আইভী যা পেরেছেন আর যা পারেননি

|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৬ পিএম, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার



আইভী যা পেরেছেন আর যা পারেননি

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ৫ বছরে মেয়র পদে দায়িত্ব পালনের পরে আবারো ভোটযুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। গেলবারে তিনি দোয়াতকলম প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে অংশ নিলেও এবার অংশ নিচ্ছেন আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকে। গেল ৫ বছরে আইভী কি করতে পেরেছেন আর কি পারেননি তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষন। আইভীর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান আইভীর দুর্বলতাকে ইস্যু করে ভোটযুদ্ধে জয়ী হতে চাইছেন। তিনি গণসংযোগকালে বলছেন গেল ১৩ বছরে মেয়র পদে থাকাকালে আইভী উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণসহ নানাবিধ ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছেন। এজন্য এবার ভোটাররা আইভীকে ভোট দিবেনা বলেও দাবি করছেন সাখাওয়াত। অপরদিকে আইভী বলছেন, তিনি গত ৫ বছর ও এর আগে পৌরসভার ৮ বছর এ ১৩ বছরে আমি এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেননি। বিগত দিনে চেষ্টা করেছেন সাধ্যমত উন্নয়ন করতে। প্রতিশ্রুতির ৭০ ভাগই তিনি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। উন্নয়নে কখনোই রাজনীতিকে প্রাধান্য দেননি। তাই দলমত নির্বিশেষ সাধারণ মানুষ তাকে ভোট দিবে বলেও তিনি মনে করছেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল ৫ বছরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে প্রায় দেড় হাজার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৫০০টি গৃহীত প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৬শ’ ২০ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসকল প্রকল্পের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় ১৫৪ কোটি টাকা, বন্দরের কদমরসুল অঞ্চলে প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার রাস্তা, প্রায় ৯২ কিলোমিটার ড্রেন, প্রায় ৪০ কিলোমিটার ফুটপাত, ২ সহ¯্রাধিক স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও গৃহহীনদের জন্য ৪২টি গৃহ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া সুপেয় পানির জন্য ১৭৮টি ডিপ টিউবওয়েল, ১৯২১ টি বন্ধুচুলা স্থাপন, ১৮০টি বৈদ্যুতিক পোল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া জাইকার অধীনে সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যায়ে ৫৪.১৪ কিলোমিটার সড়কে ২ হাজার ২৮৬টি বৈদ্যুতিক পুল ও ৪ হাজার ১৬৬ টি লাইট সেট স্থাপন করা হয়েছে।

আইভীর উল্লেখযোগ্য সফলতার মধ্যে রয়েছে বন্দরের কদমরসুল অঞ্চলে ১০০ ফুট প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ। যা আইভীর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে কয়েকগুন। পাল্টে দিয়েছে বন্দরের চিত্রও। এছাড়া প্রায় ৯৫ কোটি টাকায় ৯টি মার্কেট কাম এপার্টমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে যা সিটির রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস। শীতলক্ষ্যা-ধলেশ্বরী সংযোগকারী বাবুরাইল খাল পুন:খনন, সৌন্দর্য্যবর্ধন ও ড্রেনসহ ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজটিও আইভীর একটা বড় সফলতা যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া সেবক কলোনী নির্মাণ পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ পাতায় অর্ন্তভুক্ত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে পচনশীল বর্জ্য থেকে কম্পোষ্ট সার তৈরীর প্রকল্প সমাপ্তির পথে। এটি চালু হলে প্রতিদিন গড়ে ২০টন পচনশীল বর্জ্যকে জৈবসারে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

২৭টি ওয়ার্ডে বসবাসরত ৭৮৪ জন মুক্তিযোদ্ধার আজীবন হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করা হয়েছে। ৮ সহ¯্রাধিক হতদরিদ্র শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা বাবদ প্রায় ৩ কোটি টাকা প্রদান, ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যায়ে ৩ হাজার ৫ জনকে বিভিন্ন ট্রেডে কর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ, ১২০জনকে সেলাই প্রশিক্ষণ, ৭২০ জন হতদরিদ্র নারীকে ব্যবসার জন্য মূলধন থোক বরাদ্দ প্রদান, ৪২০ জনকে বয়স্ক শিক্ষা প্রদান, ১০৭ জন কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটরকে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা প্রদান, দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবায় ৮২৮টি রেডকার্ড প্রদান করা হয়েছে।  

পঞ্চবটিতে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ৬.২ একর ভূমিতে পিপিপি প্রকল্পের আওতায় এমিউজমেন্ট পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। ১৮নং ওয়ার্ডের গোগনগরে আলী আহাম্মদ চুনকা স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের জিমখানা আলাউদ্দিন খান স্টেডিয়ামটি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রমীলা ফুটবল টিম ও মদনগঞ্জ ফুটবল একাডেমীকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া নাসিকের ক্ষুদ্র ঋন তহবিল, শ্রমজীবী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য উন্নয়নসহ নানাবিধ গৃহীত পদক্ষেপও প্রশংসা কুড়িয়েছে নারীদের মধ্যে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইভী নাসিকের মেয়র পদে আসীন হওয়ার পরে তৃতীয় বাজেটে আইভী ৫ বছরের ২২টি, ১০ বছরের ১০টি ও ২০ বছরের ৭টি উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। যার মধ্যে ৫ বছরের মেয়াদী পরিকল্পনাগুলোর অনেকগুলোরই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও ২২টি পরিকল্পনার মধ্যে প্রথমেই ছিল শহরের ৫ নং ঘাট থেকে ইস্পাহানী ঘাট বরাবর শীতলক্ষ্য নদীর উপর সেতু নির্মাণ। যেটি ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় শহর উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পিজিবিলিটি স্টাডি করে চূড়ান্ত ড্রয়িং ও ডিজাইন প্রণীত হচ্ছে। এছাড়া নবীগঞ্জ থেকে হাজীগঞ্জ ঘাটেও ব্রীজ নির্মাণের জন্য জাইকা কর্তৃক সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম চলমান আছে। তবে সেটি আদৌ ওই স্থান দু’টি হবে কিনা সে নিয়ে সংশয় কাটছেনা সাধারণ মানুষের। তবে শহর ও বন্দরবাসীদের দাবি ওই স্থান দু’টির যেকোন একটিতেই ব্রীজ নির্মাণ করা। কারণ শহরের বাইরে সৈয়দপুর ও মদনগঞ্জে ব্রীজ নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন থাকলেও সেটিতে সাধারণ মানুষের খুব একটা উপকারে আসবেনা।

এদিকে শীতলক্ষ্যা নদীর ও সংযোগ খালের পানি দূষণমুক্ত রাখার জন্য কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টিতেও দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই। গেল বছরের ডিসেম্বরে সিটি করপোরেশনের একটি সভায় বিশ্বব্যাংক ও জাইকার এই প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মত হলেও সেটি রয়ে গেছে কাগজে কলমে। সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য বেশ কিছু এলাকায় সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ১৭৮টি গভীর নলকুপ বা সামারসিবল স্থাপন করা হলেও এখনো নগরীর বিভিন্ন স্থানে সুপেয় পানির সঙ্কট রয়েছে। আরেকটি পরিকল্পনার মধ্যে শহরের বাইরে পঞ্চবটিতে ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করতে পারলেও যানজট নিরসনে নতুন বাস টার্মিনাল ও সিটি সার্ভিস চালু করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারেননি আইভী। নগরীতে হকারদের জন্য মার্কেট নির্মাণ করলেও ফুটপাতে হকার বসা বন্ধ করতে পারেননি। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে আইভী প্রায় ৯২ কিলোমিটার বিভিন্ন ধরনের ড্রেন নির্মাণ করলেও এখনো নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কম্পোষ্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হলেও সেটি যথাসময়ে চালু না হওয়া এবং নির্দিষ্ট ডাম্পিং পয়েন্ট না থাকার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় ছিলেন আইভী। যা আইভীর ভোটের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে। তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাখাওয়াতও এই বিষয়গুলোকে নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলছেন। যদিও আইভীর এসকল ব্যর্থতার অনেকগুলোরই নেপথ্যে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে বিরোধও কাজ করেছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠের বিষয়টিও আইভীর প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল। কিন্তু বেশীরভাগ এলাকাতেই নেই খেলার মাঠ। এছাড়া পিপিপি প্রকল্পের আওতায় একটি পার্ক নির্মাণ করা হলেও নগরীতে পর্যাপ্ত পার্ক করতে পারেননি আইভী।

তবে আইভীর ৫বছর, ১০ বছর ও ২০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনার অন্যতম হচ্ছে কালচারাল এবং হেরিটেজ পার্ক নির্মাণ, কমিউনিটি ক্লিনিক, নগর হাসপাতাল এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানসহ মেডিকেল কলেজ, টেকনিক্যাল কলেজ এবং আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা, আধুনিক সুয়ারেজ সিস্টেম, কার্বনমুক্ত পরিচ্ছন্ন নগরী গড়া, নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা, শীতলক্ষ্যার উপরে রোপওয়ে এবং ওয়াটার সার্কুলার সার্ভিস চালু, সিটি এলাকা সম্প্রসারণ করা, আধুনিক পানি শোধনাগার নির্মাণ, সমন্বিত ইটিপি স্থাপন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা।  

এ বিষয়ে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী আইভী বলছেন, ৫বছর কাজ করার জন্য অনেক কম সময়। গেল ৫বছর আমরা বেশী কাজ করেছি রাস্তাঘাট ও নির্মাণে। এটা ঠিক পর্যাপ্ত পার্ক নেই। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। ভোটার প্রায় ৫ লাখ। সে হিসেবে আরো পার্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আল্লাহ যদি আমাকে কামিয়াব করে তাহলে আমি অসমাপ্ত কাজ গুলো শেষ করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের জন্য পার্ক, খেলার মাঠ, সুবজ বনায়ন, নিরাপদ শহর হিসাবে গড়ে তুলতে চাই।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও