টাকা আত্মসাৎ করলেন চেয়ারম্যান, দোষ ঢাকতে সচিবের বিরুদ্ধে মামলা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫১ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

টাকা আত্মসাৎ করলেন চেয়ারম্যান, দোষ ঢাকতে সচিবের বিরুদ্ধে মামলা

বন্দর ইউনিয়ন পরিষদে জন্ম নিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্স খাতে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বরখাস্তকৃত সচিব মোহাম্মদ ইফসুফের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিন আহমেদ বাদী হয়ে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ‘ঘ’ অঞ্চল আদালতে এই মামলা দায়ের করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই টাকা আত্মসাতের ঘটনায় এহসান নিজেও সম্পৃক্ত। তিনিও দায় এড়াতে পারেন না। তবে নিজে বাঁচতে এবার তিনি সচিবকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। মামলা ঠুকে সেই ফাঁসানোর প্রক্রিয়া আরো একধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মামলার স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছেন, বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুস সালাম, বন্দর ইউনিয়নের সচিব মোঃ শওকত হোসেন সৈকত, বন্দরের তিনগাঁওয়ের মিনার বাড়ী এলাকার বাসিন্দা সাগর সরকার, বন্দরের বাড়ীখালী এলাকার বাসিন্দা আল আমিন, বন্দরের কুশিয়ারা এলাকার বাসিন্দা মোঃ উজ্জল একই এলাকার বাসিন্দা হেলেনা আক্তার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বিবাদী মোহাম্মদ ইউসুফ বন্দর ইউনিয়নের সচিব থাকাকালিন সময়ে তার নামে খোলা জন্ম, মৃত্যু নিবন্ধনের আইডি শুধু বন্দর ইউনিয়নের ব্যবহারের জন্য খোলা হয়। কিন্তু ইউসুফ সে আইডি দেশের বিভিন্ন এলাকার জন্ম মৃত্যু সনদ তৈরী ও জাল করে অসৎভাবে টাকা আয় করতো। নিবন্ধনের সরকারি ফি ব্যাংকে জমা না দিয়ে এই টাকা নিজেই আত্মসাত করতো। ইউসুফের অসৎ কার্যকলাপের জন্য ২০১৮ সালের ৬ মার্চ তৎকালিন সময়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুলিপি প্রদান করেছিলেন। এরপর একই বছরের ৯ এপ্রিল তার বে আইনি কার্যকলাপের বিভিন্ন তথ্য সম্বলিত একটি চিঠি জেলা প্রশাসকের বরাবর প্রেরণ করা হয়।

মো. ইউসুফ ৬ জন গ্রাম পুলিশের বেতন জালিয়াতি করে নিজে আত্মসাত করেছিলেন। এ ব্যাপারে ২০১৮ সালের ২২ মার্চ গ্রাম পুলিশের সদস্যরা ইউসুফের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। মো: ইউসুফ বদলী হয়ে যাওয়ার কাউকে দায়িত্ব না বুঝিয়ে দিয়েই চলে যান। পবর্তীতে দেখা যায় ইউসুফ জন্ম সনদ প্রদানের ক্ষেত্রেই ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭২০ টাকা এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৯০০ টাকা হিসেব বুঝিয়ে দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। পরে এ বিষয় বন্দর থানায় জিডি করা হয়। এছাড়াও ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮০ টাকা আত্মসাত করেছেন।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শরীফুল ইসলাম শিপলু বলেন, আজকে আমরা আদালতে মামলা দায়ের করেছি। বিজ্ঞ আদালত পিবিআইকে তদন্তের আদেশ দিয়েছেন। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। মূলত বাদীর সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আসামী দুর্নীতি করেছে। তদন্তে সব প্রমান মিলবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ এই দুই অর্থ বছরের জন্ম নিবন্ধন ও ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয় মাসের ট্রেড লাইসেন্স খাতে আদায়কৃত অর্থ আত্মসাত করেছেন বন্দর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিন আহম্মেদ ও তার সচিব (বরখাস্ত) মোহাম্মদ ইউসুফ। এই দুই খাতে মোট ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তে এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে উক্ত টাকা আদায় সহ ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসককে। এবং আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়। তবে এ ঘটনায় ইউপি সচিবকে বরখাস্ত করা হলেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি আত্মসাৎকৃত টাকাও আদায় করা হয়নি।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রেস নারায়ণগঞ্জকে মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, আমি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে বন্দর ইউনিয়ন পরিষদে যোগদান করি এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সনমান্দি ইউনিয়ন পরিষদে বদলি হই। আমি যোগদানের ৫ বছর আগে থেকেই জন্ম নিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্সের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি চলে আসছিল। আমি এ বিষয়ে জন্ম নিবন্ধনের স্থায়ী কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত দেই। তিনি আমার ইউএনও অফিসে জমা দিয়েছিলেন। আমি সেখানে সচিব হিসেবে যা যা করার দরকার করেছি। কিন্তু যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে আমি তো কিছু করতে পারি না। এমনকি অডিটের জন্য কোন কর্মকর্তা আসেন নাই। কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় চেয়ারম্যান সাহেব দিনের পর দিন এই অবৈধ কর্মকান্ড চালিয়ে গেছেন। আমি এসব বিষয়ে চেয়ারম্যান সাহেবকে বাধা দিলে তিনি সরকারি বিভিন্ন আদেশ ও বিধিমালা আমাকে দেখিয়েছেন এবং বলেছেন, এটা আইনসিদ্ধ। আমি সৎ বিশ্বাসে সেসব বিশ্বাস করে কাজ করে গেছি। শেষে আমিও ফেঁসে গেলাম।

তিনি আরও বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে আমি ছিলাম না এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বদলি হয়ে যাই। সুতরাং তিনটা অডিট আপত্তির একটাতে আমি ছিলাম। বাকি দুইটাতে তো আমি ওই ইউনিয়নে ছিলাম না। ওই সময়গুলোতে যারা সচিব ছিলেন তাদের অভিযুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু তারা হন নাই। তিনটাতেই আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যাই হোক আমি পুনরায় তদন্তের সুযোগে আমি আমার ডকুমেন্ট সাবমিট করেছি। এখন বিভাগীয় মামলা চলছে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও