সাখাওয়াতের পেছনে দুই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী

|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:১৫ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার



সাখাওয়াতের পেছনে দুই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী

বিগত বিএনপি সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জে যেসব দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ছিল তাদের একজন জামান ও অপরজন সেলিম। স্থানীয় রাজনীতিকদের কাছে তারা ছিল ‘কেরাবুন ও কাতিবুন’ নামে পরিচিত। দীর্ঘ ৮ বছর এলাকার বাইরে থাকার পর আবারও তাদের দেখা মিলেছে সিদ্ধিরগঞ্জে। আর সে কারণে রীতিমত আতংক ছড়াচ্ছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। তাঁরা বলছেন, যাদের কারণে সন্ত্রাসের কালিমা লেপন হয়েছে বিএনপির ললাটে এখন সুযোগ বুঝে তারাই ফিরে আসছে এলাকাতে। ১৪ ডিসেম্বর বুধবার সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়িতে আগামী ২২ ডিসেম্বর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে চলমান গণসংযোগে দেখা গেছে ওই দুইজনকে। সাখাওয়াতের পাশে থেকেই স্লোগান তুলেছেন ধানের শীষের পক্ষে। দীর্ঘক্ষণ দেখা গেছে এক সঙ্গে। ফলে বিএনপির ক্লিন ইমেজ বিশেষ করে সাখাওয়াতের ব্যক্তির ক্লিন ইমেজের উপর পড়তে শুরু করেছে কলংকের তিলক। সঙ্গে ছিলেন জামান ও সেলিমের ‘গুরু’ খ্যাত সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন। এর আগেও গত ৮ ডিসেম্বর সাখাওয়াতের সঙ্গে দেখা গেছে সাত খুনের এজাহারভুক্ত আসামী ইকবাল হোসেনকে।


কে এই জামান ও সেলিম
জামান ও সেলিম ডেমরার সারুলিয়া এবং সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের একাংশের দন্ডমুন্ডের কর্তা এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে গিয়াস উদ্দিনের সরাসরি শেল্টারে দাপিয়ে বেড়িয়েছে পুরো এলাকা। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারন মানুষ কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস করেনি। জামান-সেলিমের নেতৃত্বে ছিল বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। গিয়াস উদ্দিন এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে তার ব্যক্তিগত বডিগার্ড নিয়োগ দেয়। এতে করে এলাকায় তারা পরিচিত পায় কেরামুন-কাতিবুন হিসেবে। গিয়াসউদ্দিনের বিলাসবহুল গাড়িতে বসেই বিএনপির ৫ বছর অধিকাংশ অপরাধ সংগঠিত করেছে জামান-সেলিম। চাঁদাবাজি, জবর দখল, ঝুট সন্ত্রাস, বালু সন্ত্রাস, টেন্ডাবাজি, অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, খুন, রাহাজানিই ছিল তাদের অবৈধ আয়ের প্রধান উৎস। বিএনপির নেতাকর্মীরা পর্যন্ত জিম্মি ছিল জামান ও সেলিমের কাছে। এরা সব সময় গিয়াসউদ্দিনকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখতো। গিয়াসউদ্দিনও ক্ষমতায় থাকতে গত ৫বছর এই দুই সন্ত্রাসীকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করেনি। গিয়াসউদ্দিনের পরামর্শে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পকেটমার, ছিনতাইকারী, ডাকাত, মাদক ব্যবসায়ীদের সংঘঠিত করে একটি অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে জামান ও সেলিম। গিয়াসউদ্দিনের আশীর্বাদে বিভিন্ন জোট সরকারের ৫ বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় তারা।


ডেমরা এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধকে মোকাবেলা করার জন্য জামান ও সেলিম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-৪ এর তৎকালীন সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার সাথে গোপন আতাঁত করে বিএনপির নবী গ্রুপে সক্রিয় থাকে। এমনকি তারা সিদ্ধিরগঞ্জে তৎকালীন আওয়ামী কৃষক লীগ নেতা গিয়াসউদ্দিনের হয়ে কাজ করতে থাকে। এর আগে আওয়ামী লীগের ৯৫-৯৬ সালে বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলনে জামান ও সেলিম কৃষক লীগ নেতা গিয়াসউদ্দিনের অধীনে সক্রিয় ছিল। ১৯৯৭ সালের ১৩ মার্চ বিকাল ৪টায় ডেমরা চিটাগাংরোড সড়কের গলাকাটাপুল এলাকায় জনৈক গরু ব্যবসায়ী আমান উল্যাহর ১ লাখ ৫৩ হাজার ও ১০হাজার টাকার মূল্যের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনতাই করে জামান ও সেলিম বাহিনী। সে সময় জামানের সহযোগী দেলোয়ার ধরা পড়ে। ১৯৯৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি দেয়। এই কর্মসূচিকে ঠেকাতে ৮ জুন রাত ৯টা ১৫ মিনিটে শিমরাইল মোড়ে হাবিবুল্লা কাঁচপুরী সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। ১৯৯৯ সালের ৩ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭ টায় শিমরাইল মোড়ে দেওয়ানবাগীদের নিষিদ্ধ করার ইস্যুকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চরমোনাই সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। শিমরাইলে ৩ জন ম্যাজিস্ট্রেট, ১ জন সহকারী পুলিশ সুপারসহ প্রচুর সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োজিত ছিল। চরমোনাই সমর্থকদের সাথে চিহিৃত সন্ত্রাসীরা যোগ দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুিলশের উপর বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এসময় হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসীরা কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের ৩টি সরকারী জীপ, সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল-বি) সামসুজ্জোহার সরকারী জীপ (নং-ঢাকা ঘ-৩৩৫২), সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পিকাপ (নং-নারায়ণগঞ্জ-ম-০২-০০৯৪), নারায়ণগঞ্জ থানার পিকাপ (নং-নারায়ণগঞ্জ-ম-০২-০০৯৫) অগ্নিসংযোগ করে গাড়িগুলো পুড়িয়ে দেয়। এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের উপর হামলা চালাতে উদ্যত হলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে ৯৪ রাউন্ড গ্যাস সেল, ২৭২ রাউন্ড রাবার বুলেট, ৯২ রাউন্ড রাইফেলের গুলি এবং ২৯ রাউন্ড রিভালবারে গুলি করে। আড়াইঘন্টা স্থায়ী এ সংঘর্ষে সন্ত্রাসী নিহত ও বহু সম্পদ বিনষ্ট হয়। এ ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তৎকালীন ওসি সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। ২০০১ সালের জানুয়ারীতে সারুলিয়া ইউনিয়নের মেম্বার আব্দুল গনির ছেলে শরীফকে বাড়ী থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে জামান ও সেলিম বাহিনী। ২০০১ সালের নির্বাচনের পরপর শিমরাইল এলাকায় জনৈক হাজী নুরুল ইসালামের বাড়ীতে গিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে জামান ও সেলিম। এ ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ১টি সাধারণ ডায়েরী নং-১৫০২ তারিখ-২৭/১০/২০০১ করে হাজী নুরুল ইসালাম। গিয়াস উদ্দিন এমপির সংস্পর্শে আসার পর জামান ও সেলিম সন্ত্রাসীদের বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে। নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী ভয়ঙ্ককর খুনী রকমতও ছিল তাদের দলের অন্যতম সদস্য। জামান ও সেলিমের পরিচালনায় রকমত একের পর এক খুন ও ডাকাতি করতে থাকে। ২০০২ সালের ৩০ডিসেম্বর বাংলাদেশ চুন প্রস্তুত কারক মালিক সমিতি সভাপতি ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিশিষ্ট চুন ব্যবসায়ী সুন্দর আলী নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি ক্লিনিকের সামনে সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হয়। সুন্দর আলী মারা যাওয়ার ৩ মাস আগে ২৭সেপ্টম্বর স্থানীয় এমপি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর অভিযোগ এনে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেছিল। এতে ওই এমপি তার উপর ক্ষিপ্ত হয়। ২০০৩ সালে ১৬ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা হাজী কফিল উদ্দিন সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়। ২০০৪ সালে ২৮মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি আবুল কাশেম ওরফে গলাকাটা কাশেমকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে।

সাত খুনের আসামীর সঙ্গে উল্লাস
এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার একজন আসামীর সঙ্গে ওই মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খানকে উল্লাস করে গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। জানা গেছে, ইকবাল হলো সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের একজন। ২নং ওয়ার্ডে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী আলোচিত ৭ খুনে অব্যাহতি প্রাপ্ত ইকবাল হোসেন ৮ম শ্রেনী পাশ। তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা তদন্তাধীন ও একটি বিচারাধীন রয়েছে। একটিতে তিনি অব্যাহতি পেয়েছে। ইকবাল এবার সাত খুনের ঘটনায় নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি যিনি উপ নির্বাচনে কাউন্সিলর হয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন। মোটকথা ইকবাল লড়ছেন বিউটির বিরুদ্ধে। আর ওই সাত খুন মামলার আসামী ছিলেন ইকবাল। জানা গেছে, সাত খুনের ঘটনায় প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম সহ ৫জনকে অপহরণ শেষে হত্যার ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।

এ মামলায় নূর হোসেন সহ ৬জনের নাম উল্লেখ করা হয়। ওই ৬ জনের একজন হলেন ইকবাল। যদিও ২০১৫ সালের গত ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুটি মামলার অভিন্ন চার্জশীটে ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তারকৃত সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নূর হোসেন সহ র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত তিনজন আলোচিত কর্মকর্তা সহ ৩৫জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে বিউটির মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এজাহারভুক্ত ৫ আসামী সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সেক্রেটারী হাজী ইয়াছিন মিয়া, ইকবাল, হাসমত আলী হাসু, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও আনোয়ার। এ ঘটনায় গত ১১ মে আদালতে সেলিনা ইসলাম বিউটি চার্জশীটের বিরুদ্ধে না রাজী প্রদান করেন। পরে আদালত সে না রাজী পিটিশন খারিজ করে দেয়।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও