। ওই প্রতিবেদন সম্প্রচারের পর দেশটিতে ক্ষোভের সঞ্চার হলে রায়হানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ আল জাজিরার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে তলব করার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলেছে, দেশটির সরকার গণমাধ্যমের প্রতি দমনমূলক আচরণ করছে।

রায়হানের বাবা বলেন, গ্রেপ্তারের পর থেকে ছেলের সঙ্গে তাদের আর যোগাযোগ নেই। সরকারিভাবে বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

স্থানীয়রা জানান, রায়হানের গ্রেপ্তারের খবর তারা টেলিভিশনে দেখেছেন। ছোটবেলা থেকে রায়হান এলাকার সকলের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তো। পাশে থাকত এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো। তারা রায়হানের মুক্তির জন্য পাশে দাঁড়াতে দেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি আহ্বান।

নূরবাগ এলাকার বাসিন্দা জুয়েল মাসুম জানান বলেন, রায়হান নিঃস্বার্থে সবার পাশে থাকতো। অন্যায় হলে প্রতিবাদ করতো। এমন ছেলের গ্রেপ্তার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

প্রতিবেশী শাকিলা বেগম ও নুরজাহান আক্তার বলেন, “আমাদের সন্তান রায়হানের গ্রেপ্তারের পর থেকে আমাদের কাছে খুব খারাপ লাগছে। কেউ বিপদে পড়েছে নিজ থেকেই তার পাশে দাঁড়াতো রায়হান।

“কেউ পড়াশোনা করতে পারছে না, তাকে নিজের বই দিয়ে, অর্থ দিয়ে সাহায্য করতো। পরোপকারী ওই ছেলের এই বিপদ মানতে কষ্ট হচ্ছে।”

রায়হানের বোন কলেজ শিক্ষার্থী মেহেরুন নেসা বলেন, তার ভাই এলাকার সকলের কাছে প্রিয় মানুষ। দেশে যেমন ছিল, বিদেশের মাটিতে তেমনটিই রয়ে গেছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও