পিন্টুর ফ্লাটেই প্রবীরের মত স্বপনের লাশ টুকরো করা হয়

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ১২:৪১ অপরাহ্ণ

পিন্টুর ফ্লাটেই প্রবীরের মত স্বপনের লাশ টুকরো করা হয়


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৫৯ পিএম, ১৬ জুলাই ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ১০:০০ পিএম, ১৭ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার


পিন্টুর ফ্লাটেই প্রবীরের মত স্বপনের লাশ টুকরো করা হয়

নারায়ণগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে প্রায় দেড় বছর আগে নিখোঁজ কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহার নিখোঁজের আসল রহস্য। সে নিখোঁজ না বরং ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্বের জের ধরেই ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে পিন্টু দেবনাথের বাসায় বসে স্বপনকে হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মাসদাইর এলাকার রত্মা রানী চক্রবর্তী ও শহরেরআমলাপাড়া এলাকার আবদুল্লাহ আল মোল্লা মামুনকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য। রোববার রাতে ১৫ জুলাই রাতে দুইজনকে গ্রেফতারের পর ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করা হয়।

গতকাল সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আশেক ইমানের আদালতে শুনানী শেষে প্রত্যেকের ৩দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

স্বপন কুমার সাহা নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে। সে ছিল নিহত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তার ঘাতক পিন্টু দেবনাথের বন্ধু। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। প্রবীর ঘোষের হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু জানিয়েছে স্বপন ভারতে চলে গেছে। কিন্তু পুলিশের ধারণা ছিল প্রায় দেড় বছর ধরে নিখোঁজ স্বপনের ভাগ্যেও হয়তো নির্মম কোনো পরিণতি ঘটে থাকতে পারে। স্বপনের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। ওই জিডির প্রেক্ষিতে সোমবার স্বপনকে গুমের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা করে অজিত কুমার সাহা। পরে তাৎক্ষনিক মামলাটি ডিবিকে হস্তান্তর করা হয়। মামলার প্রেক্ষিতে গ্রেফতার করা হয় মামুন ও রত্মাকে। মামলায় এ দুইজন ছাড়াও পিন্টু দেনবাথ ও বাপন ভৌমিক বাবুকে আসামী করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বাদী অজিত কুমার সাহা জানান, স্বপন কুমার সাহা ছিলেন খুচরো কাপড় ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। স্বপনের বন্ধু কালীরবাজার এলাকার পিন্টু দেবনাথকেও জিজ্ঞেস করি। কিন্তু পিন্টু বার বার বলে আসছিলেন স্বপন ভারত চলে গেছে। গত ৯ জুলাই প্রবীর ঘোষের লাশ উদ্ধারের পর পিন্টুর প্রতি আমাদের সন্দেহ বাড়ে। পরে ১৫ জুলাই বিষয়টি ডিবিকে জানালে রিমান্ডে থাকা পিন্টুর সহযোগি বাপন ভৌমিক বাবু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। সে তখন পিন্টু দেবনাথের এক বান্ধবী রত্মা রাণী চক্রবর্তীর সন্ধান দেন। তার মোবাইল নাম্বার পর্যালোচনা করে জানা গেছে স্বপনের মোবাইলটি রত্মা ব্যবহার করছে। ১৫ জুলাই রোববার রাতে তাকে আটকের পর তার কাছ থেকে স্বপনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল উদ্ধার করে। মূলত পিন্টুর টাকা নিয়ে স্বপন ভারতে একটি ফ্লাট বাসা ক্রয় করে। ওই ফ্লাট বাসা স্বপন না দিয়ে বরং উল্টো হুমকি দিচ্ছিল। এসব কারণেই ২০১৬ সালের মার্চে আমলাপাড়া এলাকার মোল্লা মামুন নিজেই পিন্টুকে হুমকি দিত। তখন থেকেই স্বপন সাহা ও প্রবীর ঘোষকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু।

রত্মা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে পিন্টু দেবনাথের বাসায় বসে স্বপনকে হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।

রোববার রাতে রত্মার দেওয়া তথ্যমতে রাতেই মোল্লা মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। সে পিন্টুর কাছ থেকে দুইজনের নাম করে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এস আই মফিজুল ইসলাম জানান, স্বপনকে গুমের অভিযোগে ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে আনা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত এ ব্যাপারে রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

অর্থ, বন্ধকী স্বর্ণালংকার ও দোকান আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই নারায়ণগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে হত্যার কারণ জানিয়েছেন তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিলিং মিশনের মূল হোতা পিন্টু দেবনাথ। শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে বর্ণনা করেন প্রবীরের উপর পূর্ব ক্ষোভ থেকে শুরু করে হত্যার বিস্তারিত। এসে সে স্বীকার করেছে, তিনি নিজেই পরিকল্পনা করে তার ফ্লাট বাসায় প্রবীরকে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ৭ টুকরো করেছে। চেষ্টা করেছিল লাশ গুম করতে ও পুরো বিষয়টি ভিন্ন দিকে ধাবিত করতে।

জবানবন্দীতে পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাত সাড়ে ১০টায় বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

২১ দিন পর ৯ জুলাই সোমবার রাতে পুলিশ লাশের ৬ টুকরোর মধ্যে ৫ টুকরো উদ্ধার করলেও পাওয়া যায়নি দুই পায়ে গোড়ালির নিচের অংশ। সোমবার রাতে শহরের আমলাপাড়া এলাকার রফিকুল ইসলাম ওরফে ঠান্ডু মিয়ার চারতলা ভবনের নিচতলায় সেপটিক ট্যাংকি থেকে তিনটি বাজারে ব্যাগে থাকা লাশের ৫ টুকরো উদ্ধার করা হয়।

পরদিন মঙ্গলবার সকালে পিন্টুর ওই ভবনের নিচে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ট্যাংকটি ভেঙে ফেললেও গোড়ালির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে বিকেলে আদালত বাপেন ও পিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫দিন করে রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্য মতে আমলাপাড়ায় পিন্টু যে বাড়িতে থাকেন তার পাশের একটি বাড়ির ড্রেনে থাকা আবর্জনার মধ্যে থেকে ওই গোড়ালির অংশ উদ্ধার করা হয়।

প্রসঙ্গত নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার ঠান্ডু মিয়ার ৪ তলা ভবনের নিচে সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। টুকরো টুকরো করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় ভবনের সেপটিক ট্যাংকে। পঁচন ধরে যায় লাশের মধ্যে। প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে মাথা, পা, হাত ও শরীরকে বিচ্ছিন্ন করে। হত্যার পর অংশগুলো সিমেন্টের ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

শহরের বাইরে -এর সর্বশেষ