আলোচিত ইউএনও’র পেছনে লেগেছে প্রভাবশালী মহল, এক বছরে তিনজন বদলী

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:২৫ পিএম, ৩০ জুন ২০২০ মঙ্গলবার

আলোচিত ইউএনও’র পেছনে লেগেছে প্রভাবশালী মহল, এক বছরে তিনজন বদলী

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীর্ঘস্থায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। ফলে উপজেলার উন্নয়ন কাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকান্ড ব্যহত হচ্ছে বলে দাবি করেন এলাকাবাসী। তবে ইউএনও স্থায়ী না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন তারা। কারণ হিসেবে বলছেন প্রভাবশালী এসব জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আপোষ না করার কারণে এসব পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও সৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে মিথ্য বিভ্রান্তকর তথ্য দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময়ে বদলীর সুপারিশও করছেন পর্দার আড়াল থেকে। যার প্রমাণ হিসেবে গত দেড় বছরে ৩জন কর্মকর্তাকে বদলী করা হয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ২২ নম্বর নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে ছিলেন অঞ্জন কুমার সরকার। তিনি গত ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যোগদানের পর ওই বছরের নভেম্বরে বদলী হন। পরবর্তীতে ওই বছরের ১১ নভেম্বর রকিবুর রহমান খান যোগদান করলেও মাত্র ৪ মাস পরেই ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাদলী হয়ে যান। বর্তমান ইউএনও মো. সাইদুল ইসলাম গত ১ মার্চ যোগদান করেন।

কিন্তু একই তথ্য ভান্ডারে দেখা যায় এর আগে যারাই ইউএনও হিসেবে ছিলেন তাদের প্রত্যেকেই একবছর কিংবা দুই বছর আবার কেউ তাদেরও বেশি সময় সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান ইউএনও মো. সাইদুল ইসলাম অল্প সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। বিশেষ করে করোনাকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর খাদ্য সামগ্রী উপহার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আলোচনায় আসেন। তাছাড়া করোনা সংক্রামণ রোধে কার্যকারী পদক্ষেপ ও মাঠ পর্যায়ে সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করেও প্রশংসিত হন। এছাড়াও সামাজিক কর্মকান্ড ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন উপজেলা গড়তে তরুণ সমাজকে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেও সফল হন। সব শেষ মেঘনা নদীর তীড়ে জেগে উঠা চরে কয়েক শতাধিক বৃক্ষরোপণ করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন।

এরই মধ্যে প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে একটি সংবাদে বলা হয়েছে, ‘‘করোনার মধ্যে তেমনই উৎসাহব্যঞ্জক খবর পাওয়া গেল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে। করোনা শুরু হওয়ার পর সেখানকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংগঠিতভাবে বিপন্ন মানুষকে সহযোগিতা করে আসছেন। ২৬টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে তাঁরা অবরুদ্ধ দরিদ্র মানুষের বাড়ি বাড়ি রাতের খাবার পৌঁছে দিয়েছেন; ঈদুল ফিতরের সময় দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে নতুন জামা বিতরণ করেছেন। সর্বশেষ গত শনিবার ২৭ জুন তারা সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে গাছ লাগিয়েছেন। নুনেরটেক নামের ওই চর জেগে উঠেছে প্রায় ৭০ বছর আগে। চরের মাটিতে বালুর আধিক্য রয়েছে বলে সেটিকে ঘিরে বালুচোরদের উপদ্রব লেগে রয়েছে বহু বছর ধরে। তারা সেখান থেকে বালু তুলে নিয়ে যায়, ফলে চরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া চরটিতে অবৈধ ভূমি দখলকারীদের তৎপরতাও বেশ। সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুল ইসলাম সম্প্রতি ওই চরে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্দেশ্য বালুচোর ও অবৈধ ভূমি দখলকারীদের হাত থেকে চরটিকে রক্ষা করা। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সোনারগাঁর ২৬টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রায় ৩০০ কর্মী সেদিন ওই চরে ৭৫০টি গাছের চারা রোপণ করেছেন। গাছগুলো বেড়ে উঠলে বালুর চরটি নিশ্চয়ই সবুজ হয়ে উঠবে আর বালুচোরদের উপদ্রবও হয়তো কিছুটা কমবে, যদি প্রশাসন গাছগুলোর দিকে সযত্ম দৃষ্টি রাখে।’’

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ কার্যালয়, ইউএনওর বাসভবন ও উপজেলা পরিষদ চত্বরের বিভিন্ন অফিসের সিসি ক্যামেরা বিকল করে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি মোটরসাইকেল চুরি করে নিয়ে গেছে। গত সপ্তাহে এ ঘটনায় ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ চত্বর, ইউএনওর বাসভবন ও উপজেলা পরিষদ কার্যালয় এলাকা নিরাপত্তার জন্য ১৭টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। গভীর রাতে দুষ্কৃতকারীরা এ সব ক্যামেরার তারগুলো কেটে ফেলে ও অধিকাংশ ক্যামেরা ভেঙ্গে ফেলে।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম সিসি ক্যামেরা বিকল করার বিষয়টি ষড়যন্ত্রের একটি বড় অংশ বলে উল্লেখ করে বলেন, তিনি খুব ভালোভাবে যাচাই করে দেখেছেন সিসি ক্যামেরার তারগুলো বৈরী আবহাওয়ায় বা বিদ্যুৎস্পর্শে বিকল হয়নি। বরং উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তারগুলো কেটে দেয়া হয়েছে। ক্যামেরাও ভেঙ্গে ফেলার আলামত পাওয়া গেছে। তাছাড়া এক মাস পূর্বেও একইভাবে আরেকবার তারগুলো কেটে দেয়া হয়েছিল। তিনি এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানান।

সিসি ক্যামেরা নষ্টের পরে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গন থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি অপসারণের অভিযোগ তুলেন এমপি খোকা। তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীর ব্যানার ফেস্টুন সরিয়ে ফেলাই প্রমাণ করে যে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এখনও থেমে নেই। পাকিস্তানের এই প্রেতাত্মাদের শিরায় উপশিরায় ষড়যন্ত্রের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আমি তাদেরকে ছাড় দিবো না।

সূত্র জানায়, সোনারগাঁয়ে করোনা পরিস্থিতিতে প্রতিবেশি, স্বজনরা এড়িয়ে চলছেন আক্রান্তদের। আর কেউ মারা গেলে পরিস্থিতি হচ্ছে আরও মর্মান্তিক। দাফন-কাফনে সহযোগিতা করছেন না কেউ। অথচ সোনারগাঁয়ের ইউএনও সংবাদ পেলেই নিজ দায়িত্বে লাশের দাফন কাফনের ব্যবস্থা করছেন। এমনকি মৃতের পরিবার ও আশপাশের পরিবারগুলোকে হোম কোয়ারেন্টিনে রেখে খাবার সরবরাহ করছেন নিয়মিত। এ পর্যন্ত সোনারগাঁয়ে যে ছয়জন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাদের প্রত্যেকের গোসল,জানাযা ও দাফন কাজ হয়েছে ইউএনও সাইদুল ইসলামের ও স্বেচ্ছাসেবী টিমের মাধ্যমে।

সোনারগাঁয়ের স্থানীয় লোকজন মনে করেন, এসব প্রশংসনীয় কার্যক্রম করলেও উপজেলার প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেন। কারণ জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ফলে এ দ্বন্ধ তৈরি হয়। আর শুরু হয় ইউএনও সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর অভিযোগের আঙ্গুল। কোন কিছুতেই যখন ইউএনওকে দমানো যাচ্ছিলো না সবশেষ দুর্নীতির অভিযোগ দেয়া হয়।

তবে এ অভিযোগেরও স্পষ্ট উত্তর দেন ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ইউএনও সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, দুধঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চারক্ষ বিশিষ্ট আধাপাকা একটি টিন শেড ভবন নিলামে বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সর্বোচ্চ দরদাতা ২৫ হাজার ৫০০ টাকা নিলামটি পেয়েছেন। যিনি দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন তিনি দর দিয়েছিলেন ২১ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ দরদাতাকে নিলামটি সরকারিভাবে প্রদান করে ২৫ হাজার টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইদুল ইসলামের আগের ইউএনও রকিবুর রহমান খানের বিরুদ্ধেও জনপ্রতিনিধিরা বিরোধ শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ ফেব্রয়ারি মাসিক সমন্বয়ক সভা বয়কট করে জনপ্রতিনিধি ঐক্য ফোরাম। এসএসসির পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করার সময় বহিরাগত হিসেবে জনপ্রতিনিধিকে প্রবেশে বাধা দেয়ায় এসিল্যান্ডের ক্ষোভ ইউএনওকে অভিযোগ করতে থাকেন। এর পর একের পর এক অভিযোগ করেন জনপ্রতিনিধিরা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী আমরা জানি প্রতিকূলতা থাকতে পারে। এই প্রতিকূলতা এড়িয়ে জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে কাজ এগিয়ে নিয়ে যওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু এরকম একটি পদে থেকে যখন আমরা কাজ করি তখন কিছু মানুষ নাখোশ হতেই পারে। আমি যদি মাদকসেবী বা মাদকের চালান ধরি তাহলে নাখোশ হতে পারে। এরকম করতে পারে নির্দিষ্ট করে কাউকে মনে করি না।’

