আইভী ও সাখাওয়াতের মিল ও পার্থক্যের বিশালতা

|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৩ পিএম, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার



আইভী ও সাখাওয়াতের মিল ও পার্থক্যের বিশালতা

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে প্রধান আলোচনায় এখন আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপির সাখাওয়াত হোসেন খান। তাদের নীতিগত আদর্শের মধ্যে কিছুটা মিল থাকলেও নানা কারণেও রয়েছে আবার পার্থক্যের বিশালতা রয়েছে। ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আলোচিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুইজনই চাচ্ছেন বৈতরণী পার হতে। তাদের মধ্যে সেলিনা হায়াৎ আইভী অনেক আত্মবিশ্বাসী। আর এখনো সামলাতে পারছেন না সাখাওয়াত। নগরবাসী বলছেন, সন্ত্রাস নিয়ে দুইজনই সোচ্চার ছিলেন। দুইজনের যুদ্ধ ছিল অপশক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে অনেকটাই এগিয়ে আইভী। রাজনীতি ছাড়াও তাঁর রয়েছে বিশাল জনপ্রিয়তা। নগরের প্রত্যেকটি মানুষ তাকে চিনে নানা কারণে। বিভিন্ন সময়ে খুন, অপহরণ আর শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে আইভীর শিউরে উঠা বক্তব্যই তাকে নিয়ে গেছে অনেক উচুতে। অপরদিকে সাত খুনের ঘটনায় আলোচনায় আসেন সাখাওয়াত। কিন্তু সেটা ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারছেন না। গত কয়েকদিন ধরেই নির্বাচনী মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছেন সাখাওয়াত। তবে কোথাও মিলছে না কোন সাড়া। নতুন করে তিনি নিজেকে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অপ্রতিরুদ্ধ আইভীকে ঠেকাতে ছন্নছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন। মেয়র আইভী নগবাসীর জনপ্রিয়তায় যেখানে শীর্ষে অবস্থান করছেন সেখানে নগরবাসীর কাছে বিএনপির প্রার্থী অপরিচিত। এমনকি মেয়র আইভী রাজনৈতিক ভাবে যেখানে তিনবার জয়ী সেখানে সাখাওয়াত হোসেন দলচ্যুত বিরোধী নেতা হিসাবে বেশি পরিচিত। মূলত সাখাওয়াত আইন অঙ্গনে চার দেয়ালের ভেতরেই জনপ্রিয়। তবে আদালতপাড়ার চার দেয়ালের ভেতরে জনপ্রিয়তার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে আইভীর জনপ্রিয়তার অনেক ব্যবধান। আর সে ব্যবধানে একেবারেই ঠুনকো।

নগরবাসী বলছেন, ডা. আইভী যতোই আওয়ামী লীগ নেতা হন না কেন নারায়ণগঞ্জের গডফাদার আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তার উত্থান। এমনকি প্রার্থিতা নিশ্চিত হওয়ার আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, মেয়র হিসেবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ৬০ ভাগ সফল হলেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি শতভাগ সফল। এ সাফল্য এরকম না যে নারায়ণগঞ্জ থেকে তিনি সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসী গডফাদারদের মূল উপড়ে ফেলেছেন, বরং তার সাফল্য এটা যে তিনি সন্ত্রাস এবং গডফাদারদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়েছেন, সে হিসেবে তিনি নারায়ণগঞ্জ ছাপিয়ে সারাদেশেও পরিচিতি পেয়েছেন। এ কারণে গত নির্বাচনে তিনি সর্বজনীন প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, মেয়র হওয়ার পর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামে সারাদেশের মানুষের সমর্থন পেয়েছেন। আইভী ১৯৭৯ সালে ট্যালেন্টপুলে জুনিয়র স্কলারশিপ পান এবং ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় স্টারমার্কসহ উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ১৯৮৫ সালে রাশিয়ান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিক্ষাগ্রহণের জন্য ওডেসা পিরাগোব মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন এবং ১৯৯২ সালে কৃতিত্বের সাথে ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২-৯৩ সালে ঢাকা মিডফোর্ট হাসপাতালে ইন্টার্নি সম্পন্ন করেন। ডা. আইভী তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষা জীবনের পর ১৯৯৩-৯৪ সালে মিডফোর্ট হাসপাতালে এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে অনারারি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। তিনি ১৬ জানুয়ারি ২০০৩ তারিখে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম মহিলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১১ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত তিনি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, স্বাধীনতার পর দুই-দুবার (১৯৭৪ সালের ৪ মার্চ হতে ১৯৭৭ সালের ৯ মার্চ এবং ১৯৭৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হতে ১৯৮৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।  ১৯৮৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী মারা যান নারায়ণগঞ্জ পৌর পিতার উপাধি আলী আহাম্মদ চুনকা। ১৯৮৬ সালে আইভী বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওদেসা নগরের পিরাগভ মেডিকেল ইনস্টিটিউটে। আলী আহাম্মদ চুনকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় হলেন ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনের মাত্র ১৭দিন আগে নিউজিল্যা- থেকে তাকে উড়িয়ে দেশে আনা হয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়ে তার পক্ষে নারায়ণগঞ্জে জোর প্রচারণা চালান দলের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও বিপলু ভোটে জয়ী হন তিনি। ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারী দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১১ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত একটানা পৌর চেয়ারম্যানের আসনে বসে উন্নয়নের চেষ্টা করেন তিনি।

অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান বর্তমানে বিএনপির কোন পদে নেই। সাখাওয়াত হোসেন খানের জন্ম ১৯৬৯ সালের ২০ আগস্ট। বিএনপি থেকে কাকতালীয়ভাবে মনোনয়ন পাওয়া সাখাওয়াত হোসেন খানের পিতা মোঃ ফজল খান ও মাতা হোসনে আরা বেগম। সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে সুনামের সাথে বিএ ও আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করি। আশির দশক থেকে বিএনপির মাধ্যমে সাখাওয়াতের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। বিএনপিতে প্রথমে একজন কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন সাখাওয়াত। ১৯৯৮ সালে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৪ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত এবং ২০০৯ সালে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য মনোনীত হন তিনি। ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সাখাওয়াত।তিনি ১৯৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে সদস্য পদ লাভ করেন, ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ বারের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, ২০০৪ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত নারায়াণগঞ্জ বারের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ বারের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ ২০১৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুনরায় নারায়ণগঞ্জ বারের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সহ সভাপতি ছিলেন। ৯০ দশকে নারায়ণগঞ্জ আসার পর আইন কলেজে ভর্তি হন এবং আইন পেশায় জড়ান। তখন থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। এছাড়া এক সময়ে তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকারের ‘জুনিয়র’ থাকলেও ২০১৩ সালের পর থেকে তাদের সম্পর্কের মধ্যেও অবনতি ঘটে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও