কাউন্সিলর পদে হত্যা, মাদক, দুদক ও বিদ্যুৎ চুরির মামলার আসামিরা

|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫১ পিএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৬ মঙ্গলবার



কাউন্সিলর পদে হত্যা, মাদক, দুদক ও বিদ্যুৎ চুরির মামলার আসামিরা

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জমি দখল, মাদক ব্যবসা, প্রতারণা এমনকি বিদ্যুৎ চুরির আসামিরাও। প্রার্থীদের মধ্যে কয়েজন জেলা পুলিশ ও র‌্যাবের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। কাউন্সিলর পদে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন না হওয়ায় প্রার্থীদের কোনো দলীয় পরিচয় থাকছে না। তবে অভিযুক্ত প্রার্থীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে পদধারী নেতা বা এ দুই দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট প্রহণ হবে। ২৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৫৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অভিযোগ মূলত সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে একজন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের বিরুদ্ধেও মাদকের মামলা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসানের বিরুদ্ধে মাদক মামলায় গত বছরের ২৮ মে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। আরিফুল স্থানীয়ভাবে নূর হোসেনের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল র‌্যাব-১১-এর সদস্যরা আরিফুলসহ ৪ জনকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করেন। পরে আরিফুলসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাঁকে সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদ থেকে বরখাস্ত করে। নূর হোসেনের কাউন্সিলর পদ শূন্য হওয়ার পর উপনির্বাচনে তাঁর সহযোগী আরিফুল হাসান কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসারও অভিযোগ আছে। তাঁর নামে থাকা দুটি অস্ত্রের লাইসেন্সও জেলা প্রশাসন বাতিল করে। আরিফুল বলেন, তিনি সব মামলা থেকে জামিনে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো সাজানো।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক শাহজালাল বাদল সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের আপন ভাতিজা। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির ৮টি মামলা এবং যশোরের কোতোয়ালি থানায় ১টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। তাঁর নামে থাকা ২টি অস্ত্রের লাইসেন্স জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালে বাতিল করেছে। সাত খুনের ঘটনার পর শাহজালাল এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এলাকায় ফেরত এলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আলমগীরের বিরুদ্ধে মাদকসহ ৮টি মামলা বিচারাধীন। সিদ্ধিরগঞ্জে সংরক্ষিত ১নং ওয়ার্ডে (ওয়ার্ড ১,২ ও ৩) কাউন্সিলর প্রার্থী নাজমার বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদকের মামলা।

৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী যুবলীগের নেতা মতিউর রহমান হলফনামায় তাঁর বিরুদ্ধে মোট ২৩টি মামলার কথা উল্লেখ করেছেন। মামলার মধ্যে একটি হত্যা মামলা চলমান রয়েছে। বাকী হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জমি দখল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রভৃতি মামলা থেকে তিনি হয়তো অব্যাহতি বা খালাস পেয়েছেন। পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের মে মাসে মাদক ব্যবসার অভিযোগে মতিউরকে ধরতে পুলিশ তাঁর আইলপাড়ার বাসায় অভিযান চালায়। কিন্তু বাসায় যাওয়ার সামনের সড়কে বসানো সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মতিউর পালিয়ে যান। একই ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ম-লের বিরুদ্ধে পুলিশ কনস্টেবল মফিজ হত্যা মামলা বিচারাধীন আছে।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী গোলাম মুহাম্মদ সাদরিলের বিরুদ্ধে স্কুল ছাত্র হত্যাসহ ৯টি মামলা আছে। তিনি বিএনপিদলীয় সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের ছেলে। ৫নং ওয়ার্ডের জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ফুলহর থানায় দুদকের একটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকছুদুল আলম খন্দকারের হলফনামা অনুযায়ী বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে এখন ২৪টি মামলা চলমান রয়েছে। অতীতে ছিল আরও ৩টি। মাকছুদুল জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই। মাকছুদুল বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা বেশির ভাগ মামলাই নাশকতার। ২০১৩ সালের শেষে ও ২০১৫ সালে করা। এ ধরনের মামলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক আছে। ১৫ নং ওয়ার্ডে আনোয়ারের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ আইনের একটি মামলা ও একটি দেওয়ানী মামলা চলমান রয়েছে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী রওশন আলীর বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ৩টি মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই ওয়ার্ডের প্রার্থী যুবলীগের নেতা ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা ছিল। সেই মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। এই ওয়ার্ডের আরেক প্রার্থী বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২টি মামলা বিচারাধীন। ওই ওয়ার্ডে হাজী মোঃ ইউনুছ মিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলা আদালতে স্থগিত রয়েছে।

২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী কথিত বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা বিচারাধীন। নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর ৪ সহযোগী হত্যার মামলার এজাহারে অপর প্রার্থী ইকবাল হোসেনের নাম থাকলেও পরে অভিযোগপত্র থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই ওয়ার্ডে যুবদল নেতা দলিল লিখক ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে একটি মামলা তদন্তাধীন ও একটিতে তিনি খালাস পেয়েছেন।

এছাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল হেকিমের বিরুদ্ধে ১টি মামলা রয়েছে। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী যুবলীগের নেতা তোফায়েল হোসেনের বিরুদ্ধে ২টি মামলা বিচারাধীন। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগের নেতা নজরুল ইসলামের ৩টি মামলা বিচারধীন। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী নজরুলের বিরুদ্ধে ১টি মামলা রয়েছে। ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের নেতা আলা হোসেন আলার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা, হুমায়ূন কবীরের বিরুদ্ধে ৩টি এবং ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা উজ্জ্বল হোসেনের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা, আওয়ামী লীগের নেতা মহসিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা, ছাত্রদলের নেতা দেলোয়ার হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে ৭টি মামলা, যুবদলের নেতা সাগর প্রধানের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ইসরাফিল প্রধানের বিরুদ্ধে ১টি মামলা, ২০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী শাহেন শাহ আহম্মেদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা, আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ১টি মামলা, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের হান্নান সরকারের বিরুদ্ধে ৩টি, খোরশেদ আলমের ১টি, রেদওয়ানুল হক মামুনের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা, নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে। ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে ৪টি, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে রাহাত মিয়ার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে ৩টি, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কামরুজ্জামান বাবুলের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা আছে। এছাড়া বেশ কয়েকজন প্রার্থী মামলার আসামী হলেও সেগুলো থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মতিয়ার রহমান বলেন, ‘যাঁরা মামলার আসামি জামিনে থাকবেন না, তাঁরা নির্বাচন করতে পারবেন না। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো আপস নেই। যারা নির্বাচনকে ভুল পথে চালাতে চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী মামলার আসামী। সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৩ থানা পুলিশ কাউন্সিলর প্রার্থীদের মামলার তালিকা করে নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে তথ্য জমা দিয়েছেন বলে বলে জানা গেছে। নির্বাচনে ৯ জন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী, সংরক্ষিত (নারী) কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৭৬ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করে। পরে  বাছাই শেষে ৮ জন মেয়র প্রার্থী, ৩৭ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও ১৬৬ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সারাধারণ কাউন্সিলরদের পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও