১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, সোমবার ২৮ মে ২০১৮ , ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ

পুলিশকে যে নির্দেশ দিলেন শামীম ওসমান


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৫:৫৭ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৯:১২ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ সোমবার


পুলিশকে যে নির্দেশ দিলেন শামীম ওসমান

নারায়ণগঞ্জ শহরে হকার বসানো নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান ও সিটি করপোরেশনের মধ্যকার চিঠি চালাচালির পরেও ফুটপাতে হকার বসতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত যখন আসে তখন মানবিক দিক বিবেচনায় শহরে হকার বসার নির্দেশ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউকে না খাইয়ে রাখার রাজনীতি করেন না। দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার রাজনীতি করেন তিনি। সেই নেত্রীর দেশে এভাবে হকারদের পেঠে লাথি মারা হবে সেটা সহ্য করা হবে না। তিনি বলেছেন আগে বিকল্প ব্যবস্থা করো তার পর উচ্ছেদ করো।

১৫ জানুয়ারী সোমবার বিকেলে শহরের চাষাঢ়ায় সলিমুল্লাহ সড়কে হকারদের সমাবেশে শামীম ওসমান ওই নির্দেশ দেন। এতে কয়েক হাজার হকার ও তাদের পরিবারের লোকজন বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে হাজির হন। সেখানে বক্তব্যে হকার নেতারা পুনর্বাসনের আগে ফুটপাতে বসার দাবী তুলেন।

বক্তব্য রাখেন নারায়ণগঞ্জ সিপিবি ও ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় হকার্স ইউনিয়নের সদস্য কবির হোসেন, ইকবাল হোসেন, আবদুর রহিম মুন্সী, আসাদুল ইসলাম, আলমগীর হোসেন পলাশ, হযরত আলী প্রমুখ।

সমাবেশের শেষের দিকে শামীম ওসমান বলেন, ‘আগামীকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সময় দিলাম। নারায়ণগঞ্জের ডিসি, এসপি, মেয়র সহ যারা আন্দোলন করেছেন চেম্বারসহ সকল নেতাকর্মীদের নিয়ে বসেন। কাল থেকে সকল দোকান বসবে। যদি কালকের আগে সমাধান দিতে পারেন দেন নয়তো হকার বসবে। কাল সাড়ে ৪টায় আমি নারায়ণগঞ্জে থাকবো এরা আমার ভাই, আমার পরিবার। পুলিশ একটা লাঠি তো দূরের কথা একটা গালিও দিতে পারবেনা। এটা আমার নির্দেশ। ছাত্রলীগ, যুবলীগ সবাই একসাথে মিলে ওরা কিভাবে বসবে সেটা ঠিক করে নিবেন। আমি শামীম ওসমান নির্দেশ দিলাম আগামীকাল (১৬ জানুয়ারী) বিকেল ৫টা হতে শহরে হকার বসবে। আর আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৫টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত হকার বসবে একটি নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আমাকেও ডাকতে পারেন। আলোচনার টেবিলে বসেন।’

শহরে গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে হকার ইস্যুতে হার্ডলাইনে আছে পুলিশ প্রশাসন। সেই পুলিশকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি পুলিশ প্রশাসনকে বলতে চাই কোন পুলিশ লাথি তো দূরের কথা গালিও দিতে পারবে না। আর হকারদের বলবো যদি আমাদের কেউ মারধরে করে মার খাবেন তার পর দেখবেন শামীম ওসমান এর পাল্টা জবাব কী নেয়। এটা আমার কোন হুকুম বা আদেশ না এটা আমার নির্দেশ। হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে যদি উঠানোর চেষ্টা করেন তাহলে সেটা হবে শামীম ওসমানের মৃত্যুর পর মৃত্যুর আগে না।’

হকারদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কাউকে এক টাকা চাঁদা দিবেন না। কেউ চাঁদা চাইলে তাকে বেঁধে রাখবেন।’

বক্তব্যের শুরুতেই শামীম ওসমান বলেন, হকারদের এ সমাবেশে এসে আমি লজ্জিত ও দুঃখিত। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে একজন নাগরিক হওয়ার পরেও জীবিকার তাগিদে হকারদের এভাবে মাঠে নামতে হয়েছে। আর এর পেছনে আমাদের মত কোন কোন রাজনীতিকের চাপ কিংবা নির্দেশও ছিল যে ফুটপাতে বসলেই যেন লাঠিপেটা করা হয়। এত নির্যাতনের পরেও শুধুমাত্র ছেলে মেয়ে আর সংসার চালানোর জন্য দুই বেলা একটু পেট ভরে ভাত খাওয়ার জন্য হকাররা আন্দোলন করে যাচ্ছে। অথচ ভোট আসলে এসব হকারদের কাছেই আমরা প্রথমে ছুটে যাই। তাদের কেউ আমাদের মাথায় হাত রেখে আর সে ছবি তুলে প্রচারণা চালাই। ভোটের আগে তারা থাকে মানুষ আর ভোটের পর তারা হয়ে যায় অমানুষ। কিন্তু আমি শামীম ওসমান এসব ভন্ডামির রাজনীতি করি না।

তিনি বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে এ অবস্থা চললেও আমি কোন কথা বলি নাই। দেখতে চেয়েছি বিবেকবান কারা তাদের পক্ষে আসে। কিন্তু অনেকেই আসে না। কারণ যারা কষ্ট বুঝে তারাই হকারদের মানুষ মনে করবে। যারা ক্ষুধার জ্বালা বুঝবে না তারাই হকারদের উচ্ছেদ করে। আমি দেশের অন্যতম একজন ধনী পরিবারের সন্তান হলেও ৭৫ পরবর্তী সময়ে বড় ভাই (নাসিম ওসমান) বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবীতে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, মেঝো ভাইকে (সেলিম ওসমান) বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনীরা ধরে নিয়ে যায় তখন আমরা এক বেলা খেয়েছি আর ২ বেলা খেতে পারি নাই। ৮১ সালে আমি শত শত শিক্ষার্থীর এক সিগন্যাচারে বেতন মওকুফ করে দিয়েছি। কিন্তু তখন মাত্র ৯শ টাকার জন্য আমি ফরম ফিলাপ করতে পারি নাই। ক্ষুধার জ্বালা আমি বুঝি। সে কারণেই হকারদের পাশে এসেছি। ২ বেলা না খেয়ে থাকুন দেখবেন বুঝবেন না খাওয়ার কষ্ট কী। আমিও চাই না ফুটপাতে হকার থাকুক। এভাবে হকার উচ্ছেদ সমুচিত না। অন্তত ২মাস আগে তাদের নোটিশ দেওয়া প্রয়োজন ছিল না। আর কোন কোন মৌসুম আসলেই হকারদের উপর অত্যাচার হয়। ঈদের সময়ে, নববর্ষ আর শীতের সময়েই কেন হকারদের উচ্ছেদ হয়। হকার উচ্ছেদ করে দিলাম কিন্তু কেউ চিন্তা করলাম না ওই হকার আজ কী খাবে আগামীকাল কী খাবে।

তিনি বলেন, হকার উচ্ছেদ করবেন আপনি আর গালি খাবেন আমার নেত্রী শেখ হাসিনা এটা করতে দিতে হবে না।

নিজের একমাত্র ছেলের বিয়ে ও এ বিয়েতে ২৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বক্তব্য প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার ছোটবোন বলেছে আমি নাকি ২৫ কোটি টাকা খরচ করেছি। ২৫ কোটি টাকা কত টাকায় হয় জানি না। তবে আলহামদুলিল্লাহ। আমার একমাত্র ছেলের বিয়েতে খরচ হয়েছে আগামীতে একমাত্র মেয়ের বিয়েতেও খরচ হবে। তবে দোয়া করবেন যাতে আগামীতে আমি ২৫শ কোটি টাকা খরচ করতে পারি। কারণ আমাদের খরচ করার মানসিকতা আছে। আমার বড় ভাই সেলিম ওসমান ইতোমধ্যে ৮০ কোটি টাকা খরচ করেছে শুধুমাত্র শিক্ষাখাত ও খেয়াঘাট ফ্রি করার জন্য করেছে। যদি হকারদের জন্য মার্কেট করতে হয় তাহলে সেটা সিটি করপোরেশন করবে। কারণ এটা তাদের দায়িত্ব।’

শামীম ওসমান তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্নজনের সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘যারা আমার বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের জবাব দিতে ২মিনিটও লাগবে না শামীম ওসমানের। কিন্তু আল্লাহ আমাকে অনেক ধৈর্য দিয়েছেন। আল্লাহ আমাকে অনেক রহমত দিয়েছে।’

‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কারো বিরুদ্ধে কথা বলছি না। তাই কেউ ব্যক্তিগতভাবে আমার বক্তব্য গ্রহণ করবেন না’ বক্তব্যে যুক্ত করেন শামীম ওসমান।

তিনি বলেন, ‘৫ হাজার হকার উচ্ছেদের সঙ্গে ২৫ হাজার মানুষের রুটি রুজি সম্পৃক্ত। কেউ হকারদের মুখে ভাত তুলে দিতে না পারলেও অন্তত কেড়ে নিয়েন না। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রাজনীতি করে না। তিনি প্রতিটি মানুষের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার রাজনীতি করেন।’

প্রসঙ্গত হকার ইস্যুতে গত শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবে বক্তব্য রাখেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী সেলিম ওসমান। ওই সময়ে হকাররা বিকেল ৫টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত শহরে বসার অনুরোধ করেন। তখন সেলিম ওসমান ২৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত এ বিষয়টিকে মেনে নিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়রকে চিঠি দিয়ে অবহিত করবেন প্রতিশ্রুতি দেন। রোববার মেয়রকে দেওয়া চিঠিতে এমপি সেলিম ওসমান বিকেল ৫টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুটপাতে হকারদের বসতে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে চিঠির জবাবে সিটি করপোরেশন শহরে হকার বসতে দেওয়া হবে না জানিয়ে ৪টি বিকল্প স্থান উল্লেখ করেন। এগুলো হলো ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামের বর্ধিতাংশ, জামতলা ঈদ গাঁ মাঠ, নগর ভবনের সম্মুখের অংশ ও নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পেছনে রাজউকের কার পার্কিংয়ের জায়গা। সেলিম ওসমান সিটি করপোরেশনের চিঠি পেয়ে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ইসলামী ফাউন্ডেশন ও মুসল্লিদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ঈদগাহ মাঠ, বরফকল মাঠ এবং নগর ভবনের সামনের জমিতে অস্থায়ীভাবে হকারদের বসার ব্যাপারে প্রস্তাব রাখেন।

সেই চিঠি চালাচালি প্রসঙ্গ টেনে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার বড় ভাই সেলিম ওসমান চিঠি দিয়েছিলেন। সিটি করপোরেশনের কর্মচারী দিয়ে উত্তর দিয়ে দিবেন এটা হতে পারে না। ওনি ভদ্র মানুষ। কিন্তু আমি সেলিম ওসমান না আমি শামীম ওসমান এটা মনে রাখতে হবে। আমি কোন অনুরোধ করবো না।’

হকার্র্স মার্কেটে দোকান বরাদ্দ নিয়ে কারা বিক্রি করেছে সেটাও খুঁজে বের করার আহবান রাখেন শামীম ওসমান। তিনি আরো বলেন, এখানে আপনি বললেন ৬০০ দোকান বিক্রি করে দিয়েছেন হকাররা। কিন্তু যখন ৭ লাখ টাকা করে বিক্রি হলো, আপনি এসব দোকান কাকে বরাদ্ধ দিলেন কিংবা এসব দোকান কারা কিনলো এটা আমরা জানতে চাই। আর ঐ দোকান যদি ৭ লাখ টাকা করে বিক্রি হয় তাহলে সামনের দোকান ৫০ হাজার করে বিক্রি হলো কিভাবে। এই টাকা পেল কারা। কারা এসব দোকান বিক্রি করে টাকা নিলো, আর কোন হকারদেরই বা আপনি এই দোকানগুলো বরাদ্ধ দিলেন।

এমপি বলেন, এটা সত্য হকাররা রাস্তায় বসলে মানুষের হাঁটাচলায় কষ্ট হয়। পাঁচ হাজার মানুষের হাটার একটু কষ্টের ফলে আমাদের হকারদের পরিবারের খেয়ে বাচুক। হাটার কষ্টের চেয়ে বাচার কষ্ট বেশি। গত শুক্রবার বেশ কিছু হকার বসেছিল, আমি একা বের হয়ে দেখছিলাম। আমি নিজের চোখে দেখেছি এক একটা দোকানের উপর মানুষ উপচে পড়েছে গরম কাপড় কেনার জন্য। বাংলাদেশের সব মানুষের পক্ষে সম্ভব না অল্প বেতনে বেশী দামি গরম কাপড় কেনা। পাঁচ লাখ লোক নাকি বিরক্ত হয়ে যাবে হকারদের জন্য কিন্তু আমি দেখলাম মানুষরা এই হকারদের উপরও আস্থা রাখে, দোকানে ভীড় করে।

হকারদের নিয়ে বিএনপির কোন আগ্রহ না থাকারও সমালোচনা করেন শামীম ওসমান। বলেন, ‘আজকে বামদলের মত ছোট দলের নেতার কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম তো মারের (নির্যাতনের) ভয়ে পিছু পা হয়নি। এ জন্য আমি হাফিজ ভাইকে ধন্যবাদ জানাই। বিএনপির মত দলের নেতারা কেন হকারদের পাশে নেই। ভয় পেলে রাজনীতি করা উচিত না। কাপুরুষদের রাজনীতি করা উচিত না। রাজনীতি করলে গরীব দুঃখি মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাতে যত বাধা বিপত্তি কিংবা নির্যাতন আসুকনা কেন। আমি মনে করেছিলাম ২৫ দিনে হকার ইস্যুতে বিএনপি অনেক কিছু করবে। কিন্তু তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। না সব লাইনবাজ, এরা ভোটের সময় আসবে। মনে করেছিলাম হকারদের পাশে থেকে বিএনপি নেতারাও লাঠির সামনে থাকবেন। হকারদের গায়ে হাত দিয়েন না এটা বলার মত একজন বিএনপি নেতাও নাই। এই ২৫ দিনেও যখন নারায়ণগঞ্জে আপনারা কিছু করতে পারেননি মানুষের জন্য আপনারা ২০১৮ তে আর আইসেন না পারবেন না।’

নারায়ণগঞ্জ শহরে গত ২৫ ডিসেম্বর থেকেই চলছে ফুটপাত হকারমুক্ত করার উদ্যোগ। সিটি করপোরেশন ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে ওই কড়া অভিযান যখন চলছে তখন শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত একেবারেই হকারমুক্ত রয়েছে। শুরুতে হকাররা বিক্ষিপ্ত আন্দোলন করে। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন সিপিবি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। যুক্ত হন ক্ষমতাসীন দলের অনেক সিনিয়র নেতা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সংগঠন সংবাদ -এর সর্বশেষ