প্রথম আলোর সোনারগাঁও সংবাদদাতা মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন আর জনপ্রতিনিধির মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার কথা না। কিন্তু বর্তমানে দু’জনের মধ্যে একটি দূরত্বের খবর আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। এটা সোনারগাঁয়ে ওপেন সিক্রেট। সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সেই বিষয় সম্পর্কে জানেন। তবে দু’জনের কেউ স্বীকার করেন না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাবেক ইউএনও রাকিবুর রহমান খান এখানে থাকা অবস্থায় এমন কোনো কাজ করেন নাই যে জনপ্রতিনিধিরা তাঁকে বয়কট করবে। এখানে নিশ্চয় কোন স্বার্থ জড়িত আছে। আমি যতটুকু জানি রাকিবুর রহমান ভালো মানের অফিসার। সে আসলো কয়েকদিন পর সে খারাপ। কি খারাপ? কয়েকজন তৃণমূল পর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা ফোরাম করে রাকিবুর রহমানকে বয়কট করে। আমি জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেছি যে এই লোকের অপরাধ কি? সে মাত্র আসলো। কেন সভা বয়কট করা হলো? কোনো জনপ্রতিনিধি উত্তর দিতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘অল্প কিছুদিন পর পর সোনারগাঁও ইউএনও পরিবর্তন। সারা বাংলাদেশে কোথাও দেখিনি। এখনো শুনতে পাচ্ছি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেখতে পাচ্ছি অনেকে লিখছেন যে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সরে যেতে হবে। কিন্তু এর কারণ বা তাঁর অপরাধ আমার জানা নাই।’

মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম বলেন, সংসদ সদস্যের সাথে যেরকম সম্পর্ক থাকার কথা সোনারগাঁ ইউএনওর সাথে সেরকম সম্পর্ক দেখছি না। সংসদ সদস্য এবং ইউএনওর মধ্যে দূরত্ব আছে। আমাদের এখানে চৈতি কম্পোজিটের দূষণের কারণে হাজার হাজার মানুষ ভুক্তভোগী। মাছের ক্ষতি হচ্ছে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। যে কারণে তাঁদের দূষণ রোধে আমরা যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ব্যর্থ। এর কারণে হতে পারে এখানে পর পর দুই টার্মে এখানে আওয়ামী লীগের কোনো সংসদ নেই। দলীয় কোনো সংসদ সদস্য যদি থাকতো তিনি হয়তো ভূমিকা নিতে পারতেন। তাই আরমা যেমন ব্যর্থ তেমনি সংসদ সদস্যও ব্যর্থ।’

মিজানুর রহমান মামুন বলেন, ‘ইউএনও সাইদুল ইসলামকে থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে এটা ফেসবুকে বিভিন্ন মন্তব্য দেখতে পাই সেখান থেকে ধারণা হতেই পারে। কারণ করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই বর্তমান ইউএনও মহোদয় যেভাবে কাজ করতে শুরু করেছেন। প্রতিটি ভালো কাজেই বাধা থাকে। যে কাজ করে না তাঁর কোনো ত্রুটি থাকে না। যে কাজ করে তাঁর ত্রুটি বের করার সুযোগ খুঁজে। সম্প্রতি ইউএনও মহোদয় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যে সোনারগাঁয়ে নদীবেষ্টিত নুনেরটেক যেটাকে মায়াদ্বীপ হিসেবেও চিনি। কিন্তু বালু সন্ত্রাসীদের কারণে দ্বীপটি বিলীন হওয়ার পর্যায়ে। কিন্তু সম্প্রতি দ্বীপটিকে নিয়ে ইউএনও কাজ শুরু করেছেন। বৃক্ষ রোপণ করেছেন। ২৬টি সংগঠন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এখান থেকেই বিরোধ।’



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও